বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি এখন নিম্নচাপে রূপ নিয়েছে। যার প্রভাবে সাগর উত্তাল ও সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদীতে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে। তবে মোংলাসহ আশপাশের উপকূলীয় এলাকা জুড়ে প্রচণ্ড গরম অনুভূত হচ্ছে। বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে উপকূলে প্লাবনের ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানিয়েছেন, উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত লঘুচাপটি প্রথমে সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং পরে ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের অদূরে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় নিম্নচাপে পরিণত হয়। এরপর এটি পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে স্থল নিম্নচাপ আকারে সন্ধ্যা ৬টায় ভারতের ওড়িশা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছিল। এটি আরও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে।
আবহাওয়ার বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিম্নচাপ ও বায়ুচাপ পার্থক্যের আধিক্যের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ২ থেকে ৪ ফুট অধিক উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।
আবহাওয়ার বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর ও ঘনীভূত হয়ে শুক্রবার সকালে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও এর কাছাকাছি উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর এলাকায় নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। এটি আরও ঘনীভূত হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। নিম্নচাপ কেন্দ্রের ৮৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছে।
নিম্নচাপটির প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও এর কাছাকাছি এলাকায় গভীর সঞ্চরণশীল মেঘমালার সৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বায়ুর পার্থক্যের আধিক্য বিরাজ করছে। সমুদ্র বন্দরসমূহ, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে।
দুবলার চরে প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি : বঙ্গোপসাগর প্রচন্ড উত্তাল হয়ে উঠেছে। তাই গভীর সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা বন বিভাগের দুবলার চরের ভেদাখালী খালে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছেন। ঝড়ে দুবলাসংলগ্ন গভীর সাগরে এখন পর্যন্ত কোনো ট্রলারডুবির মতো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে শুক্রবার ভোর থেকে দুবলার চর এলাকাসহ সাগরে প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিলীপ মজুমদার বলেন, ‘গত রাত (বৃহস্পতিবার) থেকেই দুবলার চরে প্রচন্ড ঝড় হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রচুর বৃষ্টিপাতও রয়েছে। কিন্তু শুক্রবার ভোর থেকে ঝড়-বৃষ্টি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা দুবলার চরে আশ্রয় নিয়েছেন। চরের ভেদাখালী খালে ৫৪টি ট্রলার নিরাপদে রয়েছে।’
উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া সুস্পষ্ট লঘুচাপের কারণে গতকালও মোংলা বন্দর, সাগর-সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। এর প্রভাবে মোংলাসহ সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিপাত বয়ে যাওয়া অব্যাহত রয়েছে।
মোংলা আবহাওয়া অফিস ইনচার্জ অমরেশ চন্দ্র ঢালী বলেন, ‘লঘুচাপটি শুক্রবার ভোর ৬টার দিকে নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে মোংলাসহ উপকূলীয় এলাকা স্বাভাবিক জোয়ারের তুলনায় ২ থেকে ৪ ফুটের অধিক জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হবে।’ এছাড়া নিম্নচাপ স্থলে/কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৪৪ কিলোমিটার বলেও জানান তিনি।
সাগরে পাঁচ ট্রলার ডুবে নিখোঁজ ১৬ জেলে : কুয়াকাটাসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে অন্তত ৭০ জেলেসহ পাঁচটি মাছ ধরা ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শুক্রবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন পয়েন্টে এসব ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় এখনো ১৬ জেলে নিখোঁজ রয়েছে। এদিকে সাগরের মোংলাবন্দর এলাকায় ৩৬ জন নিয়ে তিন দিন ধরে ভাসছে একটি বড় ফিশিং বোট। নিম্নচাপের কারণে সাগর উত্তাল থাকায় ব্যাহত হচ্ছে উদ্ধার কার্যক্রম।
পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ট্রলারডুবির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আলীপুর-কুয়াকাটা মৎস্য আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি আনসার উদ্দিন মোল্লা। তিনি জানান, ডুবে যাওয়া ট্রলারগুলো হলো এফবি মা-মনি (৩), এফবি সাইফুল, এফবি আল মামুন, এফবি কুলসুম ও এফবি রফিক মিঝি। এফবি রফিক মিঝির ট্রলারে থাকা জেলেদের বাড়ি ভোলার হাজারীগঞ্জে। বাকি চার ট্রলারে থাকা জেলেদের বাড়ি পটুয়াখালীর মহিপুরে। উদ্ধার হওয়া জেলেরা কুয়াকাটা ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, মহিপুর উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
উদ্ধার হওয়া জেলেরা জানান, হঠাৎ ঝড়ে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে ট্রলার পাঁচটি ডুবে যায়। এ সময় পাশে থাকা অন্য ট্রলারের মাধ্যমে ৫৪ জেলে উদ্ধার হলেও এখনো নিখোঁজ ১৬ জেলে। নিখোঁজ জেলেরা হলেন এফবি কুলসুমের ১৪ জেলে, এফবি রফিক মিঝি ট্রলারের মালিক রফিক মিঝি (৬০) এবং ঢেউয়ের তোড়ে সাগরে পড়ে নিখোঁজ এফবি মরিয়ম ট্রলারের মাঝি এছাহাক (৪৫)।
নিজামপুর কোস্টগার্ডের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার সেলিম মন্ডল বলেন, ‘সাগরে ট্রলারডুবির খবর পেয়েছি। আমাদের টহল টিম সাগরে রয়েছে এবং উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। এছাড়া এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’
এদিকে মোংলা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ইঞ্জিন বিকল হয়ে ৭ অফিসার ও ২৯ জন ক্রু নিয়ে তিন দিন ধরে বঙ্গোপসাগরে ভাসছে ফিশিং ভেসেল এফবি জোয়ান ডেভার। সাগরে ভাসতে থাকা এ ফিশিং ভেসেলটি (মাছ ধরা বড় জাহাজ) উদ্ধারের চেষ্টা করছে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড।
চট্টগ্রামের কন্টিনেন্টাল গ্রুপের মেরিন ফিশারিজ লিমিটেডের ইনচার্জ আ. সালাম মজুমদার জানান, গত বুধবার দুপুর ১টার দিকে চট্টগ্রামের সদরঘাট থেকে ১৮০ টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এফবি জোয়ান ডেভার গভীর বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এরপর ওইদিনই ভেসেলটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে সাগরে ভাসতে থাকে। ভেসেলটিতে ৭ অফিসার ও ২৯ জন ক্রু রয়েছেন।
মোংলা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, গতকাল দুপুরে খবর পাওয়ার পর বিষয়টি নৌবাহিনীকে জানানো হয়। এরপর নৌবাহিনীর একটি জাহাজ ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, সাগর উত্তাল রয়েছে, তারপরও ফিশিং ভেসেলটি উদ্ধারে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
