দেশের অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানি তেল আমদানিতে শুল্ক ও কর প্রত্যাহার করে মূল্য পুনঃসমন্বয়ের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ঠেকাতে জনস্বার্থে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দেওয়া এক চিঠিতে এমন দাবি জানিয়েছে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)।
গত ১৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে এফবিসিসিআই জানিয়েছে, সরকার যেখানে নীতি সহায়তার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সেখানে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি শিল্পবাণিজ্য, সেবা, কৃষিসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। যা জনজীবনে দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেবে। নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ রেশনিংয়ে উৎপাদন ও চাষবাদ যাতে ব্যাহত না হয় সেটাও বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছে এফবিসিসিআই।
গত ৬ আগস্ট জ্বালানি তেলের (ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন, পেট্রোল) মূল্য গড়ে ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এর মধ্যে গণপরিবহন ও কৃষি খাতে বহুল ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। কেরোসিন ও ডিজেলের দাম লিটারে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪, অকটেনের দাম লিটারে ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ আর পেট্রোলের দাম লিটারে ৪৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জ্বালানি তেল আমদানিতে শুল্ক ও কর প্রত্যাহার করে দাম পুনঃসমন্বয়ের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বৈশি^ক মহামারীর ধকল সামলে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় রয়েছে দেশের অর্থনীতি। তার মধ্যেই ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির হার আমাদের অর্থনীতিতে আরও চাপ তৈরি করবে। পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন ও ব্যবসার খরচ আরেক দফা বৃদ্ধি পাবে। চলতি বছর বৃষ্টি কম হওয়া কৃষকদের সেচের ওপর বাড়তি নির্ভরতায় কৃষি উৎপাদনেও খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পেলে রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
চিঠিতে জসিম উদ্দিন জানান, চলমান সংকট এড়াতে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে জ্বালানি তেলের ওপর আরোপিত শুল্ক-কর প্রত্যাহার করে মূল্য সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। বর্তমান জ্বালানি তেলের ওপর মোট ৩৪ শতাংশ কর রয়েছে। এর মধ্যে শুল্ক ১০ শতাংশ, মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ, অগ্রিম কর ৫ শতাংশ এবং আয়কর ২ শতাংশ।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ সালে মোট জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন যার মধ্যে অকটেনের ব্যবহার ছিল ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৬০২ মেট্রিক টন আর পেট্রোলের ব্যবহার ছিল ৪ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন। দিনে গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার টন ডিজেল ব্যবহার হয়, যার অধিকাংশই পরিবহন খাতে। এছাড়া কৃষি সেচ ও বিদ্যুৎ খাতেও ডিজেল ব্যবহৃত হয়। বছরে বিপিসির সরবরাহ করা মোট জ্বালানির ৭৩ শতাংশই ডিজেল। বছরে ৪৫ থেকে ৪৬ লাখ টন ডিজেল বিক্রি করে বিপিসি। ডিজেল ছাড়াও বিপিসি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ফার্নেস তেল, পরিবহনের জন্য অকটেন, উড়োজাহাজের জন্য জেট ফুয়েল এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। সব মিলে দেশের মোট জ্বালানি তেলের ৬৩ শতাংশ ব্যবহার করে পরিবহন খাত। প্রায় ১৬ শতাংশ ব্যবহৃত হয় কৃষি খাতে। শিল্প খাত ৭ ও বিদ্যুৎ খাত ব্যবহার করে ১০ শতাংশ।
