সুকুক ও বন্ডের মতো কাঠামোগত পুঁজিবাজার নিদর্শন পত্রকে ব্যাংকের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সীমা গণনার বাইরে রাখার অনুরোধ জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। ব্যাংকের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা গণনার ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃক শেয়ারের ক্রয়মূল্যকে বাজারমূল্য বিবেচনার প্রস্তাব গ্রহণের পর বাংলাদেশ ব্যাংককে এবার এমন প্রস্তাব দিয়েছে এসইসি। গত ১৬ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারকে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে চিঠি পাঠিয়েছেন এসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম।
এর আগে গত ৪ আগস্ট ব্যাংক কোম্পানি কর্তৃক অন্য কোনো কোম্পানির শেয়ার ধারণের হিসাবায়নে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্যকে বাজারমূল্য হিসেবে বিবেচনা করে এক সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক, যেটি এসইসিসহ পুঁজিবাজারের স্টেকহোল্ডারদের দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিল। এসইসির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার এমন উদ্যোগ নেন। এছাড়া সুকুক ও বন্ডের মতো কাঠামোগত পুঁজিবাজার নিদর্শন পত্রকে ব্যাংকের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সীমা গণনার বাইরে রাখার দাবিও রয়েছে বাজার সংশ্লিষ্টদের, যা বিবেচনার অনুরোধ জানান এসইসির চেয়ারম্যান।
গভর্নরকে দেওয়া চিঠিতে এসইসির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা পরিলক্ষিত হচ্ছে যার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনুভূত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও এই মন্দার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এসইসির মধ্যে সহযোগিতার পরিমাণ ও ক্ষেত্র বাড়ানো আবশ্যক।
ব্যাংকের বিনিয়োগ করা শেয়ারের ক্রয়মূল্যকে বাজারমূল্য বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এসইসির চেয়ারম্যান চিঠিতে উল্লেখ করেছেন যে, পুঁজিবাজারের বৃহত্তর স্বার্থে ও এর পরিধি বাড়াতে বন্ড, সুকুকের মতো পুঁজিবাজার নিদর্শনপত্রসমূহকে ব্যাংকের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ সীমা গণনার বাইরে রাখা একান্ত প্রয়োজন।
অবশ্য পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা বাড়াতে নানা তোড়জোড় চললেও ব্যাংকগুলো এগিয়ে আসছে না। এখনো বেশিরভাগ ব্যাংকের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সীমার অনেক নিচে রয়েছে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত পুঁজিবাজারে এককভাবে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ রয়েছে ১৪ হাজার ১৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগ সীমার ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এরমধ্যে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৪ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেওয়া আছে।
২০১০ সালের পর পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ কমিয়ে আনতে আইন সংশোধন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ব্যাংকগুলো মোট দায়ের পরিবর্তে বর্তমানে রেগুলেটরি মূলধনের মাত্র ২৫ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। সাবসিডিয়ারিসহ ব্যাংকগুলো রেগুলেটরি মূলধনের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যাংক-কোম্পানি এমনভাবে উহার পুঁজিবাজার বিনিয়োগ কোষ পুনর্গঠন করিবে যাহাতে ধারণকৃত সকল প্রকার শেয়ার, করপোরেট বন্ড, ডিবেঞ্চার, মিউচুয়াল ফান্ড ও অন্যান্য পুঁজিবাজার নিদর্শনপত্রের মোট বাজারমূল্য এবং পুঁজিবাজার কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়োজিত নিজস্ব সাবসিডিয়ারি কোম্পানি বা কোম্পানিসমূহ বা অন্য কোনো কোম্পানি বা কোম্পানিসমূহে প্রদত্ত ঋণ সুবিধা এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে গঠিত কোনো প্রকার তহবিলে প্রদত্ত চাঁদার পরিমাণ সমষ্টিগতভাবে উহার আদায়কৃত মূলধন, শেয়ার প্রিমিয়াম, সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি ও রিটেইন্ড আর্নিংস এর মোট পরিমাণের ২৫ (পঁচিশ) শতাংশের অধিক না হয়।
পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ সীমার বাইরেও ব্যাংকগুলো আলাদাভাবে ট্রেজারি বিল ও বন্ড রেপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারে। ব্যাংকগুলো চাইলে নিজস্ব উৎস থেকেও এমন তহবিল গঠন করতে পারে। ওই বিশেষ তহবিলের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিজস্ব পোর্টফোলিওতে ব্যবহার করতে পারবে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে গঠন করা বিশেষ তহবিল ২০২৫ সাল পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারবে ব্যাংক, যা পুঁজিবাজারে ব্যাংক কোম্পানি আইনের বর্ণিত বিনিয়োগ গণনার বাইরে থাকবে। তহবিলের অর্থ শুধু পুঁজিবাজারের ২১৭টি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা যাবে, যা পুঁজিবাজারে ব্যাংক কোম্পানি আইনের বর্ণিত বিনিয়োগ গণনার বাইরে থাকবে।
