ঢাকা কলেজ থেকে সদ্য অনার্স শেষ করেছেন রাজিব। ভবিষ্যৎ জীবনের কথা চিন্তা করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন মেসে থেকে। এত দিন পড়াশোনার খরচ বাড়ি থেকেই এনে চালিয়েছেন। কিন্তু খরচ বেড়ে যাওয়ায় মেসজীবনও এখন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তার। বাড়ি থেকে আনা অর্থ দিয়ে ঊর্ধ্বগতির বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না। এ জন্য খাবারে এনেছেন পরিবর্তন, কাটছাঁট করেছেন হাতখরচ।
শুধু রাজিব একা নন, ঢাকায় মেসে থেকে পড়াশোনা করা চাকরিপ্রত্যাশীদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাদের সবার গল্প একই রকম। নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের কারণে তাদের দিনযাপন এখন কষ্টকর হয়ে উঠেছে। আবার অনেকে খরচের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে না পেরে নিম্নমানের ঠিকানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন। রাজিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি মাসে বাড়ি থেকে সাত-আট হাজার টাকা পাঠাত। যে টাকা পেতাম তা দিয়ে মেসের ভাড়া, খাবার ও হাতখরচ সুন্দরভাবে হয়ে যেত। তবে গত দুই মাসের ব্যবধানে মেসের সিট ভাড়া বেড়েছে ৫০০ টাকা। এর মধ্যে পানির বিল, গ্যাস বিল ও অন্যান্য খরচ রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে শাকসবজি, মাছ, মাংস, তেল, পেঁয়াজসহ প্রায় সবকিছুর দাম বেড়েছে। মেসের খাদ্যতালিকায় ডিম বেশি প্রাধান্য পেত। বর্তমান এই ডিমের দামও বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যতালিকায় তা কমিয়ে এনেছি। মাসের মধ্যে এমনও দিন আছে যে সব দিনে শুধু কলা-রুটি খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। দুই মাস আগেও একই টাকায় সপ্তাহে অন্তত দুই দিন করে মুরগি, মাছ ও ডিম দিয়ে খাবার খাওয়া যেত। কিন্তু এখন মাছ ও মুরগি তো দূরে থাক, অধিকাংশ দিন ভর্তা আর ভাজি খেতে হয়। শুধু মেস ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া ও যাতায়াতেই আমার সব টাকা চলে যায়।’
রাজধানীর ফার্মগেট, মহাখালী ও কাঁঠালবাগানের কয়েকটি মেসের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দুই মাস আগেও তাদের প্রতি মাসে থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে সাত থেকে আট হাজার টাকা খরচ হতো। এর মধ্যে বাসাভাড়া ২ হাজার ৫০০, বুয়ার বিল ৫০০, ইউটিলিটি বিল ৫০০, খাবার বাবদ খরচ হতো ২ হাহার ৫০০, পকেট খরচ ১ হাজার ও যাতায়াত খরচ ১ হাজার টাকা।
বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তি থাকায় বাসার মালিকরা নতুন করে সিট ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। ১০ জনের মেসে জনপ্রতি অন্তত ৩০০ টাকা করে ভাড়া বেড়েছে। তার ওপরে নতুন করে যুক্ত করেছেন পানি ও গ্যাস বিল বাবদ আরও ২০০ টাকা। তা ছাড়া আগে থেকেই বিদ্যুৎ বিল বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়ে গেছেন।
তারা জানান, প্রতিটি মেসের মেম্বারপ্রতি খরচ বেড়েছে ২৭ শতাংশ। এর মধ্যে সিট ভাড়া বাবদ ১২ শতাংশ, ইউটিলিটি বাবদ ৬৭ শতাংশ, খাবার বাবদ ৩২ শতাংশ, বুয়ার বিল বাবদ ৩০ শতাংশ জনপ্রতি মেস মেম্বারদের খরচ বেড়েছে।
মহাখালীর ওয়্যারলেস গেটে থাকেন মামুন। তিনি ছোট একটা চাকরি করেন। মাসে ১৮ হাজার টাকা বেতন পান। তার আয় অনুযায়ী বাজারের ব্যয়ের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। কোনো মাসে আবার ধার করেও চলতে হয়।
মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকায় পড়তে এসেছি। কিন্তু পরিবারের অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে পড়ার পাশাপাশি একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করছি। মাসে ১৮ হাজার টাকা আয় করছি। এই টাকা থেকে মাকে ৯ হাজার টাকা পাঠাতে হয়। বাকি টাকা দিয়ে আমার খরচ চলে। এত দিন ৯ হাজার টাকায় মাস চালাতে পারলেও বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ায় এখন আর চলতে পারছি না। অনেক কষ্ট হয়। আবার মাসের শেষের দিকে ধার করে বাকি দিন চালাতে হয়।’
রুবেল হোসেন রাজধানীর একটি সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগে পড়েন। মেস বাসায় এক রুমে তিনজন মিলে থাকেন। তিনি বলেন, ‘পড়াশোনার আর এক বছরের মতো বাকি আছে। এত দিন বাবা সব টাকা দিয়েছেন। এখন সবকিছুর এত দাম। বাজারে গেলে টাকা থাকে না। পড়াশোনার খরচ ও ভাড়া দিতে এমনিতেই সব টাকা শেষ হয়ে যায়। তবুও কোনো মতে চলত। কিন্তু এখন এক কেজি চাল কিনলে টাকা থাকে না। বাবার ওপরও অনেক চাপ পড়ে যাচ্ছে। একটি সুপার শপে চাকরির জন্য কথাও বলেছি। চাকরিটা হলে কিছু টাকা আয় হবে।’
এদিকে খাদ্যের এমন মূল্যবৃদ্ধিকে চরম মূল্যস্ফীতির কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দেওয়া মে মাসের ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) হালনাগাদ পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ হয়েছে, গত মাসে যা ছিল ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ; অর্থাৎ মে মাসের তুলনায় জুন মাসে সব খাতেই মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে গত মে মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। এর অর্থ হলো, ২০২১ সালের মে মাসে যে পণ্য বা সেবার জন্য ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, ২০২২ সালের মে মাসে একই পণ্য বা সেবার জন্য ১০৭ টাকা ৪২ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। এ মাসে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। এর অর্থ হলো, ২০২১ সালের মে মাসে যে খাদ্যপণ্য বা খাবারের জন্য ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, চলতি বছরের মে মাসে একই খাবারের জন্য ১০৮ টাকা ৩০ পয়সা খরচ করতে হয়েছে।
