তিন জায়গা থেকে ওঠে ডাকাতরা

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২২, ০৩:৫৬ এএম

কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা চলন্ত নৈশকোচে ডাকাতির পর ধর্ষণের শিকার নারী আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার জবানবন্দি গ্রহণ করেন টাঙ্গাইলের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রুমি খাতুন। জবানবন্দিতে ওই নারী বাসের ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, শুরুতে ডাকাতিতে বাধা দেওয়ার জেরে ছয় ডাকাত তাকে ধর্ষণ করে। গলা টিপে ধরে মারধর করে।

এদিকে গতকাল সকালেই ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার জানান, রাজা মিয়া নামের ওই ব্যক্তি কালিহাতী উপজেলার বল্লা গ্রামের বাসিন্দা। শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকত। সন্ধ্যায় আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ওই নারী জানান, তিনি কুষ্টিয়া থেকে বাসটিতে উঠেছিলন। রাত সাড়ে ১১টায় তাদের বাস সিরাজগঞ্জের একটি হোটেলে পৌঁছায়। খাওয়া শেষ করে রওনা হওয়ার পাঁচ মিনিট পরই রাস্তা থেকে ২০-২২ বছর বয়সের তিনজন বাসে ওঠে। তারা জানায়, সামনে তাদের আরও লোক আছে। কিছুদূর যাওয়ার পর আরও চারজন ওঠে। তাদের মধ্য থেকে একজন বলে, ‘আমার লোক আছে আরও।’ কিছু দূর যাওয়ার পর আরও ছয়জন ওঠে। এভাবে ১৩ জন বাসে ওঠে। তারা বাসের পেছনে বসে। একজন তার (ভুক্তভোগী নারী) পাশে বসতে চায়। কিন্তু সুপারভাইজার তাকে উঠিয়ে দেন। পরে কাছের একটি সিটে বসে সিগারেট খেয়ে ধোঁয়া ছাড়ে। নিষেধ করলে তারা তাকে গালাগাল করে। বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর তাদের মধ্যে তিনজন চালকের পাশে বনেটে গিয়ে বসে। তারা সামনে নামার কথা বলে।

জবানবন্দিতে ওই নারী বলেন, তিনজন সামনে বসার পর একপর্যায়ে চালককে উঠিয়ে তাদের মধ্য থেকে একজন গাড়ি চালানো শুরু করে। তারা বাসের চালক ও সুপারভাইজারকে পেছনে নিয়ে আসে। এরপর প্রথমে পুরুষ যাত্রীদের হাত, মুখ, চোখ বাঁধে। পরে মেয়েদের বেঁধে ফেলে। মুঠোফোন, গহনা, টাকা সব লুট করে নেয়। এ সময় অনেককে মারধর করে। একপর্যায়ে ডাকাত দলের ছয়জন তাকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণকালে তার হাত ও চোখের বাঁধন খুলে যায়। একপর্যায়ে বিভিন্ন জায়গায় গাড়ির গতি কমে এবং ডাকাতরা নামতে থাকে। একসময় হঠাৎ ডাকাত দলের চালক গাড়ির জানালা দিয়ে নেমে যায়। এ সময় গাড়ি খাদে পড়ে যায়। প্রথমে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন আসেন উদ্ধার করতে। যাত্রীরা জানালা দিয়ে বের হয়ে আসেন। পরে স্থানীয় লোকজন ও পুলিশের কাছে তারা ডাকাতির ঘটনা বলেন। পরে মধুপুর ফায়ার সার্ভিসের একটি দলও ঘটনাস্থলে যায়। তাদের সহায়তায় পুলিশ ওই নারীকে প্রথমে মধুপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাতে তাকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বাদল কুমার চন্দের আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাকে চিকিৎসার জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠানোর আদেশ দেয়।

মধুপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিন জানান, বুধবার সকালে খবর পাওয়ার পর তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। প্রথমে মনে করেছিলেন সাধারণ দুর্ঘটনা। যাওয়ার পর দেখেন জানালা দিয়ে উঁকি দেওয়া অনেকের মুখ-হাত বাঁধা। সবাই আতঙ্কিত। এ সময় যাত্রীদের কাছে জানতে পারেন বাসে ডাকাতি হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। এ সময় তারা আহত দুজন ও ধর্ষণের শিকার এক নারীকে উদ্ধার করে মধুপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।

এ ব্যাপারে বুধবার রাতে ওই বাসের যাত্রী হেকমত আলী বাদী হয়ে মধুপুর থানায় মামলা করেন। হেকমত আলীর বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সালিমপুর গ্রামে। মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়ে। আসামিদের বিরুদ্ধে ডাকাতি ও দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মধুপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মুরাদ হোসেন বলেন, এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে একজনকে আটক করা হয়েছে। পরে তাকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া বাসের চালক ও সুপারভাইজারকে হেফাজতে রাখা হয়েছে। তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে ধর্ষণের শিকার ওই নারীর মেডিকেল বোর্ডের প্রধান শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেহেনা পারভীন বলেন, তিন সদস্যের মেডিকেল টিম পরীক্ষা করেছে। কিছু সাইন পজিটিভ আছে। সাইন অব স্ট্রাগল রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তার সোয়াব সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

একই তথ্য জানান টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সাদিকুর রহমান। তিনি বলেন, এরই মধ্যে ওই নারীর প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে।

ওই নারীর আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার আগেও গতকাল সকালে পুলিশ ও সাংবাদিকদের সামনে মঙ্গলবার রাতে ঘটে যাওয়া সেই লোমহর্ষক ঘটনা করেন। পাশাপাশি ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমি জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই। তাদের বিচার না হলে কাল আরেক নারীর সঙ্গে একই ঘটনা ঘটবে। আমি ওদের ফাঁসি চাই।’

রাজা মিয়া ৫ দিনের রিমান্ডে এদিকে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার রাজা মিয়ার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মধুপুর আমলি আদালতের বিচারক বাদল কুমার চন্দ। বৃহস্পতিবার ভোরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানিয়েছে, রাজা মিয়া টাঙ্গাইল-চন্দ্রা পথে চলাচলকারী ঝটিকা পরিবহনের বাসের চালক। টাঙ্গাইলের নাটিয়াপাড়া এলাকায় বাসটির মূল চালক মনিরুল ইসলাম মনিরকে সরিয়ে রাজা মিয়া বাসটির নিয়ন্ত্রণ নেন। মনিরকে তখন বাসের পেছনে বেঁধে রাখা হয়। রাজা মিয়াই তিন ঘণ্টা ধরে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন রাস্তায় বাসটি চালিয়েছেন।

পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বলেন, ইগল পরিবহনের যে বাসটি ডাকাতের কবলে পড়ে, সেই বাসের চালককে সরিয়ে দিয়ে রাজা চালকের সিট দখল করে। ধর্ষণ ও ডাকাতিকালীন রাজা বাসটি চালাচ্ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এ ঘটনায় কে কে জড়িত ছিল রাজা পুলিশকে জানিয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বাকিদের গ্রেপ্তারে জোর চেষ্টা চলছে। আদালতের পরিদর্শক তানভীর আহমেদ বলেন, পুলিশ আসামি রাজা মিয়ার ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। তবে আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

মঙ্গলবার রাতে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ইগল পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস ২৪ থেকে ২৫ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। গভীর রাতে সিরাজগঞ্জ পৌঁছালে সেখান থেকে একদল ডাকাত যাত্রীবেশে ওই বাসে ওঠে। বাসটি বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর যাত্রীবেশে থাকা ডাকাত দলটি অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের বেঁধে ফেলে। এ সময় দলটি বাসটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে যাত্রীদের কাছ থেকে মোবাইল, টাকা, স্বর্ণালংকার লুট করে নেয়। এক নারীকে দল বেঁধে ধর্ষণ করে। বাসটি বিভিন্ন স্থানে ঘুরিয়ে তিন ঘণ্টা নিয়ন্ত্রণে রাখে। পরে পথ পরিবর্তন করে টাঙ্গাইল ময়মনসিংহ সড়কের মধুপুর উপজেলার রক্তিপাড়া জামে মসজিদের পাশে বালুর স্তূপে বাসটি ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত