টাইগারদের দম্ভ যেন চূর্ণ করলেন সিকান্দার রাজা

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২২, ০২:২৭ পিএম

দল তখন স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। ঘাড়ের ওপর যেন নিশ্বাস ফেলছে পরাজয়। ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বড় জুটির বিকল্প নেই। তখন ঠিক সেটাই করলো জিম্বাবুয়ে। দুজন ব্যাটার দায়িত্ব নিলেন ঘুরে দাঁড়ানোর। তাদের ব্যাটেই ভর করে তৈরি হয় লড়াইয়ের ভিত। শুধু ভিত তৈরি করেই দমে যাননি তারা। জয় নিশ্চিত করে তবেই তারা মাঠ ছাড়েন। পরপর দুই ম্যাচে জিম্বাবুয়ে দেখিয়ে দিল চাপেও মুখ থুবড়ে পড়ে না। সেখান থেকেও ঘুরে দাঁড়াতে জানে তারা।

বাংলাদেশের বিপক্ষে পরপর দুই ম্যাচে চাপের মুখ থেকেও জয় নিয়ে ফিরেছে জিম্বাবুয়ে। আর দুই ম্যাচেই জয়ের নায়ক সিকান্দার রাজা। তিনি যেন যুদ্ধের সেনাপতি। প্রথম ম্যাচে সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছিলেন ইনোসেন্ট কাইয়াকে, দ্বিতীয়টিতে অধিনায়ক রেজিস চাকাভা।

প্রথম ম্যাচ থেকেই বলা যাক। সিকান্দার রাজা যখন মাঠে নামেন, তখন সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল না জিম্বাবুয়ে। মাত্র ৬২ রানেই ছিল না টপ অর্ডারের তিন ব্যাটার। এরপরই ইনোসেন্ট কাইয়াকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। এক প্রান্তে কাইয়া আগলে রাখছিলেন, সুযোগ পেলে হাত খুলে খেলছিলেন। কিন্তু অন্যপ্রান্তে রাজা ছিলেন আগ্রাসী। দুজনেই পেয়েছিলেন সেঞ্চুরির দেখা। তবে কাইয়া আউট হয়ে ফিরে যান। কিন্তু শেষ বল পর্যন্ত লড়ে গেছেন রাজা। মোসাদ্দেকের বলে ছয় মেরে দলের জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়েন। এতে বাংলাদেশের টানা ১৯ ম্যাচে জয়ের রথ থামে।

২০১০ সালে জন্ম নেওয়া ক্রিকেটভক্তটা এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়েছে। সে যখন ক্রিকেট বুঝতে শুরু করেছে তখন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের খেলা মানে জয় নিশ্চিত। কারণ টাইগাররা যে ২০১৩ সালের পর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডেতে কখনও হার দেখেনি। সেই ক্রিকেটভক্তটাও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশকে হারতে দেখল। সিকান্দার রাজার দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে যে জয় পায় বাংলাদেশ।

একটা গানের লাইন খুব মনে পড়ছে, ‘যুদ্ধটা যদিও বা শেষ হয় লড়াইটা জারি রেখ...।’ বাংলাদেশের বিপক্ষে জয় খরায় ভোগা জিম্বাবুয়ে তা ঘুচিয়েছে সিকান্দার রাজার অসাধারণ ব্যাটিং নৈপুণ্যে। সেই খরা ঘুচিয়েই থেমে থাকেনি রোডেশিয়ানরা। দ্বিতীয় ম্যাচেও বাংলাদেশকে হারিয়ে তারা জিতে নিয়েছে সিরিজটিও। এই ম্যাচেও নায়ক সিকান্দার রাজাই। ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি পাওয়া রাজা সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছিলেন অধিনায়ক রেজিস চাকাভাকে। তিনিও পেয়েছেন সেঞ্চুরি। তবে আউট হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু রাজা রাজার মতোই লড়াই করে গেছেন। যেন ঐ গানটার মতো তিনি লড়াইটা জারি রেখেছিলেন।

বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে সিরিজে লড়াইয়ে সিকান্দার রাজা যেন কর্তব্যবোধটা ভালো করেই বুঝিয়ে দিলেন। যে ছেলেটা যুদ্ধ বিমানের পাইলট হতে নিজের দেশ ছেড়েছিল। যার স্বপ্নেও কোনোদিন ক্রিকেটার হওয়ার লক্ষ্য ছিল না। আচমকা তিনি ঝোকে যান ক্রিকেটে। আর হয়ে উঠেছেন জিম্বাবুয়ের অন্যতম ব্যাটিং ভরসা। শুধু ব্যাটিংয়েই নয়, বল হাতেও দারুণ কার্যকর তিনি। টাইগারদের বিপক্ষে গতকাল তিন উইকেট শিকার করেছেন। কিন্তু এই জিম্বাবুয়ে দলটা যে অনেক রকম সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দুর্নীতির অভিযোগে আইসিসি ক্রিকেট থেকে তাদের নিষিদ্ধও করেছিল। তাছাড়া খেলার জন্য তারা পায় না স্পন্সরও। টিম স্পন্সরহীন খেলে যাওয়ার উদাহরণ তো এই সিরিজেই স্পষ্ট।

অর্থ, সুযোগ-সুবিধা, স্পন্সর, বেতন-বোনাস সব বিচারেই বাংলাদেশ আর জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এক বছর আগে রায়ান বার্ল একটি টুইট করেন। যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমরা কি কোনো পৃষ্ঠপোশক পেতে পারি, যাতে করে আমাদের প্রতি ম্যাচে এভাবে ক্যাডসে গ্লো লাগিযে খেলতে না হয়।’

যার দ্বারা স্পষ্ট হয় ক্রিকেটে জিম্বাবুয়ে ও বাংলাদেশের পার্থক্য। প্রিয় ব্র্যান্ড বাছাইয়ে যখন হিমশিম খেতে হয় টাইগার ক্রিকেটারদের তখন একজোড়া কেডস নিয়ে একের পর এক ম্যাচ এমনকি সিরিজও চালিয়ে যাওয়ার সংগ্রামের কথা ভেসে বেড়ায় জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটারদের দেয়ালে দেয়ালে। তবুও মাঠে সমানতালে লড়াই করে আফ্রিকার দেশটি। তবুও তারা হারার আগে হারে না। ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায়। কারণ ক্রিকেটারদের কর্তব্যবোধ।

খেলাটা ক্রিকেটারদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। দলের প্রয়োজনে অনেক সময় নিজেকে উজাড় করে দিতে হয়। এতটাই ত্যাগ করতে হয় যে, কখনও সেঞ্চুরি বিসর্জন দিয়ে আসতে হয় ব্যাটারদের। তবে এই সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটারদের যেন দলের চেয়ে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত রাখাতেই ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। প্রথম ম্যাচে মুশফিকের ঐ ইনিংসটা! যেখানে আরও বেশি রান স্কোরবোর্ডে যোগ করতে পারত বাংলাদেশ। কিন্তু মুশফিক অনেকগুলো বল ছেড়ে দিয়েছেন। যেন অর্ধশতকের জন্যই তখন তিনি খেলছিলেন।

দ্বিতীয় ম্যাচের কথাই ধরা যাক। তামিম ইকবাল তো দারুণই খেলেছেন। করেছেন ব্যাক টু ব্যাক ফিফটি। আজ ৪৫ বলেই তুলে নেন অর্ধশতক। যেখানে চার ১০টি ছক্কা ১টি। কিন্তু স্ট্রাইক রেটের আড়ালে যা ঢাকা পড়ে যাবে তা হলো ৩০টি ডটবল। ৩১ নম্বর ডটবলের সময় তো তিনি আউট হয়েই যান।

বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের এমন স্বার্থপর ইনিংসে বড় সংগ্রহের সুযোগ হাতছাড়া হয় বারবার। আর বোলারদের ধারহীন বোলিংয়ের সুযোগে প্রতিপক্ষরাও বুঝিয়ে দেয় ঘাটতিগুলো। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে তাদের বিবর্ণ থাকতে দেখা যায় জিম্বাবুয়ের মতো দলের বিপক্ষেও। যারা বছরের পর বছর সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে, তারা দলের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে কার্পণ্য করে না। অথচ জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট বোর্ড ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন করেছে সামান্যই।

টাইগারে ক্রিকেটারদের প্রায়ই বলতে শোনা যায়, ‘ওয়ানডেতে আমরা ভালো খেলি। এটাতে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’ এসব কথা বলার মধ্যে যেন একটা দম্ভ তৈরি হয়েছিল। টাইগারদের সেই দম্ভ চূর্ণ করলেন জিম্বাবুয়ের সিকান্দার রাজা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত