এক জেলা বাদে সারা দেশে জঙ্গিদের সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল ১৭ বছর আগে। ওই ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে ১৫৯টি। এগুলোর মধ্যে ৪১টি মামলার বিচার প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। শতাধিক মামলার বিচারকাজ শেষ হলেও সিরিজ বোমা হামলার পৃষ্ঠপোষক ও পরিকল্পনাকারীরা চিহ্নিত হয়নি।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় জঙ্গিদের সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় দুজন নিহত হয়, আহত হয় বহু মানুষ। সেদিন জঙ্গিরা তাদের প্রচারপত্র ছড়িয়ে দিয়েছিল। একযোগে হামলার মাধ্যমে জঙ্গিরা তাদের উপস্থিতির জানান দেয়। বাংলাদেশে জঙ্গিদের উত্থানের বিষটি বিদেশিদেরও নজরে আসে।
পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) জঙ্গিরা ওই সিরিজ হামলা চালায়। এর আগে থেকেই এ জঙ্গি গোষ্ঠীটি বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে হত্যাকা- ঘটিয়ে আসছিল। দেশের উত্তরাঞ্চলে জাগ্রত মুসলিম জনতার (জেএমজেবি) নামে তা-ব চালায়।
সিরিজ বোমা হামলার মামলায় শীর্ষ জঙ্গি শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাইসহ ৪৫৫ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের মধ্যে শীর্ষ আট জঙ্গিকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।
হামলার পর তখনকার জোট সরকারের একাধিক শীর্ষ নেতার নাম এসেছিল। কিন্তু পৃষ্ঠপোষক ও নির্দেশদাতা কারা সেটা আজ পর্যন্ত কোনো তদন্ত কর্মকর্তাই নিশ্চিত করতে পারেননি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার পর কঠোর পদক্ষেপে যায় পুলিশ ও র্যাব। অধিকাংশ মামলার বিচার শেষ হয়েছে। বাকি যেগুলো আছে সেগুলোও দ্রুত শেষ হবে। জঙ্গি হামলার ঘটনায় সংগঠনগুলোর শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হামলার পেছনে থেকে যারা কলকাঠি নেড়েছিল তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিরিজ বোমা হামলার পর থানা পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করে। তবে মূল তদন্ত করে থানা পুলিশ। সব মামলারই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রে হামলার পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের নাম পাওয়া যায়নি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, হামলার পর জঙ্গিদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তখনকার ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক, ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, গৃহায়ন ও পূর্ত প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবীর, রাজশাহী সিটির মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফা, বিএনপি নেতা শীষ মোহাম্মদসহ অনেকের। তিনি বলেন, এখনো পুলিশ এ নিয়ে কাজ করছে। হামলার সঙ্গে আর কে কে জড়িত তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টায় হাইকোর্টের মূল ফটকে বিকট শব্দে বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। মুন্সীগঞ্জ বাদে ৬৩ জেলার ৪৫০টি স্থান আক্রান্ত হয়েছিল। হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে যে প্রচারপত্র উদ্ধার করা হয় সেখানে ‘আল্লাহর আইন কায়েম ও প্রচলিত বিচার পদ্ধতি’ বাতিলের দাবি জানিয়েছিল জঙ্গিরা।
সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় ১৫৯টি মামলা হয় বিভিন্ন থানায়। মামলাগুলোর মধ্যে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় ১৭টি, চট্টগ্রাম মহানগরে ৮টি, রাজশাহী মহানগরে ৪টি, খুলনা মহানগরে ৩টি, বরিশাল মহানগরে ১২টি, সিলেট মহানগরে ১০টি, ঢাকা রেঞ্জে ২৩টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১১টি, রাজশাহী রেঞ্জে ৭টি, খুলনা রেঞ্জে ২৩টি, বরিশাল রেঞ্জে ৭টি, সিলেট রেঞ্জে ১৬টি, রংপুর রেঞ্জে ৮টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৬টি ও রেলওয়ে রেঞ্জে ৩টি দায়ের করা হয়। এসব মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি ছিল ১ হাজার ১৩১ জঙ্গি। ১১৮টি মামলায় ৩৩৪ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। তার মধ্যে ২৭ জঙ্গির ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। আর ফাঁসি কার্যকর করা হয় আট শীর্ষ জঙ্গির।
এর আগে জেএমবি ২০০১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের রক্সি সিনেমা হল ও সার্কাস মাঠে বোমা হামলা চালায়। ওই সময় বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত না করায় সংগঠনটি আরও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সিরিজ বোমা হামলার ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বোমা হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় বিচারক সোহেল আহমেদ চৌধুরী ও জগন্নাথ বাড়ৈকে। দুই বিচারক হত্যা মামলায় জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইসহ সাতজনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল আদালত। ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ ছয়জনের মৃত্যুদ-াদেশ কার্যকর করা হয়। পরে মামুন নামে আরেক জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হয়।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আবু গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিরিজ বোমা হামলার বাকি মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। আশা করছি চলতি বছর বেশ কয়েকটি মামলার বিচার শেষ হবে।’ তিনি বলেন, ‘বোমা হামলার পর ঢাকায় ১৭টি মামলা হয়েছিল। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে আটটি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। পাঁচটি মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি।’
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘সিরিজ বোমা হামলায় যেসব জঙ্গি আত্মগোপনে আছে তাদের ধরতে অভিযান চলে আসছে।’
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বোমা হামলার পর ২০০৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর জঙ্গিদের ধরিয়ে দিতে সরকার কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। পুরস্কারের মধ্যে ছিল জেএমবির মজলিসে শূরার প্রতি সদস্যের জন্য ১০ লাখ, আত্মঘাতী সদস্যের জন্য ২ লাখ এবং এহসার সদস্যের জন্য ১ লাখ টাকা। কিন্তু শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলাভাইসহ যেসব শীর্ষ জঙ্গি ধরা পড়েছিল তাদের জন্য ঘোষিত পুরস্কার দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।
