দুই মডেলের অভিযোগে হিরো আলমকে জিজ্ঞাসাবাদ

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২২, ০৯:৪৮ এএম

সম্প্রতি দুই মডেলের অভিযোগের ভিত্তিতে আলোচিত-সমালোচিত তারকা আশরাফুল হোসাইন আলম ওরফে হিরো আলমকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে শিল্প-সংস্কৃতির নামে ইউটিউব ও ফেইসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের নিয়ে আপত্তিকর গান প্রচার করা ঠিক কি না।  হিরো আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যম থেকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পর্যন্ত গড়িয়েছে।

জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব নাছিমা বেগম বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো নারী যদি অপরাধ করেও থাকে, তাহলে প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে। তাই বলে কখনোই তার সম্ভ্রমের ওপর কেউ আঘাত হানতে পারে না। তাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ গান বা বক্তব্য প্রচার করার কোনো সুযোগ নেই।’

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদও ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউটিউব ও ফেইসবুক স্বেচ্ছাচারের একটি স্বাধীন চারণভূমি। মানুষের রুচি যখন বাড়বে তখন এগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। তা ছাড়া এগুলো ঠেকানো মুশকিল।’

তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে কোনো মডেল, শিল্পীকে আক্রমণ করবে তাকে (হিরো আলম) এ অধিকার কে দিয়েছে। তা ছাড়া এগুলো শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে একেবারেই যায় না। এটা খুবই খারাপ, ঘোরতর অন্যায়। এটা কেউ করতে পারে না। এ ধরনের কাজ যারা করে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’

ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হিরো আলম কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করে গান গেয়েছে দাবি করে গত মাসের প্রথম সপ্তাহে ডিবির যুগ্ম কমিশনারের (উত্তর) কাছে প্রথম অভিযোগ করেন মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা ও মরিয়ম আক্তার মৌ। এমন কর্মকাণ্ডের কারণে এ দুই মডেল সামাজিক ও পারিবারিকভাবে হেয় হচ্ছেন বলে দাবি করেন তারা।

মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসার অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘ডিজিটাল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হিরো আলম আমাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছে। সে অকথ্য ভাষা ব্যবহার করে একটি গান গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে আমার এবং আমার সামাজিক অবস্থান ক্ষুণ্ন হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তার এমন কর্মকান্ডে আমাদের সমাজের অবক্ষয় হচ্ছে নারীর সম্মানহানি হচ্ছে। ইউটিউব থেকে হিরো আলমের ভিডিওটি সরিয়ে দেওয়া এবং তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হলো।’

ডিবির যুগ্ম কমিশনার (উত্তর) বরাবর একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মডেল মরিয়ম আক্তার মৌ। তার নাম ব্যবহার করে হিরো আলম কুরুচিপূর্ণ গান ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগে করেন। হিরো আলমের এমন কর্মকাণ্ডে তিনি নিজ পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র এবং শ্বশুরবাড়িতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে উল্লেখ করেছেন।  

ইউটিউব ঘেঁটে দেখা গেছে, মডেল, রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে ইউটিউব চ্যানেলে এমন অসংখ্য আপত্তিকর গান রয়েছে হিরো আলমের।

গত বছরের এক আগস্ট ইয়াবা ট্যাবলেট, মদ ও সিসা রাখার অভিযোগে রাজধানীর বারিধারার ৯ নম্বর সড়কের একটি বাসা থেকে ফারিয়া মাহবুব পিয়াসাকে ও মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে মরিয়ম আক্তার মৌ নামের আরেক মডেলকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। পরে তারা জামিনে মুক্তি পান। এ ঘটনার জের ধরেই হিরো আলম ওই গান গেয়েছেন এবং ইউটিউবে ছড়িয়ে দিয়েছেন। 

মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাকে ডিবি যে অভিযোগে গ্রেপ্তার করল সেটা তো এখনো প্রমাণ করতে পারেনি। আর সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিরো আলম বাজে ভাষা ব্যবহার করে বিকৃতভাবে গান করে ইউটিউবে ছেড়েছে। আমি এর বিচার চেয়ে ডিবির কাছে আবেদন করেছিলাম।’

মিডিয়া হিরো আলমের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমারও পরিবার আছে, সমাজ আছে। আর আমার কি বিচার চাওয়ার অধিকার থাকবে না।’ 

বিষয়টি তদন্তে নামে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। ডিবি সূত্র বলছে, তারা হিরো আলমের বিরুদ্ধে আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ পেয়েছে। মডেল ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়েও তিনি বিকৃত গান রচনা করেছেন। এ ছাড়া পুলিশের ইউনিফর্মের (পোশাক) যথেচ্ছা ব্যবহার করেছেন।

এদিকে ভুক্তভোগীরা এখনো সমস্যার সমাধান না পাওয়ার বিষয়ে ডিবির দায়িত্বশীল কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি। জানতে চাইলে ডিবির যুগ্ম কমিশনার (সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ও গোয়েন্দা-উত্তর) খোন্দকার নুরুন্নবী গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ঢাকার বাইরে আছি। সাইবারের ডিসির সঙ্গে কথা বলেন।’

ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ তারেক বিন রশিদ কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আমি কোথাও কথা বলিনি।’

নাম প্রকাশ না করে ডিবির একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হিরো আলমের বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে ডিবি। তবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি আইনের মধ্য থেকেই করা হয়েছে। তারা বলছেন, ইউটিউব বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারও সম্পর্কে মানহানিকর, কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রচার করলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর ২৫/২৯ ধারায় অপরাধ বলে গণ্য হয়। এ ছাড়া সাইবার প্যাট্রলিংয়ে দেখা গেছে হিরো আলমের কন্টেন্টে বেশিরভাগ ব্যক্তিই কমেন্টের মাধ্যমে বিরক্তি প্রকাশ করে থাকেন এবং তার গ্রেপ্তারের দাবি করেন। এ বিষয়ে হাতিরঝিল থানায় একটি জিডি, বগুড়ার নন্দীগ্রামে একটি জিডি, ঢাকার কোর্টে একটি সিআর মামলা রয়েছে এবং হিরো আলমের গানকে গণ-উৎপাত আখ্যা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী তাকে আইনি নোটিস পাঠান। বাংলাদেশের আইনে গণ-উপদ্রব বন্ধ করার দায়িত্ব পুলিশের (পেনাল কোডের ২৯১, ২৯৪ ধারা)।  

গত ২৭ জুলাই রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে ডেকে হিরো আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের পর মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয় ডিবি। মুচলেকাতে বলা হয়েছে, ‘ভবিষ্যতে আমি চলচ্চিত্র বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অশ্লীল কমেডি অডিও-ভিডিও গান, সংস্কৃতি বা ভাষার বিকৃতি, কোনো নির্দিষ্ট পেশা বা পোশাকের অবমাননা বা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করাসহ মানহানিকর ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করা থেকে বিরত থাকব। আমার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ও ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম থেকে নিজ দায়িত্বে উপরোক্ত বিষয়ের সব ধরনের অডিও-ভিডিও সরিয়ে ফেলব। ভবিষ্যতে আমি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ বা বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে নিষিদ্ধ কোনো অপরাধ করব না। এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত হলে আমার বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।’

মুচলেকা দিয়ে বের হওয়ার পর গণমাধ্যমে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন হিরো আলম। ফলে তার জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে হিরো আলম যখন তার সঙ্গে ডিবির আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (বিবিসি) ও এজেন্সি ফ্রান্স প্রেসে (এএফপি) গুরুত্ব সহকারে সংবাদ প্রকাশ পায়। এরপর প্রশ্ন ওঠে, কারও গান গাওয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে কিনা। অনেকে পুলিশের এ কাজকে সাংস্কৃতিক মৌলবাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, হিরো আলম মিথ্যাচার করেছেন। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ডিবি কার্যালয়ে ডাকা হয়েছিল। কোনো রবীন্দ্র বা নজরুল সংগীত গাওয়ার জন্য তাকে ভর্ৎসনা করা হয়নি। গান গাইতে নিষেধও করা হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার বিকৃতভাবে গান গাওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। কিন্তু তিনি গণমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করেছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের ডিসি মো. ফারুক হোসেন গত ৭ আগস্ট এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, হিরো আলমকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়নি। এ বিষয়ে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ তথ্যভিত্তিক নয়।

ডিবির দাবি সম্পর্কে হিরো আলমের বক্তব্য জানার জন্য কয়েক দিন ধরে একাধিকবার তাকে ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে তার সাড়া মেলেনি। গতকাল আবার তাকে ফোন করলে অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, ‘স্যার বাইরে আছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত