সারা দেশে চা বাগানে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে শ্রমিকরা

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২, ০৩:২৭ এএম

বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা করাসহ বিভিন্ন দাবিতে সারা দেশে চা-শ্রমিকদের ধর্মঘট চলছে। গতকাল শনিবার থেকে একযোগে সারা দেশের সব চা-বাগানে অনির্দিষ্টকালের এই ধর্মঘটের ডাক দেয় বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়ন।

এর আগে দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে গত মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত টানা চার দিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করেন চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের ২৩১টি চা-বাগানের শ্রমিকেরা। দাবি না মানায় ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল একযোগে দেশের ১৬৭টি চা-বাগানে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে এই ধর্মঘট ঘোষণা করেন।

চা-শ্রমিক নেতারা জানান, প্রতি দুই বছর অন্তর চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চুক্তি হওয়ার কথা। বর্তমানে মজুরি চুক্তির মেয়াদ প্রায় ১৯ মাস উত্তীর্ণ হয়েছে। চা-শ্রমিক ইউনিয়ন নেতারাসহ বিভিন্ন সংগঠন মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে এলেও সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে কোনো কর্ণপাত করছে না। ফলে চা-শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন ভ্যালি কমিটির উদ্যোগে কয়েক দিন ধরে দুই ঘণ্টা করে চা-বাগানগুলোতে কর্মবিরতি ও প্রতিবাদ সমাবেশ পালন করা হয়।

বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দি জানান, গতকাল সকাল থেকে দেশের ২৩১টি চা-বাগানের প্রায় দেড় লাখ চা-শ্রমিক ধর্মঘট পালন শুরু করেন। সকাল থেকেই শ্রমিকদের ধর্মঘট সর্বাত্মœকভাবে পালিত হয়।

সরেজমিনে মৌলভীবাজারের ভাড়াউড়া চা-বাগানে গিয়ে দেখা যায়, চা-শ্রমিকরা বাগানের নাট মন্দিরের সামনে জড়ো হয়েছেন। সবাই কাজ বন্ধ রেখে প্রতিবাদ সমাবেশ করছেন এবং বিভিন্ন সেøাগান দিচ্ছেন। পরে দুপুর ১২টার দিকে দুই হাজারের বেশি চা-শ্রমিক ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক এক ঘণ্টার জন্য অবরোধ করে রাখেন।

বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পংকজ কন্দ বলেন, ‘আমাদের ৩০০ টাকা মজুরির দাবিটি খুবই যৌক্তিক। বর্তমান বাজারমূল্যের সাথে সমন্বয় করে যাতে চা-বাগানের মালিকপক্ষ আমাদের মজুরি বৃদ্ধি করে ৩০০ টাকা করে।’

বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ‘৩ আগস্ট আমরা মালিকদের কাছে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির জন্য ১ সপ্তাহের আল্টিমেটাম দিয়েছিলাম; কিন্তু তারা তা কর্ণপাত করেননি। এর প্রতিবাদে আমরা চার দিন ধরে সারা দেশের সব চা-বাগানে দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করে যাচ্ছি। তারপরও মালিকপক্ষ আমাদের দাবি মেনে না নেওয়ায় আমরা ধর্মঘটের মতো কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিনিয়ত নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে চলেছে। অথচ বাংলাদেশের চা-শ্রমিকরা ১২০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। দুই বছর পর পর শ্রমিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়ন ও বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা সংসদ নেতাদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়। গত চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। এরপর ১৯ মাস কেটে গেলেও মালিকপক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে নতুন চুক্তি করেনি।’

তবে চা-বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট বিভাগীয় চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ শিবলী বলে বলেন, ‘উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলমান থাকা অবস্থায় আন্দোলনে যাওয়া শ্রমিকদের উচিত হয়নি। এটি শ্রম আইনেরও পরিপন্থী, চায়ের এই ভরা মৌসুমে কাজ বন্ধ থাকলে মালিক-শ্রমিক উভয়েরই ক্ষতি হবে। আমরা আশা করব শ্রমিকরা দ্রুত কাজে ফিরবেন।’

কমলগঞ্জে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ২২টি ও কুলাউড়ার ১টি চা-বাগানে গতকাল সকালে কারখানাসহ প্লান্টেশন এলাকার কাজ বন্ধ রেখে নারী-পুরুষ চা-শ্রমিকরা একযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। এ সময় বিভিন্ন স্থানে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তারা।

সকালে উপজেলার মাধবপুর, মদনমোহনপুর, শ্রীগোবিন্দপুর ও দলই চা-বাগানের শ্রমিকরা তাদের নিজ নিজ বাগানের প্রধান ফটকের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে মাধবপুর বাজারে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ সভা করেন।

অন্যদিকে দুপুরে কুরমা, চাম্পারায় চা-বাগানের শ্রমিকরা কমলগঞ্জ-কুরমা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। একই সময়ে আলীনগর চা-বাগানের শ্রমিকরা শমসেরনগর-কমলগঞ্জ সড়কের হালিমাবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষাভ করেন। শমসেরনগর চৌমুহনীতে সড়ক অবরোধ করে সহ¯্রাধিক নারী-পুরুষ চা-শ্রমিক এসে প্রতিবাদ সভা করেন। এরপর বেলা দেড়টায় প্রায় আট কিলোমিটার হেঁটে চাতলাপুর চা-বাগানের আরও সহ¯্রাধিক চা-শ্রমিক এসে শমসেরনগর চৌমুহনীতে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। একইভাবে ফুলবাড়ী চা-বাগানের শ্রমিকরা কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

হবিগঞ্জে ২৪ বাগানের শ্রমিকরা ধর্মঘটে : হবিগঞ্জের ২৪টি চা-বাগানের শ্রমিকরা ধর্মঘট পালন করেছেন। গতকাল সকাল ১০টা থেকে  ধর্মঘটের পাশপাশি বিক্ষোভ ও মানববন্ধন  করেন তারা। দুপুর ১২টার দিকে জেলার চুনারুঘাট উপজেলার চান্দপুর এলাকায় ঢাকা-সিলেট পুরনো মহাসড়কে অবস্থান নেন শ্রমিকরা। সেখানে ২৪টি বাগানের শ্রমিকরা জড়ো হতে থাকেন। বেলা দেড়টার মধ্যে সেখানে অন্তত ১০ হাজার শ্রমিক সমবেত হন। পরে রওনা হন উপজেলা শহরের উদ্দেশ্যে। তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। ছিঁড়ে দেওয়া হয় ব্যানার। একপর্যায়ে শ্রমিকরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে শহরে প্রবেশ করে চুনারুঘাট থানা গেটের সামনে প্রধান সড়কে অবস্থান নেয়।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলার প্রতিনিধিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত