বিয়ে ও দাম্পত্যজীবন

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২২, ১১:০১ পিএম

কঠিন সময় অতিক্রম করছি আমরা। খুব দ্রুত ভাঙছে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্নেহের মারাত্মক ঘাটতি দেখা যাচ্ছে প্রচলিত সমাজব্যবস্থায়। আস্থার জায়গার বড় অভাব। পেশাগত নানা ব্যস্ততায় সাংসারিক বন্ধন আলগা হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া পরস্পরের মধ্যে আস্থা, বিশ্বাস ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঘাটতির কারণে সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিনিয়ত অবিশ্বাস। ফলে দীর্ঘ বছর ধরে তিল তিল করে গড়া ভালোবাসার সংসার ভাঙছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ইসলামে বিয়ে : ইসলামি আইন শাস্ত্রে ‘নারী-পুরুষের শারীরিক ও আত্মিক মিলনের সামাজিক স্বীকৃতির চুক্তিকে নিকাহ বা বিয়ে বলে অভিহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯৭৪ ইং অনুযায়ী প্রতিটি বিবাহনিবন্ধন করা আবশ্যক। ওই আইনে বিবাহনিবন্ধন না করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিবাহযোগ্য দুজন নারী ও পুরুষের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক প্রণয়নের বৈধ আইনি চুক্তি ও তার স্বীকারোক্তি। ইসলামে কনে তার নিজের ইচ্ছানুযায়ী বিয়েতে মত বা অমত দিতে পারে। একটি আনুষ্ঠানিক এবং দৃঢ় বৈবাহিক চুক্তিকে ইসলামে বিয়ে হিসেবে গণ্য করা হয়, যা বর ও কনের পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্যের সীমারেখা নির্ধারণ করে। বিয়েতে অবশ্যই দুজন মুসলিম সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে। ইসলামে বিয়ে হলো নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ। ইসলামে বিয়ের জন্য জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

ইসলামে সন্ন্যাস জীবনের কঠোর বিরোধিতা করা হয়েছে। অপছন্দনীয় হলেও ইসলামে তালাকের অনুমতি আছে। তালাক স্বামীর দায়িত্বে, তবে স্ত্রী চাইলে স্বামীর কাছ থেকে তালাকের অধিকার চেয়ে নিতে পারে এবং নিজের এবং স্বামীর পক্ষ থেকে তা নিজের ওপর প্রয়োগ করতে পারে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের (স্বামী-স্ত্রী) একে অন্যের সাথী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া প্রবিষ্ট করে দিয়েছেন।’ সুরা আর রুম : ২১

বিয়ে প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসা কোনো মুসলিম যুবকের দ্বীন এবং ব্যবহার (চরিত্র) তোমাকে সন্তুষ্ট করে, তাহলে তোমার অধীনস্থ নারীর সঙ্গে তার বিয়ে দাও। এর অন্যথায় হলে পৃথিবীতে ফিতনা ও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়বে।’ জামে তিরমিজি

পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে পারস্পরিক সমতা : কুফু হলো ইসলামে বিয়ের ব্যাপারে ইসলামি আইন শাস্ত্রের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি শব্দ, এর অর্থ সমতা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এই সামঞ্জস্য ধর্ম, সামাজিক মর্যাদা, নৈতিকতা, ধার্মিকতা, সম্পদ, বংশ বা রীতিনীতির অন্তর্ভুক্ত একাধিক কারণের ওপর নির্ভরশীল। বিয়ের সময় এগুলোর প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ রাখা।

স্বামীর ওপর স্ত্রীর হক : স্ত্রীর সঙ্গে সর্বদা ভালো আচরণ করা। স্ত্রীর কোনো কথায় বা কাজে কষ্ট পেলে ধৈর্য ধারণ করা। উচ্ছৃঙ্খল, বেপর্দা চলাফেরা করতে থাকলে নম্র ভাষায় তাকে বোঝানো। সামান্য বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ না করা। কথায় কথায় ধমক না দেওয়া। রাগ না করা। স্ত্রীর আত্মমর্যাদায় আঘাত করে এমন বিষয়ে সংযত থাকা। শুধু শুধু স্ত্রীর প্রতি কুধারণা না করা। স্ত্রীর সম্পর্কে উদাসীন না থাকা। সামর্থ্যানুযায়ী স্ত্রীর আহার-পোশাক দেওয়া। অপচয় না করা। নামাজ পড়া এবং দ্বীনের আহকাম মেনে চলার জন্য উৎসাহ দিতে থাকা। শরিয়ত পরিপন্থী কাজ থেকে বিরত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা। একান্ত নিরুপায় না হলে তালাক না দেওয়া।

স্ত্রীর ওপর স্বামীর হক : সর্বদা স্বামীর মন জয় করার চেষ্টা করা। স্বামীর সঙ্গে অসংযত আচরণ না করা। স্বামীকে কষ্ট না দেওয়া। শরিয়তসম্মত প্রত্যেক কাজে স্বামীর আনুগত্য করা। গোনাহ এবং শরিয়তবিরোধী কাজে অপারগতা তুলে ধরা এবং স্বামীকে নরম ভাষায় বোঝানো। প্রয়োজনাতিরিক্ত ভরণ-পোষণ দাবি না করা। পরপুরুষের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক না রাখা। স্বামীর অনুমতি ছাড়া কাউকে ঘরে ঢোকার অনুমতি না দেওয়া। অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া। স্বামীর সম্পদ হেফাজত করা। শ্বশুর-শাশুড়িকে সম্মানের পাত্র মনে করা। তাদের ভক্তি-শ্রদ্ধা করা। ঝগড়া-বিবাদ কিংবা অন্য কোনো উপায়ে তাদের মনে কষ্ট না দেওয়া।

বিয়ের উদ্দেশ্য তালাক নয় : বিয়ের মাধ্যমে যে দাম্পত্য সম্পর্কের সূচনা হয় তা অটুট থাকা এবং আজীবন স্থায়িত্ব লাভ করা ইসলামে কাম্য। সুতরাং স্বামী কখনো বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করার চেষ্টা করবে না এবং বিবাহবিচ্ছেদের পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে না। কেননা বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হলে এর কুপ্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং গোটা পরিবারটিই তছনছ হয়ে যায়, সন্তানসন্ততির জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং আবেগের বশীভূত হয়ে নয়; বরং বুঝে-শুনে, চিন্তা-ফিকির করে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

তালাক কোনো সমাধান নয় : সমঝোতা সবখানে দরকার। সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র সবখানে। সমঝোতা শান্তি আনে। সমঝোতা মানেই পরিস্থিতিকে মানিয়ে নেওয়া। স্বাবলম্বী নারী অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর অন্যায় আচরণ মেনে নিতে না পেরে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে বিয়ের পর একটা দম্পতির মধ্যে প্রেম ও ভালোবাসার তীব্রতা থাকে ৪-৫ বছর। এরপর দুজনের মধ্যে মায়ার বাঁধন তৈরি হয়। মায়ার বাঁধন তথা সন্তানসন্ততি সংসারটিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মায়ার বাঁধন নাই। কেউ কাউকে মায়ায় জড়াতে চায় না। একজনের অন্যজনকে ভালো লাগছে না ব্যস হঠাৎ করেই নেওয়া হলো বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত। পরবর্তী সময়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেকেই আবার অনুশোচনায় ভোগে।

সংসার তো আসলে একটি ঘরের মধ্যে দুজন বিপরীতমুখী মানসিকতার মানুষের আবাসস্থল নয়। সংসার মানে হলো স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের মধুরতম জায়গা। এখানে মায়া ও মমতা দরকার। দুজনের মধ্যে কমিউনিকেশন গ্যাপ থাকলে সংসার কখনোই সুখের হয় না। এ ক্ষেত্রে বিচ্ছেদই ভালো। তবে একটা কথা মনে রাখা দরকার বিচ্ছেদ কখনোই কাম্য নয়। বিচ্ছেদ মানুষকে সংকীর্ণ করে। সংকীর্ণ মনের মানুষ কখনোই সমাজে আলো ছড়ায় না।

শেষ কথা : সুখী দাম্পত্য গঠন কারও একার কাজ নয়, প্রয়োজন যৌথ প্রচেষ্টার। ব্যাপারটা শুধু মুখ ও কলমের নয়, বরং কাজের। তাই আমূল সংস্কার ও পরিবর্তন সাধনের জন্য চাই আবালবৃদ্ধবনিতার সম্মিলিত ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, যার শীর্ষে থাকবে আল্লাহভীতি; পরকালের প্রতি পূর্ণ ইমান, হিসাব-নিকাশ ও জবাবদিহির ভয়, দোজখের শঙ্কা এবং বেহেশতের আশা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত