রেমিট্যান্স ও রপ্তানি প্রবাহ বৃদ্ধি এবং আমদানির চাপ কমে আসায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবার বাড়তে শুরু করেছে। গত মঙ্গলবার রিজার্ভ ৭ কোটি ডলার বেড়ে ৩ হাজার ৯৬৭ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। গতকাল বুধবারও তা অপরিবর্তিত ছিল। গত সোমবার রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৯৬০ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সম্প্রতি দেশে ডলারের সরবরাহ বাড়তে থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে। গত জুলাইয়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১২ শতাংশ, রপ্তানি বেড়েছে ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলা কমেছে ৩১ শতাংশ। ফলে আগস্টের শুরু থেকেই কিছুটা স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতিতে ফিরেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। যা গত কয়েক মাস ধরেই ক্ষয়িষ্ণু ধারায় ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত ২৬ জুলাই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৯৫০ কোটি ডলার। এর পরদিন (২৭ জুলাই) রিজার্ভ কমে ৩ হাজার ৯৪৭ কোটি ডলারে নামে। এরপর থেকে আবার তা বাড়তে শুরু করে।
করোনা মহামারীর মধ্যেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো থাকায় ২০২০ সাল থেকে রিজার্ভ বাড়তে শুরু করে। কিন্তু মহামারীর প্রকোপ কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে রেমিট্যান্স কমতে থাকে। ২০২০ সালের মার্চে ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার রিজার্ভ ছিল। তবে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত রিজার্ভ আবার বাড়তে বাড়তে ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার ছাড়ায়। এরপর থেকে করোনার প্রকোপ কমে আসায় অর্থনীতি আবার চাঙ্গা হয় এবং আমদানি বাড়তে থাকে। বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা লকডাউন তুলে দেওয়ায় আবার শুরু হয় হুন্ডি। এতে করে বৈধপথে রেমিট্যান্স কমতে থাকে। ফলে বর্ধমান আমদানি ব্যয় মেটাতে রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোকে ডলার সরবরাহ করতে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে রিজার্ভ থেকে ৯০০ কোটি ডলার ব্যাংকগুলোকে সরবরাহ করা হয়। এতে রিজার্ভ কমে সম্প্রতি ৪ হাজার কোটি ডলারের নিচে নেমে আসে।
চলতি বছর মার্চে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ডামাডোলে গত তিন-চার মাস ধরে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশই অর্থনৈতিক নানা ধরনের সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে বাংলাদেশের স্থানীয় মুদ্রা টাকার মান কমেছে ১০ শতাংশ। ৮৬ টাকার ডলার ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে ডলারের দরের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাও কিছুটা থমকে যায়।
গত ১২ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আবদুর রউফ তালুকদার আমদানি ব্যয় কমিয়ে আনতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এতে করে জুলাই মাসজুড়ে এলসি খোলা ৩১ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে আসে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ তিন সূচক রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও আমদানিতে সাম্প্রতিক পটপরিবর্তনে কিছুটা স্বস্তির লক্ষণ এনে দিয়েছে।
গত জুলাই মাসের ৩১ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ২০৯ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। যা এর আগের মাসে জুনে আসা রেমিট্যান্সের তুলনায় ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ বেশি এবং গত বছর জুলাই মাসের রেমিট্যান্সের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। রপ্তানি থেকে জুলাইয়ে দেশ আয় করেছে ৩৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। যা সরকার নির্ধারিত রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি এবং গত বছর জুলাই মাসের রপ্তানি আয়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে গত জুলাইয়ে ৫৪৭ কোটি ডলারের আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছে ব্যাংকগুলোতে, যা আগের মাস জুনে ছিল ৭৯৬ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। ঋণপত্র খোলা কমেছে ৩১ দশমিক ৩২ শতাংশ।
এসব কারণেই সম্প্রতি রিজার্ভ বাড়তে শুরু করেছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালোর দিকে রয়েছে। গত ১ ও ২ আগস্ট ১৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি আগস্টেও ভালো রেমিট্যান্স পাওয়া যাবে আশা করা যায়। তাছাড়া বুধবার ৪০ মিলিয়ন (৪ কোটি) ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এ ডলার বিক্রি না হলে রিজার্ভ আরও বাড়ত।’
