রাজধানীতে বাস ভাড়ায় নৈরাজ্য থামছে না। ওয়েবিল ব্যবস্থা বন্ধ করার ঘোষণা দিলেও সেটা কোনো কোনো রুটে এখনো বহাল। এ অবস্থায় নৈরাজ্য বন্ধে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সঙ্গে মাঠে নামছে পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে জানান, দুদিন আগে বিআরটিএর সঙ্গে তাদের একটা বৈঠক হয়েছে। বাস ভাড়া নিয়ে সব ধরনের নৈরাজ্য বন্ধ করা হবে। পরিবহন মালিকরাও সহায়তা করবেন বলে জানিয়েছেন। পুলিশের ভ্রাম্যমাণ টিম প্রস্তুত আছে। বিআরটিএ যখনই সহায়তা চাইবে তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া হবে। তা ছাড়া ট্রাফিক পুলিশ এই নিয়ে কাজ করছে। তাদের কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিবহন ভাড়া নিয়ে নানা অভিযোগ আসছে। এই নিয়ে বিআরটিএ কাজ করছে। তারা আমাদের কাছে কোনো সহায়তা চাইলে তাদের সব ধরনের সহায়তা করা হবে।’
গত ৫ আগস্ট সরকার সবধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরদিন দূরপাল্লা ও নগর পরিবহনের বাস ভাড়া বাড়ানো হয়। এর আগে গত বছরের নভেম্বরেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর বাস ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে আগে প্রতি কিলোমিটারে বড় বাসের ভাড়া ছিল ২ টাকা ১৫ পয়সা, এখন তা ২ টাকা ৫০ পয়সা। মিনিবাসে আগে ছিল ২ টাকা ৫ পয়সা, বাড়িয়ে করা হয়েছে ২ টাকা ৪০ পয়সা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বড় বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া আগেরটাই ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত সোমবার পরিবহন নেতারা রাজধানীতে ওয়েবিল ব্যবস্থা বন্ধ করার ঘোষণা দেন। এর আগে গত বছরও বাস ভাড়া বাড়ানোর পর একই ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা। কিন্তু গত বছরের মতো এবারও তাদের ঘোষণা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। পরিবহন নেতারা বলেছিলেন, বুধবার থেকে ওয়েবিল ওঠে যাবে।
কিন্তু ওয়েবিল নিয়ে আবারও শুরু হয়েছে কালক্ষেপণের কৌশল। ওয়েবিলে বাস চলছে কি না, একজন গণমাধ্যমকর্মী ফেইসবুকে এই প্রশ্ন রাখার পর ফাহিদ মোনায়েম নামে একজন কমেন্টে লেখেন, ‘রামপুরায় আলিফ, রবরব, অছিম, রাজধানী, স্বাধীন, রমজান এরা ওয়েবিল ও চেক করছে। চেক ও চেকের আগে উঠলেই বিল দিতে হবে।’ হাসান ইমন নামের আরেকজন লেখেন, ‘রামপুরা বনশ্রী, মেরাদিয়া, ত্রিমোহনী ব্রিজে চেকার দেখা গেছে, রাজধানী, অছিম, আলিফ পরিবহনে দেখা গেছে।’
রাজধানীতে নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করা হয় যে কৌশলে সেই ওয়েবিল ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার অঙ্গীকার করেও কথা রাখেননি বাসমালিকরা। ওয়েবিলে নয়, কিলোমিটার হিসেবে ভাড়া কাটা হবে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মালিক সমিতি এমন ঘোষণা দেওয়ার পরও বৃহস্পতিবার ও গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে বাস ভাড়ায় সেই নৈরাজ্য দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সাভার থেকে যাত্রীবাড়ী রুটে চলা এমএম লাভলী ও লাব্বাইক পরিবহন, মোহাম্মদপুর থেকে বনশ্রী রুটের স্বাধীন পরিবহন, ঘাটারচর-উত্তরা রুটের প্রজাপতি ও পরিস্থান পরিবহন, গাবতলী-উত্তরা রুটের বসুমতি, মোহাম্মদপুর-শাহবাগ-বনশ্রী রুটের তরঙ্গ প্লাস, মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটি থেকে বনশ্রী ও মিরপুর-১ থেকে বনশ্রী রুটে চলা আলিফ পরিবহন, গাবতলী-বাড্ডা লিংক রোড রুটের রবরব পরিবহন, গাবতলী-ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার রুটের আছিম পরিবহন, একই রুটের রাজধানী পরিবহন, মোহাম্মদপুর-সায়েন্স ল্যাব-বনশ্রী রুটের রমজান পরিবহন, রায়েরবাগ-গুলিস্তান রুটের শ্রাবণ পরিবহন, মিরপুর চিড়িয়াখানা-কেরানীগঞ্জ রুটের দিশারী পরিবহন এখনো ওয়েবিলে ভাড়া নিচ্ছে।
ওয়েবিলে বাড়তি ভাড়া কেন নিচ্ছে জানতে চাইলে এম এম লাভলী পরিবহনের ভাড়া কাটার দায়িত্বে থাকা মো. আনোয়ার বলেন, ‘ভাই আমি নতুন মানুষ। অল্প কয়েক দিন এই বাসে কাজ করতেছি। বুঝি না।’
কেন ওয়েবিল নিয়ে এমন নাটক জানতে চাইলে গত নভেম্বরের মতোই এবারও বাসমালিকদের সমিতি ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের কাজটা করতে দেন। আমরা তো শুরু করলাম মাত্র। আমাদের করতে দেন। আপনারা কীভাবে মনে করেন এটা দুই-চার-দশ দিনে হয়ে যাবে? আমরা এটা নিয়ে কয়েক মাস কাজ করব। সব ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আমরা মাঠে থাকব।’ তিনি বলেন, ‘এদের সিস্টেমে আনার জন্য আমরা সবসময় চেষ্টা করতেছি। আমি বিআরটিএ’র ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে বসেছি। আমাদের ৯টি দল মাঠে কাজ করতেছে। একেক দলে মিনিমাম পাঁচজন কাজ করছে।’
বিভিন্ন রুটের বাসে ন্যূনতম ভাড়ার নির্ধারিত হার না মেনে সর্বনিম্ন ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ১৫ টাকা, কেউবা ২০ টাকা বা তার চেয়ে বেশি নিচ্ছে। আবার চার কিলোমিটারের ভাড়া ২০ বা ২৫ টাকা আদায় করা হচ্ছে। যদিও এই দূরত্বের জন্য ভাড়া হওয়ার কথা ১০ টাকা। বেসরকারি বাস কোম্পানির পাশাপাশি হাতিরঝিলে রাজউক পরিচালিত চক্রাকার বাসও এই অনিয়মে শামিল। তিন কিলোমিটারে ২০ টাকা, চার কিলোমিটারে ২৫ টাকা আদায় করা হচ্ছে এই বাসে। অথচ নির্ধারিত হার অনুযায়ী এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত সর্বোচ্চ ভাড়া হওয়ার কথা ১০ টাকা।
ওয়েবিল ও ভাড়া নৈরাজ্য নিয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজধানীর ১১টি স্পটে ১১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে শতাধিক বাসকে জরিমানাও করা হয়েছে। বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) আজিজুল ইসলাম ও উপপরিচালক হেমায়েত উদ্দিন ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম তদারকি করেন। অভিযানকালে বাস মিনিবাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের সহযোগিতা লাগলে অবশ্যই নেওয়া হবে। পুলিশের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ আছে।’
