রাজধানীর কারওয়ান বাজারে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মো. ইউসুফ। মাসিক বেতন সাকল্যে ৪০ হাজার টাকা। থাকেন মিরপুরের শেওড়াপাড়ায়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রভৃতি কারণে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পরিবার-সংসার নিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছেন। তার পরিবারে তিনি, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে। চারজনের সংসার। বেশ চিন্তায় পড়েছেন তিনি। একবার ভাবছেন, কিছুটা কম ভাড়ায় বাসা নেবেন, ডিপিএসটা ভেঙে ফেলবেন। আবার ভাবছেন, স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন। সবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন আরেকটু অপেক্ষার। দেশের পরিস্থিতি কী হয় দেখা যাক।
গত রবিবার ইউসুফের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান তার সংসারের হিসাব। বলেন, ‘বাসাভাড়াসহ বিভিন্ন বিলের পেছনে ১২ হাজার টাকা চলে যায়। দুই বাচ্চার পড়ালেখার পেছনে যায় প্রায় ৭ হাজার টাকা। বাজারখরচ ১০ হাজার টাকা। যাতায়াতসহ হাতখরচ ৫ হাজার টাকা। মাসে ৩ হাজার টাকার ডিপিএস করি। এছাড়া অন্য কেনাকাটা আছে; মাঝেমধ্যে বাড়িতে কিছু টাকা পাঠাই। মোটকথা, টেনেটুনে সংসার চালাতে হয়।’
ইউসুফ বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ার পর বাজারখরচ, যাতায়াতখরচ প্রায় সব খাতেই খরচ বেড়েছে। আগে ৪০ হাজার টাকায় যেভাবে চলতাম এখন সেভাবে চলতে হলে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা লাগবে। এ অবস্থায় হয়তো দুয়েক মাস চালিয়ে নিতে পারব। কিন্তু এরপর কী! কীভাবে সংসার চলবে?’
শুধু ইউসুফ নয়, নিম্ন, নিম্নমধ্যম ও মধ্যম আয়ের সব চাকরিজীবীর অবস্থা এরকমই। শুধু বেতনে চলা দায়। সরকারি কর্মকর্তারা কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও সরকারি কর্মচারীদের অবস্থা কিন্তু একইরকম। যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বাড়তি আয় আছে তাদের কথা অবশ্য ভিন্ন।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাড়তে শুরু করেছে সব পণ্যের দামই। ডিমের হালি ৫৫ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। ব্রয়লার মুরগির দাম ২০০ টাকা কেজি। কাঁচা মরিচের দামে আগুন। চাল, ডাল, আটা, তেল, দুধ, ফলমূল, মাছ-মাংস সব পণ্যের দামই বাড়ছে হু হু করে। বাসভাড়া তো বেড়েছেই। আগে যে রিকশাভাড়া ছিল ২০ টাকা এখন তা ৩০ টাকা; কখনো এর বেশিও হাঁকা হয়। আসলেই বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ। সংখ্যায় তারা কোটি কোটি।
গত রবিবার (১৪ আগস্ট) রংপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘অর্থনৈতিক মন্দা এখন বিশ্বজুড়ে। সারাবিশ্বেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আমাদের দেশেও। সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে, এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। মানুষের কষ্ট যাতে না থাকে, সেজন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’
গত বছর জানুয়ারিতে প্রকাশিত বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (হায়েস) ২০১৬-এর চূড়ান্ত রিপোর্টে (মে, ২০১৯) জানিয়েছিল, এ হার ২১ দশমিক ৮ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনায় দেশের দারিদ্র্যের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিশ^ অর্থনৈতিক মন্দায় মানুষ আরও কাহিল হয়ে পড়েছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও মানুষের আয় বাড়েনি। সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন যা ছিল, তাই আছে। বরং বৈশি^ক মন্দায় অনেকে চাকরি হারানোর শঙ্কায় আছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘২৭ হাজার টাকা বেতন পাই। তাই দিয়ে অনেক কষ্টে চলতে হয়। এখন জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে চলা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বিকল্প আয়ের খাত তৈরি না হলে পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকা সম্ভব হবে না।’ ওই কর্মচারী এখন চাকরির পাশাপাশি পাঠাওয়ের মাধ্যমে মোটরসাইকেল চালিয়ে বাড়তি আয়ের চিন্তা করছেন।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ইতিমধ্যে আন্দোলনে নেমেছে চা শ্রমিকরা। তারা দৈনিক মজুরি ১২০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে। গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতনও ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। রাজধানীতে যেসব গার্মেন্ট শ্রমিক বাস করছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে তাদেরও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজধানীর ইব্রাহিমপুরে একটি গার্মেন্টস কারখানায় কর্মরত নাজমা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক রুমে চারজন থাকি। রুমভাড়া ১ হাজার ২০০ টাকা। খাওয়াখরচ আগে ৩ হাজারে হয়ে যেত। এখন জিনিসপত্রের যে দাম তাতে ৪ হাজারেও হবে কি না সন্দেহ। আগে বেশিরভাগ দিনেই ডিম খাওয়া হতো। কিন্তু এখন ডিম খাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া হাতখরচ আছে, জামাকাপড় আছে। বাড়িতেও টাকা পাঠাতে হয়। ৮ হাজার টাকা বেতনে কী হয়? ওভারটাইম হলে দুয়েক হাজার টাকা বাড়তি পাওয়া যায়, না হলে অনেক কষ্ট করে চলতে হয়।’
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সরকারের নানা খাতে কাটছাঁটে মানুষের আয় কমে যাচ্ছে। সরকারের নানা প্রকল্পে কেনাকাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অনেকে। সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ, সভা প্রভৃতি ক্ষেত্রে সম্মানীও বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতনের বাইরে যে অতিরিক্ত আয় করতেন, তাতে ছেদ পড়েছে। নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ায় সরকারি অনেক অবকাঠামোর নির্মাণ স্থগিত আছে। ব্যক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণও কমে গেছে। ফলে এ কাজের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরা বিপাকে পড়েছে।
অর্থনৈতিক মন্দায় ভালো নেই নন-এমপিও এবং কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা। প্রায় সাত হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী নন-এমপিও। ইবতেদায়ি মাদ্রাসার ২৫ হাজার শিক্ষকও তেমন বেতন-ভাতা পান না। একই অবস্থা বেসরকারি কলেজের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষকদের। প্রায় ৫০ হাজার কিন্ডারগার্টেনে ছয় লাখ শিক্ষক নামমাত্র বেতনে চাকরি করেন। তারা সরকারি কোনো সহায়তা পান না। প্রাইভেট-টিউশন তাদের আয়ের বড় খাত। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় অনেক পরিবার প্রাইভেট শিক্ষক বাদ দিচ্ছে। এতে কষ্টে আছেন বেসরকারি শিক্ষকরাও।
রাজধানীর মাটিকাটার একটি কিন্ডারগার্টেনের এক শিক্ষিকা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘স্কুল থেকে ৭ হাজার টাকা বেতন পাই। প্রাইভেট পড়িয়ে আরও ১৫ হাজার টাকা আয় করতাম। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে একজন অভিভাবক তার সন্তানদের আপাতত প্রাইভেট পড়াবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। আগের আয়েই টেনেটুনে চলতাম। এখন জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’
