সেই জজ মিয়ার খেদোক্তি

সবাই আমাকে ব্যবহার করছে খোঁজ নেয় না কেউ

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২২, ০২:০৫ এএম

‘সবাই আমাকে ব্যবহার করছে। বিএনপির আমলে ক্রসফায়ারের ভয় দেখাইয়া জোর করে জবানবন্দি নিছে। আর আওয়ামী লীগের আমলে হইছি মামলার সাক্ষী। কিন্তু আমি আমার পরিবার নিয়ে খুব বিপদে আছি। ছোট বোন, স্ত্রী ও এক মেয়ে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকি। ভাড়ার টাকাও ঠিকমতো দিতে পারি না। অনেক দিন ধরে বিভিন্ন কাজ করার চেষ্টা করছি। ব্যবসা করার চেষ্টা করছি, হাসপাতালে খাদ্য সাপ্লাইয়ের কাজ করছি। আবার ঠিকাদারি করার চেষ্টাও ছিল। সংসার চালানোর জন্য মাসে ১০-১২ হাজার টাকা লাগে। নানা ধরনের পরিশ্রম করে সেই টাকা আয়ের চেষ্টা করি।’ এভাবেই জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার সংগ্রামের কথা গত শুক্রবার দেশ রূপান্তরের কাছে তুলে ধরেন ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আলোচিত জজ মিয়া। যার আসল নাম মো. জালাল (৪৮)। চাপের মুখে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা নিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তিনি। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনিই তুলে ধরেন প্রকৃত সত্য। বিনা অপরাধে বেশ কয়েক বছর কারাভোগ করতে হয়েছিল তাকে।

নিজের আর্থিক দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে জালাল ওরফে জজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী আমি। অথচ কেউ আমার খোঁজ নেয় না। আমার এলাকার এমপি সরাসরি বলে দিছে, ‘যেখানে প্রধানমন্ত্রী তোমারে কিছু করে নাই, সেখানে আমিও কিছু করতে পারব না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার পিঠ দেয়ালে ঠেইকা গেছে। সরকারের কাছে দাবি জানাইছি, যেন আমি ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারি। স্থায়ী একটা কর্ম দরকার। কিন্তু কেউই আমাকে কোনো কর্ম দেয় নাই, পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করে নাই। এখন আমি নিরুপায়। তাই আদালত ছাড়া কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই।’

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তাকে ফাঁসিয়ে চার বছর কারাগারে রাখার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০ কোটি টাকা চেয়ে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান জালাল। ইতিমধ্যে তিনি আইনজীবীদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের কাছে আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে জালাল বলেন, ‘বিএনপি আমলে মামলার আসামি হইছি। আইনগতভাবে সবকিছু মোকাবিলা কইরা আইছি। ভিটেমাটি যা ছিল হারাইছি। যে ক্ষতি হইছে, বিনা অপরাধে যে চারটা বছর জেল খাটছি, হের জন্য আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি না, তারপরও তারা আমারে আসামি বানাইছে। প্রকৃত আসামি কারা সবাই জানে। এসব কারণেই আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতের কাছে দাবি জানাইছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমারে দুই লাখ টাকা দিছে। কিন্তু সেই টাকা দিয়েও আমার মাকে বাঁচাতে পারি নাই। উল্টো ৫-৬ লাখ টাকা ঋণ হইছে।’

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে নাম জড়িয়ে যাওয়ায় কেউ তাকে সাহায্য করতে চান না বলে জানান জালাল। তিনি বলেন, ‘আমি এই মামলার আসামি। আবার এই মামলার সাক্ষী। এই কারণে আমি রাজনৈতিক বিতর্কে। আর বিতর্কের কারণেই আমি কারও কাছে কোনো সাইড (সাহায্য) পাই না। কেউ আমাকে কোনো সাইড দেয় না। সবাই বলে তোমারে সহায্য কইরা কি আমরা বিপদে পড়ব?’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ছিলাম বিএনপির আমলে আসামি। আওয়ামী লীগের আমলে হইছি সাক্ষী। এই কারণে কেউই আমারে বিশ্বাস করে না। ব্যবসা বা কর্ম করে খাওয়ার সুযোগ দেয় না। দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পাওয়ার চেষ্টা করছি, কিন্তু দেখা করতে পারি নাই। তাই আমি এখন আদালতের সহায়তা নিচ্ছি। গত ১১ আগস্ট  আইনজীবীদের মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিস পাঠাইছি। স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি, ঢাকা জেলা প্রশাসন, মতিঝিল থানার ওসি, নোয়াখালীর সেনবাগ থানার ওসি, সিআইডি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরীর ঠিকানায় এই নোটিস পাঠানো হয়। নোটিসের জবাব আসার পর মামলা হইব।’

তিনি আরও বলেন, ‘গ্রেনেড হামলায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হইছে তাগো সবাই সহায়তা পাইছে। আমি হামলায় আহত না হইলেও বড় ক্ষতির শিকার হইছি।’

উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। এতে দলের নেতাকর্মীসহ ২২ জন নিহত হন। আহত হন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাসহ কয়েকশ নেতাকর্মী। শুরু থেকেই এ গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়। প্রথমে শৈবাল সাহা পার্থ, পরে আওয়ামী লীগ নেতা মোখলেসুর রহমানকে ফাঁসাতে না পেরে ধরে আনা হয় মো. জালালকে। তার নাম দেওয়া হয় জজ মিয়া। ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে ধরে আনা হয় জালালকে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তৎকালীন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জালালকে ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকে সাজানো জবানবন্দি আদায় করে। ২০০৫ সালের ২৬ জুন আদালতে দেওয়া কথিত জবানবন্দিতে জজ মিয়া বলেছিলেন, পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বড় ভাইদের নির্দেশে তিনি অন্যদের সঙ্গে গ্রেনেড হামলায় অংশ নেন। বড় ভাইয়েরা হচ্ছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদ, মুকুল প্রমুখ। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে গ্রেনেড হামলা মামলা তদন্তের উদ্যোগ নেয়। তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন এ সংক্রান্ত মামলা দুটির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় সিআইডি। অব্যাহতি পান জোট সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হওয়া জজ মিয়াসহ ২০ জন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত