জ্বালানিসার্বভৌমত্ব অর্জনে নবায়নযোগ্য উৎস

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২২, ১০:৩২ পিএম

জ্বালানির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক একদমই আদিম। মানুষের সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান হচ্ছে জ্বালানির ব্যবহার শেখা। যার শুরুটা হয় আগুন আবিষ্কারের মাধ্যমে। আর এই আবিষ্কারের হাত ধরেই সেই আদিমকাল থেকেই শীত নিবারণ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং জীবনের সঙ্গে অনেক নতুন অনুষঙ্গ যোগ হয়েছে। যার কোনো কোনোটা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইকে সহজ করেছে আবার কোনো কোনোটা জীবন উপভোগ করার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যার কিছুটা আবশ্যক ও বেশ খানিকটা আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা। তাই সেই আদিকাল থেকেই অর্থনীতির সঙ্গে জ্বালানির সম্পর্ক। তবে অর্থনীতি যত বৈচিত্র্যময় হয়েছে ততই জ্বালানির গুরুত্ব বেড়েছে, অবস্থান পাকাপোক্ত হয়েছে। আর এখন তো কৃষির ও শিল্পপণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে, যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, বসবাস ও গৃহস্থালি কাজকর্ম সবকিছুই জ্বালানিনির্ভর। বিশ্ব অর্থনীতি জ্বালানির ব্যবহার ও ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল হলেও এত দিনেও এর খুব একটা বৈচিত্র্যময়তা আসেনি, আমরা এখনো অতিমাত্রায় জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এই জীবাশ্ম জ্বালানি হচ্ছে পৃথিবীর কোটি কোটি বছর ধরে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানুষ যখন খনির সন্ধান পায়নি তখন গাছই ছিল আদিম জ্বালানি। আর এখন যেটা তেল, গ্যাস ও কয়লা সেটা জীবাশ্ম জ্বালানি। কিন্তু এখনো এই জীবাশ্ম জ্বালানির প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছে পৃথিবীর মাত্র অল্প কয়েকটি দেশ। এ দেশগুলোই পৃথিবীর বেশির ভাগ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্বরাজনীতিও।

যখন জীবনযাপনে জ্বালানির এমন গুরুত্ব তখন জ্বালানিতে সব জনগণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক গতিশীলতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রধানত জ্বালানি আমদানিকারক দেশ এবং দিনে দিনে সেই নির্ভরশীলতার প্রবণতাই বাড়ছে। আমরা সবাই জানি বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে সারা পৃথিবীতে জ্বালানি খাতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরির ফলে সারা পৃথিবীতে অর্থনৈতিক মন্দা ধেয়ে আসতে পারে এবং সত্যি সত্যি অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলে বাংলাদেশের মতো অধিক জনসংখ্যা ও সীমিত সম্পদের দেশগুলোকে অনেক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। এর বিপরীতে বিশ্বের বড় তেল কোম্পানিগুলো, যাদের অনেকেই পশ্চিমা, তাদের লাভের পাল্লা ফুলে-ফেঁপে উঠছে আর পৃথিবীর সর্বত্র পকেট কাটা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। এই বছরের দ্বিতীয়-প্রান্তিকে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের মুনাফা হয়েছে ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মার্কিন এঞ্জন মবিল তার ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে এ সময়। অন্যদিকে সম্প্রতি এক খবরে বলা হচ্ছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে যুক্তরাজ্যে দরিদ্রের হার বাড়ছে, একে বলা হচ্ছে ‘জ্বালানি দারিদ্র্য’। ওই খবরে বলা হয়েছে যুক্তরাজ্যের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ জ্বালানি দারিদ্র্যের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ অবস্থা তৈরি হলে আমাদের ক্ষেত্রে কী হতে পারে তা বলাই বাহুল্য।

সম্প্রতি জ্বালানি তেলের পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিপিসির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এর কোনো বিকল্প ছিল না। এই যখন অবস্থা তখন স্বাভাবিকভাবেই তা জনজীবনের ওপর মারাত্মক প্রভাব রাখতে শুরু করছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত তাদের ওপর। জ্বালানি ব্যবহারের এই অতিরিক্ত খরচ নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে বাধ্য করবে। তাই সংকটের এ সময়ে ওই জনগোষ্ঠীকে সহায়তার উপায় আশু বের করা দরকার এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। আবার টাকায় জ্বালানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলেই যে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে এমন সম্ভাবনাও কম। কারণ আমাদের তো জ্বালানি পণ্য বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করতে হয় যেটা বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের ভারসাম্যের সংকটকে অব্যাহত রাখবে। তেলের দাম বাড়ানোর কারণে সামর্থ্যবান জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় তেমন কোনো প্রভাব পড়বে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় না। কারণ দেশীয় মুদ্রায় এই অতিরিক্ত খরচ বহন করার সামর্থ্য তাদের আছে, সেটা হোক বৈধ ও অবৈধ উপার্জনের যেকোনো উপায়ে। তবে জ্বালানি খাতের অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এ মুহূর্তে অন্ততপক্ষে তিনটি উদ্যোগ নেওয়া দরকার। যার একটা হচ্ছে জ্বালানি সাশ্রয়ে আরও একটু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা; সেটা হতে পারে উদ্ভাবনী উপায়ে, দ্বিতীয়টি হচ্ছে জ্বালানি পণ্যে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রবেশগম্য নিশ্চিত করার জন্য নিজস্ব জ্বালানি সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার দিকে মনোযোগ দেওয়া আর তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থা আমাদের আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে বর্তমান রাজনৈতিক-অর্থনীতিতে জ্বালানির ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার কোনো বিকল্প নেই। যত বেশি সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাবে তত বেশি জ্বালানিতে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যাবে। আর সে ক্ষেত্রে নিজস্ব জ্বালানি উৎস সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তির ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা দিনে দিনে বাড়াতে হবে কোনো ধরনের সময়ক্ষেপণ ছাড়াই। বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ভর্তুকি কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত কতটুকু সঠিক তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু এত শত প্রশ্ন থাকলেও এ রকম গণহারে ভর্তুকিও সম্পদের অপচয়ের আশঙ্কা বাড়ায় এবং এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজে অহরহ। অনেকেই আছেন যারা গাড়ি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে বেহিসেবি। মাঝে মাঝে বলা হলেও ভর্তুকির টাকা চুঁইয়ে চুঁইয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর দৃষ্টান্তও কম। যার উদাহরণ আমরা আবারও দেখলাম টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমাদের রপ্তানিকারকদের আগের তুলনায় ডলারের বিপরীতে বেশি অর্থ উপার্জনের ঘটনায়। কিন্তু এই উদ্বৃত্ত আয়ের কত অংশ সংশ্লিষ্ট খাতের শ্রমিক ও কর্মচারীদের কাছে পৌঁছেছে? নাকি শুধু তাদের লাভের পাল্লাই ভারী করছে?

অনেকেই বলে থাকেন সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রয়োজনীয় জমির অভাব ও ঘাটতি আছে। কিন্তু আমাদের দেশের উন্মুক্ত স্থানের অভাব নেই। সাম্প্রতিক একটা দৃষ্টান্তে দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রামে প্যাসিফিক জিনস একটি কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের ফলে প্রায় ৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই দৃষ্টান্তই প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করছে যে ঢাকা ও অন্য বড় শহরগুলোর বাড়ির ছাদ আমরা কতটুকু ব্যবহার করতে পেরেছি? এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা, বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু যেটা নেই সেটা হচ্ছে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, নীতি-সহায়তা এবং উদ্যোগের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। এ ক্ষেত্রে যদি যথেষ্ট ভর্তুকি ও আর্থিক প্রণোদনার প্রয়োজন হয় তার পরও তা করা দরকার। আর এটা করা গেলে ন্যূনতম দুভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে, একদিকে আমাদের নিজেদের জ্বালানির উৎসের ব্যবহার, যেটা পরিবেশবান্ধব। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়। সম্ভবত আমাদের অনেকেই সেদিকে যেতে চাচ্ছি না। এর পেছনে কারণ থাকতে পারে আমদানিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দক্ষতার ঘাটতি। আর এর সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনা সম্ভব যদি আমাদের সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত