তেলের দাম ও মুনাফা বনাম জনগণের ব্যয়

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২২, ১১:১৮ পিএম

রেকর্ড করতে এবং রেকর্ড গড়তে চায় সবাই। যদিও সবকিছুর রেকর্ড করা ভালো নয়। দেশে নতুন নতুন নানা রেকর্ড সৃষ্টি হওয়া দেখে এই কথা মানবেন অনেকেই। যেমন জ্বালানি তেলের দাম ৪২ থেকে ৫২ শতাংশ বাড়ানো দেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় ঘটনা। এটি একটি নতুন রেকর্ড। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকার পরিমাণ বেড়েছে। এটিও রেকর্ড। আর জনগণের দুর্দশা বেড়েছে এই রেকর্ডের কথা বললে অনেকেই হই হই করে বলবেন আগে যে আরও খারাপ ছিল তা বলবেন না?

ক্ষমতাসীনদের কেউ স্বীকার করতে না চাইলেও বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণে দেশের অর্থনীতি এখন চরম চাপে আছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকারত্বসহ নানা সমস্যায় মানুষ জর্জরিত। এমন সময় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ভুগবে নিম্ন আয়ের ও নির্ধারিত আয়ের মানুষ। বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং দেশে কৃষি উৎপাদন কমলে আমদানি বাড়বে। ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি কমবে। মূল্যবৃদ্ধির ফলে এখন এক লিটার ডিজেল ও কেরোসিন কিনতে ১১৪ টাকা লাগবে। এক লিটার অকটেনের জন্য দিতে হবে ১৩৫ টাকা। আর প্রতি লিটার পেট্রলের দাম হবে ১৩০ টাকা।

মন্ত্রী বলছেন নিরুপায় হয়ে তারা এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছেন। কারণ বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে, লোকসান বেড়ে যাচ্ছে সেটা না কমালে দেউলিয়া হয়ে যাবে বিপিসি আর দাম না বাড়ালে ভারতে তেল পাচার হয়ে যাবে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী তেলের দাম কমে যাওয়া এবং দরপতনের সঙ্গে মন্ত্রীর কথার তো কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। অতীতে যখন দাম কমে গিয়েছিল তখন যে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা লাভ হয়েছিল তার সুফল যেমন জনগণ পায়নি আবার এখন দাম যে কমতির দিকে তার কারণেও স্বস্তি পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ।

ডিজেলের দাম বিশ্ববাজারে ব্যারেলে ১৭০ ডলার থেকে নেমে ১৩০ ডলারে নেমে এসেছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমে ১০০ ডলারের মধ্যে এসেছে।

এই দর আরও কমবে এবং ৭০ থেকে ৮০ ডলারে নামতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।

বিশ্ববাজারে যখন দাম পড়তির দিকে তখন দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে জর্জরিত সাধারণ মানুষের জীবনে পেট্রো পণ্যের এই উচ্চহারে মূল্যবৃদ্ধি মরণ আঘাতের মতো মনে হবে। নাগরিক জীবনে এর প্রভাব পড়বে বিদ্যুতের দাম, পানির দাম, পরিবহন ব্যয়, খাদ্যপণ্যের দামসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে। কারণ বিপিসির বিক্রি করা মোট জ্বালানি তেলের ৬৫ শতাংশ ব্যবহার করে পরিবহন খাত। প্রায় ১৬ শতাংশ ব্যবহৃত হয় কৃষি খাতে। শিল্প খাতে ৭ ও বিদ্যুৎ খাতে ১০ শতাংশ তেল ব্যবহৃত হয়।

পরিবহনে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। দূরপাল্লার ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটার ৪০ পয়সা আর মহানগরে প্রতি কিলোমিটারে ৩৫ পয়সা। সরকার পরিবহন মালিক সমিতির সঙ্গে বৈঠক করে যে ভাড়া বৃদ্ধি করেছে তা তেলের মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি। যেমন ঢাকা-রংপুর দূরত্ব ধরা হয় ৩০৮ কিলোমিটার। এক লিটার ডিজেলে নাকি মহাসড়কে সোয়া তিন কিলোমিটার চলে। এই হিসাব ধরে রংপুর যেতে তেল লাগবে ৯৪ লিটার। প্রতি লিটারে দাম বেড়েছে ৩৪ টাকা, ফলে প্রতি ট্রিপে খরচ বাড়বে ৩২০০ টাকা। ৪০ সিটের বাসে নাকি ২৮ জন যাত্রী যাওয়া-আসা করে। তাহলে ভাড়া বাড়ানোর কথা ১১৪ টাকা। সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে ১৫৭ টাকা, আর মালিকরা যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করছে ২০০ টাকা বেশি। ঢাকা মহানগরে প্রতি কিলোমিটার ২.৫০ টাকা আর সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা। প্রেস ক্লাব থেকে শাহবাগ দেড় কিলোমিটারের মতো, ভাড়া হওয়ার কথা ৩ টাকা ৭৫ পয়সা। কিন্তু মালিকদের স্বার্থে সরকার যে ভাড়া নির্ধারণ করেছে, মালিকরা নিচ্ছে তার চেয়েও বেশি।  

এখন আমন ধান চাষের মৌসুম। ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়। এ বছর জুনে বন্যা হলেও এবার বৃষ্টিবিহীন শ্রাবণ মাস। ফলে সেচের পানিই প্রধান ভরসা। প্রতি বিঘা জমিতে সেচ দিতে ২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। তাহলে সেচের জন্য খরচ লাগবে ২২৮০ টাকা। আর এবারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত লাগবে ৬৮০ টাকা। প্রতি বিঘায় ইউরিয়া সার লাগে ৩৫ কেজি। কদিন আগেই সরকার সারের দাম কেজিতে ৬ টাকা বাড়ানোর ফলে প্রতি বিঘায় খরচ ২১০ টাকা বাড়বে। জমি চাষ করে পাওয়ার টিলার বা ট্রাক্টর দিয়ে। এতে খরচ বাড়বে ২৫০ টাকা। সব মিলিয়ে ধান চাষে প্রতি বিঘা জমিতে ১,২০০ টাকার মতো খরচ বাড়বে কৃষকের। কৃষিকাজে ১৫ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয়, যার ৭৫ শতাংশ ডিজেলচালিত। যদি সেচ, সারে খরচ বৃদ্ধিতে কৃষক সার বা সেচ কম দেয় এবং বিঘাপ্রতি মাত্র ১ মণ ধান কম ফলন হয় তাহলে ১৬ লাখ টন ধান কম উৎপাদন হবে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। ধানের উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশ বড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। আবার শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়লে গার্মেন্টস, পাট, চামড়াসহ সব রপ্তানিতেই প্রভাব পড়বে। আর তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে। এর প্রভাব পড়বে সর্বত্র। এরই মধ্যে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ওয়াসা পানির দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।

এখন দেখা যাক বিশ্ববাজারে দামের প্রভাবে তেলের দাম কত বাড়তে পারে? এক ব্যারেল সমান ১৫৯ লিটার। পরিশোধিত তেলের দাম যদি ১৩০ ডলারও হয় তাহলে প্রতি লিটারের দাম কত হবে? ঐকিক নিয়মে হয় ৭৮ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহন খরচ, কমিশন, সিস্টেম লস ইত্যাদি যুক্ত করলে ৮৫ টাকার বেশি হবে না। তারপর থাকে সরকারের ভ্যাট ট্যাক্স ও অন্যান্য বিষয়। আর যদি অপরিশোধিত তেল আনে তাহলে দাম ৯৫ ডলার অর্থাৎ প্রতি লিটার দাম পড়ে ৫৭ টাকা। তবে এখানে একটা বিষয় আছে। রিফাইন করার খরচ, রিফাইন করতে গিয়ে ডিজেল কিছুটা কমে যাওয়া ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করতে হবে। একটা মজার বিষয় হলো এই যে পেট্রোলিয়ামের কিছুই ফেলে দেওয়া যায় না বরং রিফাইন করার সময় প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে যায়। একে বলে প্রসেস গেইন। আর পাওয়া যায় পরিশোধিত তেল ৫০ শতাংশ, পাতনকৃত (ডিস্টিল্ড) জ্বালানি তেল ২৭ শতাংশ, জেট ফুয়েল ৬ শতাংশ, পেট্রোলিয়াম কোক ৪ শতাংশ, গ্যাস ৩ শতাংশ, হাইড্রকার্বন গ্যাস লিকুইড ৩ শতাংশ, অ্যাশফল্ট এবং আলকাতরা ২ শতাংশ, মবিল জাতীয় লুব্রিকেন্ট ১ শতাংশ, পেট্রো কেমিক্যাল ফিড স্টক ১ শতাংশ এবং অন্যান্য বিষয় ১ শতাংশ। (সূত্র : আমেরিকান এনার্জি ইনফরমেশন কর্র্তৃপক্ষ, আগস্ট ২০২১)

বাংলাদেশে পরিশোধন খরচ কত? দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি ২০১৯-২০ অর্থবছরে পরিশোধিত খনিজ তেলের পরিমাণ ১০.৭৮ লাখ টন এবং খরচ ১৩১ কোটি টাকা। ১১ লাখ টন তেল পরিশোধনের খরচ ১৩১ কোটি টাকা হলে প্রতি টনে খরচ পড়ে প্রায় ১,২০০ টাকা অর্থাৎ প্রতি লিটারে ১.২০ টাকা। তাহলে জনজীবনে দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সরকার ভ্যাট ট্যাক্স ৩০ শতাংশ না নিয়ে কিছু কমালে ৭০-৭৫ টাকায় তেল বিক্রি করা সম্ভব।

আর গত ২৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘অকটেন এবং পেট্রল কিন্তু আমাদের কিনতে হয় না। এটা আমরা যে গ্যাস উত্তোলন করি, সেখান থেকে বাই প্রোডাক্ট হিসেবে পেট্রল ও অকটেন পাই। বরং অকটেন আমাদের যতটুকু চাহিদা তার চেয়ে অনেক বেশি পেট্রল ও অকটেন আমাদের আছে। আমরা অনেক সময় বাইরে বিক্রিও করি।’ প্রধানমন্ত্রীর কথা কি অবিশ্বাস করা যায়?

জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিপিসি গত ছয় মাসে (ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই) জ্বালানি তেল বিক্রি করে ৮ হাজার ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। কিন্তু সাত বছরে (২০১৫-২১) বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেল বিক্রি করে ৪৬ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা লাভ করেছে। এর মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারকে দিয়েছে। বাকি ৩৬ হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়? অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২০১৫ সালে ৪ হাজার ১২৬ কোটি, ২০১৬ সালে ৯ হাজার ৪০ কোটি, ২০১৭ সালে ৮ হাজার ৬৫৩ কোটি, ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা লাভ করেছে বিপিসি। এ ছাড়া ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৭৬৮ কোটি, ২০১০ সালে ৫ হাজার ৬৭ কোটি এবং ২০২১ সালে ৯ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা লাভ করেছে। বিপিসি এই লাভের টাকা বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় করে ২৫ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে রেখেছে। তাহলে বিপিসি দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে এ কথা বলা হলো কেন? বিপিসি চাইলে তো এ সংকট সময়ে জ্বালানি তেলের ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে পারত।

সবশেষে দুটো কথা। বর্ডার গার্ডের পরিচালক বলেছেন, তেল পাচারের কথা অবান্তর আর বিপিসি বলেছে, মূল্যবৃদ্ধির ফলে জ্বালানি বিক্রি করে মাসে ২০১৫ কোটি টাকা অর্থাৎ বছরে ২,৫০০ কোটি টাকা মুনাফা হবে।

সারের দাম, তেলের দাম, পানির দাম বাড়ল, এরপর আসবে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা। সরকার ট্যাক্স কমাল না, তেলের দাম বাড়াল। এর ফলে ব্যবসায়ী এবং সরকার মিলে জনগণের পকেট থেকে বের করে নেবে ৪০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির পথ তো নেই। কেমন করে বেঁচে থাকবে তারা? খাওয়ার খরচ আর জীবনের অন্যান্য ব্যয় কমানোর পথ খুঁজতে খুঁজতে তাদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

 [email protected]  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত