গাজীপুরে নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়ির (প্রাইভেট কার) ভেতর থেকে শিক্ষক দম্পতির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার বগারটেক এলাকায় রাস্তার পাশে থামানো প্রাইভেট কারের ভেতর তাদের মরদেহ পাওয়া যায়। উদ্ধারের পর মরদেহ দুটি পরীক্ষা করে চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, খাবারে বিষক্রিয়ায় ওই শিক্ষক দম্পতির মৃত্যু হয়েছে। তবে তাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি স্বজনদের। অবশ্য এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানাতে পারেনি পুলিশ।
লাশ উদ্ধার হওয়া শিক্ষক দম্পতি হলেন গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী বিসিক এলাকার শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জিয়াউর রহমান মামুন (৫১) এবং টঙ্গীর ভরান এলাকার আমজাদ আলী সরকার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মোছা. মাহমুদা আক্তার জলি (৩৫)। তাদের মধ্যে মামুন কামারজুরি এলাকার প্রয়াত হাবিবুর রহমানের ছেলে।
ভগ্নিপতি মাওলানা আবদুর রশিদ জানান, জিয়াউর রহমান মামুন দীর্ঘদিন টঙ্গীর নোয়াগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। কিছুদিন আগে টঙ্গীর শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। তার স্ত্রী মাহমুদা আক্তার জলি আমজাদ আলী সরকার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তারা পরিবার নিয়ে নগরীর গাছা থানার কামারজুরি এলাকায় নিজের বাড়িতে থাকতেন। এই দম্পতির একমাত্র ছেলে এ কে এম তৌসিফুর রহমান মিরাজ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
আবদুর রশিদ আরও জানান, নিজেদের প্রাইভেট কারে স্কুলে আসা-যাওয়া করতেন মামুন-জলি দম্পতি। স্কুলে দায়িত্ব পালন শেষে বুধবার বিকেলে মামাতো ভাইকে গাড়িতে তুলে জলির স্কুলে যান মামুন। সেখান থেকে জলিকে গাড়িতে তুলে মামাতো ভাইকে রাস্তায় নামিয়ে দেন। পরে তারা বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। তাদের ছেলে মিরাজ সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে বাবার মোবাইল ফোনে কল করেন। কিন্তু বাবা কল রিসিভ না করায় মায়ের মোবাইল ফোনে কল দিতে থাকেন। পরে মা কল রিসিভ করে বাসায় আসছেন বলে জানান। ওই সময় মায়ের কথাবার্তায় ক্লান্তির ভাব বুঝতে পারেন মিরাজ। এরপর আবারও কল করে আর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। পরে বাবা-মার খোঁজ পেতে স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে গাছা থানা এবং টঙ্গী পূর্ব ও পশ্চিম থানায় যোগাযোগ করেন। রাতভর তারা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেন।
তৌসিফুর রহমান মিরাজ সাংবাদিকদের জানান, সবশেষ বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪১ মিনিটে বাবার মোবাইল ফোনে কল দিলেও রিসিভ হয়নি। এর কিছুক্ষণ পর মায়ের সঙ্গে কথা হয় তার। এ সময় মায়ের কণ্ঠ কিছুটা ভারী ছিল। তারপর আর যোগাযোগ করতে না পেরে রাতে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেন। ভোরে গাছা থানার বগারটেক এলাকায় হারবাইদ-বড়বাড়ি সড়কের ওপর তাদের প্রাইভেট কার দেখতে পেয়ে কাছে যান। এ সময় চালকের আসনে বাবা ও পাশেই মাকে নিস্তেজ অবস্থায় পান। পরে দ্রুত তাদের প্রথমে নগরীর তারগাছ এলাকার তায়রুন্নেছা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নেন। সেখান থেকে উত্তরার একটি হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার বাবা-মা দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। এরপর দুটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের মরদেহ গাছা থানায় নিয়ে বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করেন।
মামুন-জলি দম্পতিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করছেন তাদের স্বজনরা। এ প্রসঙ্গে শিক্ষক মামুনের বড় ভাই মো. রিপন বলেন, ‘এ হত্যাকাণ্ডটি পুরোই পরিকল্পিত। তা না হলে সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন কিছুই নেয়নি। ঘটনাটি যদি পরিকল্পিত না-ই হতো তাহলে টাকা, স্বর্ণ, মোবাইল ও গাড়ি নিয়ে যেত। তাদের কিছুই নেয়নি হত্যাকারীরা। শুধু জান দুইটা নিয়ে গেছে।’
অন্যদিকে শিক্ষিকা জলির বোন আহমিদা আক্তার ইমা বলেন, তার বোনের সুখের সংসার ছিল। স্বামীর সঙ্গে কোনো দিন মনোমালিন্য বা সংসারে অশান্তি ছিল না। বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বোনের সঙ্গে তার মায়ের শেষ কথা হয়। বোন-দুলাভাইয়ের মরদেহ পরীক্ষা করা হাসপাতালের চিকিৎসকের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়েছেন দুজনের গলায় কালো দাগ ছিল। এ ছাড়া দুজনেরই মুখ ও নাক দিয়ে প্রচুর ফেনা বের হচ্ছিল। চিকিৎসকদের ধারণা, খাবারে বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে তার বোন-দুলাভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন ইমা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (অপরাধ) মোহাম্মদ ইলতুৎমিশ বলেন, ‘ঘটনাটি তদন্তে এরই মধ্যে পুলিশ কাজ শুরু করেছে। বিষয়টি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ওই দম্পতির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
