দারিদ্র্য বাড়ার শঙ্কা এডিবির

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২২, ০২:২২ এএম

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশি^ক অর্থনীতির অস্থিরতার কারণে দেশে নতুন করে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

ম্যানিলাভিত্তিক উন্নয়ন সহযোগী এডিবি বলেছে, ২০২৬ সালের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের (স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ) পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংকটের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গত ২৪ জুলাই পাঠানো কান্ট্রি প্রোগ্রামিং মিশনের (সিপিএম) হালনাগাদ পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এ শঙ্কার কথা জানায় এডিবি। এ মিশনের আওতায় সংস্থাটি বাংলাদেশকে ৯৪০ কোটি ডলার ঋণ দেবে আগামী তিন বছরে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো ওই প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, বিশে^র অন্যান্য শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোর মতোই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ। অনাকাক্সিক্ষতভাবে সারা বিশে^ তেলের ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব দেশটিতেও পড়েছে। রপ্তানি ও প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার বিপরীতে আমদানি বেড়ে গেছে, ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতিও বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো  ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলমান জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, এর ফলে যারা দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে ছিল তাদেরও ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। যদিও আমাদের দেশে এসব নিয়ে কোনো জরিপ নেই, কিন্তু যেহেতু ব্যয় বেড়ে গেছে এ কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে জনগণ বেড়েছে বলে মনে হয়। এডিবি সেটিই বলছে।’ তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত না উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারব, যতক্ষণ পর্যন্ত আয় না বাড়ছে ততক্ষণ পর্যন্ত শঙ্কা থাকছেই। দারিদ্র্যসীমার পরিমাপ করলে সমস্যাটা মূল্যস্ফীতি নয়, মূল সমস্যা ক্রয়ক্ষমতা। মানুষের যে আয়, সে আয়ে যেসব জিনিসপত্র কিনতে হয়, সেসবের দাম বেড়ে গেছে। সুতরাং সেখানে নিশ্চয়ই দারিদ্র্যসীমার নিচের জনশক্তিও বেড়েছে। এখন প্রথম প্রয়োজন অবশ্যই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মূল্য ওপরের স্তরে আছে, সেটার অভিঘাতের দিকে নজর রেখে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার সুস্থির রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।’

দারিদ্র্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারকে সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে এ অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘সরকারের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় যে এক কোটি মানুষ আছে, আমি মনে করি সেটার প্রাপ্তি, স্থায়িত্ব এবং ব্যক্তি এ তিনটি বাড়ানো উচিত। প্রাপ্তি মানে যা দিচ্ছি তা আরও বেশি দেওয়া। স্থায়িত্ব মানে যতদিন ধরে দেবে, আরেকটু বেশি সময় দেওয়া। ব্যক্তি মানে যে এক কোটি মানুষকে দিচ্ছি, তা শহর এলাকায়ও দেওয়া। কারণ শহর এলাকায় নিম্নবিত্ত বা শ্রমিকেরও জীবনযাত্রার মান কমে গেছে, ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। সেটার দিকেও নজর দিতে হবে।’

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জ নিয়ে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এর জন্য প্রস্তুতি দরকার। আমাদের শূন্য শুল্ক সুবিধা থাকবে না। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে আরও তিন বছর দিয়েছে, কিন্তু এ সুবিধা অন্য বাজারে থাকবে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশে মেধাস্বত্ব আইন প্রয়োগ করতে হবে। যে নীতিগুলো গ্রহণ করা হয় সেগুলোতে আরও শৃঙ্খলা আনা ও সংস্কার করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ইতিমধ্যে একটি কমিটি করা হয়েছে। তারা আবার সাতটি উপকমিটি করে কাজ করছে। এ কমিটিগুলো থেকে যেসব পরামর্শ আসবে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। যেখানে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেয় ওইসব দেশের মধ্যে কারও কারও সঙ্গে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সেপা) রয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে এটি অনুমোদন দিয়েছেন। এসব উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা যাবে।’

এডিবির হালনাগাদ তথ্যে তারা জানিয়েছে, সিপিএমের আওতায় বাংলাদেশ প্রতি বছর গড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পাবে সংস্থাটির কাছ থেকে। করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা পুনরুদ্ধার অব্যাহত রাখতে এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা থেকে উদ্ভূত প্রভাব মোকাবিলায় এ উন্নয়ন সহায়তা দেওয়া হবে। এর আগে ২০২২-২৪ পাইপলাইনে এডিবির ঋণ প্রস্তাব ছিল ৭.৯১ বিলিয়ন ডলার।

ইআরডি ও এডিবি কর্মকর্তারা জানান, লেন্ডিং পাইপলাইনের আওতায় এডিবি ৪৪টি প্রকল্পে ঋণ দিতে সম্মতি জানিয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে এ তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য, বাজারে আরও ভালো প্রবেশাধিকার নিশ্চিতে এবং চাকরির সুযোগ ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কারসহ সড়ক ও রেলপথ করিডরের উন্নয়নে সহায়তা করা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানোর সমাধানেও সহায়তা দেবে এডিবি। এছাড়া দেশের প্রধান প্রধান অবকাঠামোগুলোর অব্যাহত উন্নয়নের জন্য সহায়তা দেবে। অগ্রাধিকার প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পে অর্থ সহায়তা দেবে সংস্থাটি।

২০২৩ সালে জলবায়ু পরিবর্তনে সহায়তা বাড়ানোর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে এডিবির পক্ষ থেকে। এছাড়া ঢাকার স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সাসেকের আওতায় ঢাকা-সিলেট করিডর রোড উন্নয়ন, ধীরাশ্রম কনটেইনার ডিপোর উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প, গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্পে এ সময় সহায়তা বাড়ানো হবে।

বাংলাদেশ লেন্ডিং পাইপলাইন ২০২৩-২৫-এর তথ্য বলছে, সবচেয়ে বেশি ঋণ পাবে পরিবহন খাত। আগামী তিন বছরে এ খাতে ২৯০ কোটি ডলার ঋণ দেবে এডিবি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ২৩৫ কোটি, পানি ও নগর খাতে ১৩৯ কোটি, আর্থিক খাতে ১৩০ কোটি, জ¦ালানিতে ১০৭ কোটি ও কৃষি খাতে ৪৪ কোটি ১০ লাখ ডলার দেবে।

মোট ছয়টি খাতে ভাগ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প তালিকা তৈরি করেছে এডিবি। এর মধ্যে এডিবি আগামী তিন বছরে কয়েকটি সড়ক ও রেল প্রকল্পেও অর্থায়ন করবে। যেমন আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত রেললাইনকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তর প্রকল্পে ৩০০ মিলিয়ন ডলার দেবে সংস্থাটি। এছাড়া টঙ্গী-ভৈরব-আখাউড়া লাইলনের মিটারগেজকে ডুয়েলগেজ ডাবল রেললাইনে রূপান্তরে আরও একটি প্রকল্প এডিবি স্ট্যান্ডবাই রেখেছে।

দারিদ্র্য বাড়ার শঙ্কা এডিবির

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত