জ্বালানি তেলের প্রায় ৫০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের পুঁজিবাজারে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তালিকাভুক্ত কোম্পানির মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কায় শেয়ারে বিক্রিচাপ বেড়েছে। এতে করে গতকাল সোমবার দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হওয়া অধিকাংশ শেয়ারের দর কমেছে। যার প্রভাবে ডিএসইর প্রধান সূচকটি গতকাল ৪৫ পয়েন্ট কমেছে। আগের দিন রবিবারও সূচকটি কমেছিল।
গত শুক্রবার প্রায় মধ্যরাতে এক ঘোষণায় ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম ৪২ থেকে ৫২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায় সরকার। এতে করে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের ঊর্ধ্বগতি, জাহাজ ভাড়া কয়েকগুণ বৃদ্ধির পর ডলার সংকটে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। স্থানীয় ও বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির চাপে ধস পরিস্থিতি তৈরি হলে দুই বছরের ব্যবধানে পুনরায় ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ার বিক্রি করে যেসব বিনিয়োগকারী নতুন করে এখনো শেয়ার কিনছেন না, তাদের বিনিয়োগে ফেরাতে ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে অনুরোধ জানিয়েছে এসইসি। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এ আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এসইসি জানিয়েছে, গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিএসইসির কমিশনার শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ, ডিবিএর পক্ষে নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির সভাপতি রিচার্ড ডি রোজারিও।
বৈঠকে নিষ্ক্রিয় বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারে ফেরাতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে আনতেও উদ্যোগ নিতে অনুরোধ জানিয়েছে এসইসি। লাগাতার দরপতন ঠেকাতে শেয়ারদরে ফ্লোর প্রাইস আরোপের পর উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অংশ হিসেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠকের অংশ হিসেবে এ বৈঠকটি করেছে। প্রথমে ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকের নাম করে গত ২৫ জুলাই পুঁজিবাজারের সক্রিয় ‘গ্যাম্বলার’দের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছিল। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে থাকা এসইসি পরে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সংগঠন বিএপিএলসি এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সংগঠন বিএমবিএর সঙ্গেও বৈঠক করেছিল।
অবশ্য ফ্লোর প্রাইস আরোপের পর শুরুতে বাজার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। সূচক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেনদেন পরিমাণও বাড়তে দেখা গেছে। গতকালও ডিএসইর লেনদেন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। লেনদেনের পরিমাণ তেমন না কমলেও অধিকাংশ শেয়ারের দরপতনে সূচক কমেছে।
গতকাল প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইতে ১০৩ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের দরবৃদ্ধির বিপরীতে ২১১টির দর কমেছে, অপরিবর্তিত থেকেছে ৬৬টির দর। এর মধ্যে ৬৪টি ফ্লোর প্রাইসে কেনাবেচা হয়েছে। অধিকাংশ শেয়ার দর হারানোয় প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৪৫ পয়েন্ট হারিয়ে ৬২৫৯ পয়েন্টের নিচে নেমেছে। এ নিয়ে গত দুদিনে সূচক হারাল ৫৩ পয়েন্ট। অবশ্য ফ্লোর প্রাইস কার্যকরের পর গত সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসে এ সূচক বেড়েছিল ৩৩১ পয়েন্ট।
গতকালের খাতওয়ারি লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকৌশল, সিরামিক, পাট এবং বিবিধ ছাড়া বাকি সব খাতের অধিকাংশ শেয়ার দর হারিয়েছে। সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের শেয়ারগুলো। গত সপ্তাহে এ শেয়ারগুলোর দর বেশ খানিকটা বেড়েছিল।
গতকাল ডিএসইতে ১ হাজার ৮৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। এর মধ্যে বস্ত্র খাতে ২৬৮ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়, যা মোট লেনদেনের প্রায় ২৫ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১৬ কোটি ২৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয় বিবিধ খাতের। একক কোম্পানি হিসেবে বেক্সিমকো লিমিটেডের ৮১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে।
