জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার তিন দিন পার হলেও সড়কে গণপরিবহনের ভাড়া নৈরাজ্য থেমে নেই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) গত শনিবার রাতে যে ভাড়া নতুন করে নির্ধারিত করেছে তার থেকেও অধিক ভাড়ায় চলাচল করতে হচ্ছে যাত্রীদের। এ নিয়ে পরিবহনশ্রমিক আর যাত্রীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি থেকে শুরু করে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। কোনো কোনো পরিবহনের বিরুদ্ধে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। নতুন ভাড়ার তালিকা গতকাল বিআরটিএ থেকে বিজ্ঞপ্তিতে আকারে প্রকাশ করলেও সেটি দেখা যায়নি পরিবহনগুলোতে। অবশ্য অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় গত দুই দিনে বেশ কয়েকটি বাস জব্দ করে সংশ্লিষ্টদের জরিমানা করেছে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে যাত্রীরা বলছেন, বিআরটিএ কয়েক জায়গায় লোকদেখানো অভিযান চালালেও সেরকম কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। ফলে বেশি ভাড়ায় চলতে হচ্ছে গণপরিবহনে।
গতকাল সরেজমিন রাজধানীর সদরঘাট, গুলিস্তান, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট, মহাখালী, মিরপুর ঘুরে এবং দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিদের থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, নতুন করে যে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে সেটি কোনো গণপরিবহনে মানা হচ্ছে না। পরিবহনমালিকদের সংগঠন থেকে তাদের এখনো কোনো ভাড়ার চার্ট না দেওয়ায় এই সুযোগে বেশি ভাড়া নিচ্ছেন পরিবহনমালিকরা। বাসমালিকদের পূর্বের ওয়েবিলের নামে তাদের মতো করে ভাড়া নির্ধারণ করছে। যার ফলে বেশিরভাগ বাসেই এখনো নৈরাজ্য বন্ধ হয়নি।
নাজমুল নামের এক বাসযাত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মনজিল বাসে সাইনবোর্ড থেকে শান্তিনগর এসেছি ৫০ টাকা দিয়ে। আগে ২৫ থেকে ৩০ টাকা নিত। বাসের হেলপার তেলের দাম বাড়ায় ওয়েবিলের দামও বেড়েছে বলে বেশি নেওয়ার কথা বলছে। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষ দিন দিন জিম্মি হয়ে যাচ্ছি এই অনিয়মের কাছে।’
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা আশরাফ উদ্দিন নামের আরেক বাসযাত্রী বলেন, ‘প্রতিদিন আমাকে কল্যাণপুর থেকে খিলগাঁও যাতায়াত করতে হয়। তাই আমি বুঝি ভাড়া বৃদ্ধির যে কী কষ্ট। আর শুধু যে ভাড়া বেড়েছে তা নয়, দেশের সব জিনিসপত্রের দামই বেড়েছে। শুধু আমাদের বেতন ছাড়া। সরকারি কর্মকর্তাদের তো বেতন বৃদ্ধি বা পাওয়া নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। নতুন করে এই ভাড়া বৃদ্ধির জন্য সব সমস্যা আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষদের।’
ঢাকার পাশাপাশি দেশের আরও কয়েকটি এলাকা থেকেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের তথ্য এসেছে। সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার সব রুটের লোকাল বাস ও দূরপাল্লার কোচের ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। দূরপাল্লার কোচের ভাড়া সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১০ টাকা কম নেওয়া হলেও লোকাল বাসের ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন। আর এ কারণে যাত্রীদের সঙ্গে সুপারভাইজারদের তর্কে জড়িয়ে পড়া নিয়ে বাগবিত-া ঘটছে। এ ঝামেলা এড়াতে গত ২ দিন ধরে সিরাজগঞ্জের সব রুটে লোকাল বাস চলাচল কমে গেছে। বাস সংকটে পড়েছে যাত্রীরা। তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অনেকে বাস না পেয়ে অটোভ্যান বা সিএনজিচালিত টেম্পুযোগে গন্তব্যে যাচ্ছে। এতে তাদের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে।
তেলের দাম বৃদ্ধির পর বাসের ভাড়া বাড়ানোয় ভোগান্তিতে পড়েছেন রাজশাহী অঞ্চলের যাত্রীরা। বাড়তি ভাড়া আদায় করতে গিয়ে অনেক সময় যাত্রীদের সঙ্গে বাগবিতন্ডার ঘটনা ঘটছে বাসশ্রমিকদের। রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী বাসের ভাড়া নন-এসিতে ১২০ টাকা এবং এসিতে ২০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য আন্তঃজেলা বাসেও প্রায় ২২ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজশাহী থেকে ঢাকার নন-এসি বাসে প্রতি আসনে ভাড়া ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসি বাসের ভাড়া ১২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০০ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী থেকে চট্টগ্রামের ভাড়া নন-এসি বাসে প্রতি আসনে ১০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২৫০ টাকা এবং এসিতে ২৪০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৮০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজশাহীর সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মতিউল হক টিটু বলেন, ভাড়া বাড়ার পর প্রথম দিকে এ নিয়ে অনেক জায়গায় বাগবিত-ার খবর আমাদের কাছেও এসেছিল। তবে এখন সেটা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে যারা বাসে উঠছেন তাদের সঙ্গে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমরা বাস কর্মচারীদের বলেছি যাত্রীদের সঙ্গে কোনো কারণেই খারাপ আচরণ করা যাবে না। বুঝিয়ে ভাড়া আদায় করতে হবে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার বাসমালিকদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করলেও কোনো বাসে সরকার নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর নেই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) নির্ধারিত ভাড়ার বেশ কয়েকগুণ বর্ধিত ভাড়া বাসে বাসে আদায় হয়েছে। তাই ভাড়া নির্ধারণে বিআরটিএ পুরোপুরি ব্যর্থ, তারা বাসের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। সিটি সার্ভিসে সরকার কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করলেও বাসে বাসে ওয়েবিলে যাত্রীর মাথা গুনে গুনে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগরীর কথিত সিটিং সার্ভিসে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াত করলেও সর্বশেষ গন্তব্য পর্যন্ত ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। তাই সরকারের উচিত এখনই গণপরিবহনের ভাড়া নৈরাজ্য ঠেকানো।’
বিআরটিএ উপপরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মো. হেমায়েত উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজকে (গতকাল) বিআরটিএ কর্র্তৃক পরিচালিত মোবাইল কোর্ট অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অপরাধে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১২ আদালত পরিচালনা করে মোট ৪২টি মামলায় ১,২৩,৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করে। এছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও রুট পারমিট না থাকায় মনজিল পরিবহনের একটি গাড়ি ডাম্পিং করা হয়। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, রুট ভায়োলেশন, রুট পারমিটবিহীন, ফিটনেসবিহীন, ওভার স্পিডসহ অন্যান্য অপরাধের দায়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১২টি আদালত কর্র্তৃক ৮৪টি মামলায় মোট ২,৬০,৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ সময় ৫টি গাড়ি ডাম্পিং এবং ৪ দালালকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- প্রদান করা হয়। তবে সড়কে ভাড়া নৈরাজ্য ঠেকাতে আগামীকাল (আজ) বন্ধের দিনও অভিযান চলমান থাকবে বলে জানান তিনি।
