১৬ শিশু পেল প্রথম ডোজ

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২২, ০২:০৬ এএম

দেশের ৫-১১ বছরের শিশুদের করোনার টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আবুল বাশার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৬ শিশুকে টিকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই টিকাদান কর্মসূচি শুরু করল সরকার। এসব শিশুর শারীরিক অবস্থা পর্র্যবেক্ষণ শেষে আগামী ২৫ আগস্ট থেকে দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় এই বয়সী শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া শুরু হবে। পরে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের শিশুদের টিকা দেওয়া হবে।

৫-১১ বছরের শিশুদের টিকার প্রথম ডোজ চলবে ২৫ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এরপর দ্বিতীয় ডোজ কার্যক্রম শুরু হবে। প্রথম ডোজ দেওয়ার দুই মাস পর শিশুরা দ্বিতীয় ডোজের টিকা পাবে।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পরীক্ষামূলক এই টিকা কার্যক্রম উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। প্রথম দিন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আবুল বাশার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ১৬ শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়া হয়। এদিন প্রথম টিকা নেয় তৃতীয় শ্রেণির নিধি নন্দিনী কু-ু।

নিধির বাবা শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা নন্দ গোপাল কু-ু বলেন, যখন শুনলাম স্কুলে টিকার জন্য বাচ্চাদের নাম নেওয়া হচ্ছে, খুব ভালো লেগেছে। সঙ্গে সঙ্গে নিধির নামও দিলাম। আমি নিজেও তিন ডোজ টিকা নিয়েছি। এখন আমাদের বাচ্চারাও সুরক্ষিত থাকবে।

টিকা নেওয়া অন্য ১৫ শিশু হলোএকই বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির সৌম্য দ্বীপ দাস, চতুর্থ শ্রেণির মো. আবু সায়েম ফাহিম, পঞ্চম শ্রেণির বিকাশ কুমার সরকার, তৃতীয় শ্রেণির সাইমুন সিদ্দিক, একই শ্রেণির মো. আরাফাত শেখ, আকিব আহমেদ সায়ন, শামীমা সিদ্দিকা তাসিন, রুপা আক্তার, হুমায়রা আফরিন তামান্না, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহমুদ হোসেন ও আল-আমিন, তাসলিমা আক্তার, সানজিদা আক্তার, মোছা. নুসরাত জাহান আরিন এবং প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী হীরা আক্তার।

টিকা নিতে আসা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বেশ উৎফুল্ল দেখা গেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী নির্ধারিত ১৬ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা টিকা কার্যক্রম শুরুর বেশ আগেই সম্মেলন কেন্দ্রে উপস্থিত হন। এ সময় টিকা নিতে আসা চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান আরিন জানায়, তার বাবা-মা দুজনই টিকা নিয়েছেন। শুধু সে-ই বাদ ছিল। তার কোনো ভয় লাগছে না, বরং আনন্দ হচ্ছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে টিকাদানসহ করোনা চিকিৎসায় বাংলাদেশ সফল বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, করোনার চিকিৎসায় আমরা সফল হয়েছি। টিকাদান কর্মসূচিতেও আমরা ব্যাপক সফলতা পেয়েছি। দেশবাসী আমাদের প্রশংসা করেন, প্রধানমন্ত্রী প্রশংসা করেন। দেশের বাইরেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, ব্লুমবার্গ প্রশংসা করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার অনেক প্রশংসা করেছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা যেখানেই গিয়েছি সবাই জানতে চেয়েছে, শিশুদের টিকা দেওয়া হবে কবে? আমরা টিকা পেয়েছি, কিন্তু আমাদের শিশুরা টিকা পায়নি। অভিভাবকরা এ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। এখন শিশুদের টিকা কার্যক্রমও উদ্বোধন হলো। এটা পরীক্ষামূলক। আগামী ২৫ আগস্ট থেকে পুরোদমে টিকা কার্যক্রম দেশব্যাপী চলবে। প্রথমে আমাদের সিটি করপোরেশন এলাকায় শুরু হবে, তারপর পর্যায়ক্রমে সারা দেশে। শিশুদের ফাইজারের তৈরি বিশেষ টিকা দেওয়া হচ্ছে। এই টিকা যুক্তরাষ্ট্রেও দেওয়া হচ্ছে। আমাদের ওষুধ প্রশাসনও এই টিকার অনুমোদন দিয়েছে। এটি শিশুদের জন্য একেবারে নিরাপদ।

অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, টিকার ক্ষেত্রে আমাদের বিরাট সাফল্য রয়েছে। ১২-১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম ডোজ ৯৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ ৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয়েছে। এই টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার জন্য হু, ইউএস এইড, ইউনিসেফ, যুক্তরাষ্ট্র সরকার, কোভেক্সসহ সবার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, ৫-১১ বছরের শিশুদের এই টিকা কার্যক্রম সারা দেশের ১২ সিটি করপোরেশন এলাকায় শুরু হবে। টিকার প্রথম ডোজ চলবে ২৫ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এরপর দ্বিতীয় ডোজ কার্যক্রম শুরু হবে। প্রথম ডোজ দেওয়ার দুই মাস পর শিশুরা দ্বিতীয় ডোজের টিকা পাবে। শিশুদের দেওয়ার জন্য ফাইজারের তৈরি টিকা পর্যাপ্ত পরিমাণে আমাদের হাতে আছে। টিকা কর্মীরাও সারা দেশে প্রস্তুত আছেন।

এই কর্মকর্তা বলেন, শুরুতে শিশুদের টিকা কার্যক্রম সিটি করপোরেশন এলাকায় শুরু করার পরিকল্পনা করেছি। এরপর পর্যায়ক্রমে সারা দেশের সব জেলা-উপজেলা পর্যায়েও এই টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর ডা. শামছুল হক, বাংলাদেশে ইউনিসেফ প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস, স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মো. সাইফুল হাসান বাদল, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার প্রমুখ।

ভ্যাক্সিনেশন কার্যক্রম উদ্বোধন উপলক্ষে একই স্থানে একটি আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিদেশি কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ কভিড মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান।

২০ আগস্ট গণটিকা ক্যাম্পেইন: স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৩ লাখ ১ম ডোজ এবং ৯৪ লাখ ২য় ডোজ টিকা নেননি। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী ২০ আগস্ট এক দিনব্যাপী সারা দেশে ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর জন্য ১ম, ২য় ও বুস্টার (৩য়) ডোজ টিকার ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হবে। এ সময় বাদ পড়া জনগোষ্ঠী যেকোনো কেন্দ্র থেকে করোনার টিকা নিতে পারবেন।

মজুদ ১ কোটির বেশি টিকা: অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মোট ১ কোটি ৩১ লাখ ৪৭ হাজার ৮৩৯ ডোজ করোনার টিকা মজুদ রয়েছে। গত ৭ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার ৩১ কোটি ৯ লাখ ৩৮ হাজার ৮শ টিকা সংগ্রহ করেছে। এখন পর্যন্ত প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে ১২ কোটি ৯৭ লাখ ৬০ হাজার ৩৬২ জনকে, যা মোট জনসংখ্যার ৭৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছেন ১২ কোটি ৭ লাখ ৩ হাজার ১২০ জন, যা মোট জনসংখ্যার ৭০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বুস্টার বা তৃতীয় ডোজ পেয়েছেন ৪ কোটি ৬ লাখ ৫৯ হাজার ৯৭৮ জন, যা মোট দ্বিতীয় ডোজের ২৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমানে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের ন্যায় বাংলাদেশ সরকারও দেশের কভিড-১৯ সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনা করে দেশের সকল ৫-১১ বছর বয়সী শিশুকে কভিড-১৯ ভ্যাকসিনেশনের আওতায় নিয়ে এসেছে। ইতিমধ্যেই সরকার কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশের জনগোষ্ঠীর উপযোগী প্রায় ৪ কোটি ডোজ শিশুদের ফাইজার ফর্মুলেশন টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ৩০ লাখ ডোজ দেশে এসে পৌঁছেছে। অচিরেই অবশিষ্ট ডোজসমূহও দেশে এসে পৌঁছাবে।

এই টিকা নিরাপদ ও কার্যকর: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ৫-১১ বয়স বয়সী শিশুদের কভিড-১৯ ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে জানান, শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ফাইজার টিকা নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন হিসেবে ৫-১১ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রয়োগের জন্য ইতিমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন লাভ করেছে। দেশের শিশুদের এই ভ্যাকসিন প্রদানের ক্ষেত্রে ন্যাশনাল ইমুইনিজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ বাংলাদেশ (এনআইটিজি’বি তাদের ইতিবাচক মতামত ব্যক্ত করেছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ভ্যাকসিনটি প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন করেছে।

যেভাবে টিকা দেওয়া হবে শিশুদের: অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, সারা দেশের সব সিটি করপোরেশনে ৫-১১ বছর বয়সী শিশুদের বিদ্যালয়কেন্দ্রিক ভ্যাকসিনেশনের পরবর্তী কার্যক্রম আগামী ২৫ আগস্ট শুরু হবে। পর্যায়ক্রম কমিউনিটি পর্যায়ে দেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই সুরক্ষা ওয়েবপোর্টাল বা অ্যাপের মাধ্যমে ওই বয়সসীমার শিশুদের রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়েছে। রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করতে হবে। সিটি করপোরেশনসমূহের প্রতিটি ওয়ার্ডে নির্বাচিত বিদ্যালয়ে টিকা দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে জেলা, উপজেলা ও পৌরসভাসমূহে বিদ্যালয় ও কমিউনিটি পর্যায়ে এই ভ্যাকসিন পাবে শিশুরা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ৫-১১ বছর বয়সী শিশুকে করোনার টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কভিড-১৯ টিকা কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে নিকটস্থ বিদ্যালয় ভ্যাকসিনেশন সেন্টার (স্কুলপড়ুয়া শিশু) ও পরবর্তীকালে কমিউনিটি পর্যায়ে (স্কুলবহির্ভূত শিশু) নিকটস্থ কেন্দ্র হতে ভ্যাকসিন নিতে পারবে শিশুরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত