দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বঙ্গবন্ধুর দর্শন এখনো প্রাসঙ্গিক। তার দেখানো পথেই বর্তমান সংকটের উত্তরণের উপায় নিহিত আছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। গতকাল রবিবার এফবিসিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত বঙ্গবন্ধুর অর্থনীতি ও বাণিজ্য ভাবনাবিষয়ক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-বঞ্চনার কৌশল। শুধু রাজনৈতিক মুক্তিই নয়, অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যও ছিল বঙ্গবন্ধুর। তাই তার ঘোষিত ছয় দফার মধ্যে তিনটিই ছিল অর্থনীতিবিষয়ক।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে মানুষের কষ্ট বাড়বে, এটা ঠিক। তবে কখনো কখনো সুদিনের জন্য কষ্ট করা লাগে। উদ্দেশ্যবিহীন মানুষের কষ্ট বাড়বেÑ এমন কোনো সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনা কখনো নেন না। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে জ¦ালানি তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে। তাই সাময়িক কিছু কষ্ট সবাইকে স্বীকার করতে হবে। এটি মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশভাগের আগে ব্যবসা-বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই ছিল পাকিস্তানের হাতে। সেই বিষয়টি সামনে রেখেই স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যান বঙ্গবন্ধু। তার স্বপ্নই আজকের অর্থনৈতিকভাবে উন্নত বাংলাদেশ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান জানান, বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কারণে দেশের রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য এসেছে। সদ্য স্বাধীন দেশে আমদানি-রপ্তানিতে বার্টার প্রথা চালু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বেসরকারি খাতে এ পদ্ধতিতে ৪০ শতাংশ অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানি করার শর্ত দিয়েছিলেন তিনি। ওই সিদ্ধান্তের কারণেই রপ্তানি খাতে চিংড়ি ও চা যুক্ত হয়েছিল। পরে সরকারি বার্টারেও বিদেশি দেশগুলোকে এসব অপ্রচলিত পণ্য কিনতে বাধ্য করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, পরিত্যক্ত শিল্প রাষ্ট্রীয়করণ না করলে স্থিতিশীলতা আসত না। রাষ্ট্রীয়করণ করলেও, প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল ব্যক্তি খাতে। ১৯৭৫ সালে বিরাষ্ট্রীয়করণের নির্দেশও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তা বাস্তবায়নের আগেই তাকে হত্যা করা হয়।
স্বাগত বক্তব্যে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, কৃষি উন্নয়ন, শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ, সংস্কৃতি, নারী জাগরণ, গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর দর্শনকে ধারণ করে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়তে বাণিজ্য খাতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তারই অংশ হিসেবে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কারিগরি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি খাতেরও ব্যাপক অবদান রয়েছে। করোনা মহামারী ও ইউক্রেন সংকটের কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের জন্য সবসময়ের মতো অনুকূল পরিবেশ তৈরি ও সহযোগিতা দিলে এ সংকট শিগগিরই কাটিয়ে ওঠা যাবে বলে মনে করেন সভাপতি জসিম উদ্দিন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। যুদ্ধোত্তর বাস্তবতার নিরিখে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে আপসহীন অভিযাত্রা, রাষ্ট্রনির্ভরতা থেকে ব্যক্তি খাতের বিকাশসহ বিভিন্ন দিকে বঙ্গবন্ধুর অবদান তুলে ধরেন তিনি।
প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য রাখেন এফবিসিসিআইয়ের প্যানেল উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ট্রেড ও ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রিজওয়ান রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এম মাহফুজুর রহমান।
তারা বলেন, বঙ্গবন্ধুর আমলে এলডিসিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণেই বাংলাদেশের রপ্তানিবাণিজ্য আজকের পর্যায়ে এসেছে। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা দেশে ব্যক্তি খাতের বিকাশের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। অর্থনৈতিক কূটনীতিতেও বিশাল ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
