রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বঙ্গবন্ধুর তিন খুনির নামে বরাদ্দ প্লটের দুটি বাতিল করা হয়েছে। আর একটি অন্যের কাছে হস্তান্তর করায় সেটা বাতিল করা যায়নি। আইনি জটিলতার কারণে বাতিল করা দুটি প্লটও সরকার এখনো বুঝে পায়নি। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল একটি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নথিপত্রে যে তিনজনের নামে প্লট বরাদ্দ রয়েছে তারা হলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) নূর চৌধুরী ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশিদ। তারা সবাই পলাতক।
এর মধ্যে ডালিম ও নূরের প্লট বাতিল করা হয়েছে। বরাদ্দ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার আগেই আবদুর রশিদের প্লটটি তার স্ত্রী মিসেস জোবাইদার নামে হস্তান্তর করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে খুনিদের পক্ষের কারও দখলে নেই এসব প্লট। বাতিল হওয়া প্লটে আদালত থেকে রিসিভার নিয়োগ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞার মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
আর গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ একটি বৈঠকে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদক প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব হেমন্ত হেনরী কুবীর শরণাপন্ন হলে তিনি প্রতিমন্ত্রীর বরাত দিয়ে বলেন, ‘বিদ্যমান আইন অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের নামে থাকা প্লট বাতিল করেছে রাজউক। সেই সঙ্গে নামে-বেনামে তাদের আরও কোনো সম্পত্তি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা, কোনো সংস্থার আওতায় আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি কোনো সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে সেগুলোও বাতিল করে সরকারের অনুকূলে ফিরিয়ে আনা হবে।’
রাজউক সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শরিফুল হক ডালিম প্লটের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেন। এরপর ১৯৮৭ সালের ২৬ এপ্রিল গুলশান আবাসিক এলাকার ৩৫ নম্বর সড়কে ৫ কাঠা আয়তনের ২৩ নম্বর প্লটটি তাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দ পাওয়ার পর প্লটটি ১৯৯৪ সালের ৪ মে সোনালী ব্যাংকের ঢাকা সেনানিবাস শাখার কাছে বন্ধক দেন ডালিম। ১৯৯৬ সালের ৭ অক্টোবর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পক্ষ থেকে ১৫ আগস্ট হত্যাকা- ও ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত আসামিদের সম্পত্তি হস্তান্তরের অনুমতি না দিতে বলা হয়। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালে ধানম-ি থানায় করা মামলা [নম্বর ১০ (১০)] অনুযায়ী আদালত পলাতক আসামিদের সম্পত্তি দেখাশোনা করার জন্য রাজউকের এস্টেট অফিসারকে রিসিভার নিয়োগ করার আদেশ দেয়। এ অবস্থায় সোনালী ব্যাংক অর্থঋণ আদালতে মামলার মাধ্যমে ডালিমের প্লট নিলামে বিক্রি করে দেয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, রাজউকের মালিকানাধীন প্লটের ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়া ও নিলামের আগে রাজউকের অনুমতি নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ প্লটটি নিলামে মেসার্স তুসুকা প্রপার্টিজ লিমিটেড কিনে নেয়। এরপর ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর সরকার গঠিত টাস্কফোর্সের ১২তম সভায় দ-প্রাপ্তদের ব্যাপারে বলা হয়, ‘আইন মোতাবেক আদালতের রায় ঘোষণার পর হতে বিবেচনা করে দ-প্রাপ্ত ও পলাতক আসামির সম্পত্তি ক্রোক ও বাজেয়াপ্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’ বিষয়টি রাজউকের চতুর্থ বোর্ড সভায় তোলা হলে ডালিমের প্লটটি বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। পরে রাজউক প্লটের দখল বুঝে পাওয়ার জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। তবে এখনো যথাযথ হস্তান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজউক প্লটটির দখল বুঝে পায়নি।
রাজউকের এস্টেট শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, কাগজপত্রে ডালিমের প্লটটি বাতিল করলেও তা রাজউকের হাতে আসেনি। কারণ প্লটটি বন্ধক থাকায় তা নিলামে বিক্রি করে দিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আরেক আসামি পলাতক নূর চৌধুরীর নামে গুলশান আবাসিক এলাকার ২৩/বি রাস্তার ৪ নম্বর প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পরে প্লটটির বরাদ্দ বাতিল করলেও নিজেদের দখলে নিতে পারেনি রাজউক।
এ বিষয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নূর চৌধুরীর প্লটটি এই মুহূর্তে খালি অবস্থায় রয়েছে। আদালত থেকে ক্রোক আদেশ থাকায় এ প্লটটিতে বর্তমানে রিসিভার নিয়োগ করা হয়েছে। রিসিভার নিয়োগের ফলে তা দেখভাল করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যতক্ষণ পর্যন্ত রাজউকের কাছে প্লটটি হস্তান্তর না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তা রাজউকের হাতে বা সরকারের কাছে আছে এমন দাবি করা যাচ্ছে না।
আবদুর রশিদের স্ত্রী জোবাইদার নামে গুলশান আবাসিক এলাকার এনডব্লিউ (ই) ব্লকের ৫৫ নম্বর রাস্তার ৭ নম্বর প্লটটি বরাদ্দ রয়েছে। এটি রশিদের নিজের নামে না থাকায় রাজউক তা বাতিল করতে পারেনি।
বনানী ডিওএইচএস এলাকায় ইস্টার্ন রোডে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফারুকের নামে প্রায় ১৯ কাঠা আয়তনের ১৫ নম্বর প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্লটটি ফারুক তার মা মাহমুদা রহমানের কাছে হস্তান্তর করেন। তার মা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কসবা হাউজিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। এরপর হাউজিং কোম্পানি ভবন নির্মাণ করে বেশ কিছু ফ্লোর বিক্রি করে দেয়।
জানতে চাইলে রাজউকের এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্লট রাজউক বাতিল করেছে আরও আগেই; আবার দুই-একটি প্লট আছে সেগুলো বরাদ্দ পাওয়ার পর অন্যদের কাছে হস্তান্তর করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। হস্তান্তর হয়ে গেলে তা আর বাতিল করার এখতিয়ার রাজউকের নেই। যেগুলো রাজউক থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তা রাজউক বুঝে না পেলেও সেখানে আদালতের নির্দেশে রিসিভার নিয়োগ করা আছে। কোনো প্লটই খুনিদের স্বজনের হাতে নেই।
