রাজনীতি ও অর্থনীতির কৃষ্ণপক্ষ-শুক্লপক্ষ

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২২, ১১:১৩ পিএম

১. অভাবে এক পাহাড়ি মা তার নাড়িছেঁড়া বুকের ধনকে বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে গেছেন! চাঁদপুরে দুই শিশু কন্যাসন্তান বিক্রি করেছেন বাবা! এ মুহূর্তে এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনা আর কী হতে পারে! এটিই কি তবে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশের চেহারা?

গত এক দশক ধরে কেবল উন্নয়নের কথা শুনে যাচ্ছি। কিন্তু ‘উন্নয়ন’ কি কেবল অবকাঠামো? অবশ্য অবকাঠামো চোখে দেখা যায় বলে আমরা সহজে উন্নয়নের সুখ গায়ে মাখতে পারি। কিন্তু একজন খেটে খাওয়া মানুষের চুলায় হাঁড়ি উঠল কিনা সেই খবর কেউ রাখে না। সরকার শুরু থেকে ‘উন্নয়ন’, ‘ভালো আছি’, ‘ভালো থাকব’ ‘কোনো সংকট নেই’সহ নানা কথা বললেও লোডশেডিং করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়নের গল্প যে গলার কাঁটা তা জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়ে পড়ল।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, বৈশ্বিক মন্দায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ অনেক সুখে আছে, বেহেশতে আছে। মন্ত্রী যখন একথা বলছেন, তখন পাহাড়ের এক মা পেটের জ্বালায় নিজের ছেলেকে বাজারে বিক্রি করতে বসে গেছেন!

ওই পাহাড়ি মা কিংবা চাঁদপুরের বাবা জানেন না ‘উত্তম, মধ্যম বা অধম আয়ের দেশ’-এর মানেটা কী? তাদের কাছে ক্ষুধার জ্বালা কীভাবে মিটবে, তার মীমাংসা করাটাই নিত্যদিনের কাজ। দেশে যখন ঋণগ্রহীতার একদিন বয়সী নবজাতক বিক্রি করে সুদ কারবারি তার দাবিমতো টাকা আদায় করে কিংবা চা-বাগানের শ্রমিকরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে আর না পেরে রাস্তায় নেমে দৈনিক মাত্র ৩০০ টাকা মজুরি দাবি করেন ও সরকার তা নিয়েও দেনদরবার করে... তখনো কি আমরা বলব দেশ ভালো আছে কিংবা মানুষ বেহেশতের সুখে দিনাতিপাত করছে!

২. করোনার প্রকোপ থেকে বিশ্ব সবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার মাত্রা আবার বাড়তে শুরু করেছে। ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, বেকারের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকাসহ বহু পশ্চিমা দেশের দেওয়া আর্থিক ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা গ্লোবাল জিডিপি বা বৈশ্বিক মোট উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির এই ছন্দপতনে দেশকে যতটা সম্ভব নিরাপদ রেখে চলার পথ খুঁজে বের করা, যাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ যথাসাধ্য কম হয় এটাই এখন সব দেশের কাছে প্রধানতম চ্যালেঞ্জ। এই ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার আবহে প্রধানত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে সরকারি এবং বেসরকারি, উভয় ক্ষেত্রেই ঋণের বোঝা; মূল্যস্ফীতি; এবং আর্থিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারীর চেয়েও বড় নীরব ঘাতক এই মূল্যস্ফীতি। তবে, কেবল মহামারী ও যুদ্ধের কারণেই যে এই মূল্যস্ফীতি, তা ঠিক নয়। গত দু’বছরে দেশের রাজস্ব ও মুদ্রানীতি যে পথে হেঁটেছে, এটা তারও ফল বটে। সেগুলোই এখন চাপ সৃষ্টি করছে। কাজেই, এখন কঠোরতর মুদ্রানীতি গ্রহণ করাই বিধেয়।

৩. সিঙ্গাপুরের রূপকার ও দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে একটি নীতি নির্ধারণ করেছিলেন, সরকার এমন কোনো খাতে যেন অর্থ ব্যয় না করে, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় গুরুত্ব দেন। সিঙ্গাপুরের মানুষ সহজে সরকার-প্রদত্ত আবাসনে বাড়ি কিনতে পারেন। তিনি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বিনিয়োগে নাগরিকদের বাধ্য করেন, যাতে তারা চিকিৎসা খাতে আকস্মিক ব্যয়ের মোকাবিলা করতে পারেন। অবশ্য করের বোঝা হাল্কা করে তিনি অন্য পথ উন্মুক্ত করেন। বাংলাদেশে এই ধরনের কোনো ব্যবস্থা কি নেওয়া হয়েছে নাকি শুধু বলার জন্য উন্নত দেশ হিসেবে সিঙ্গাপুরের কথা বলা?

৪. দেশের অর্থনীতিকে বিশ্ব অর্থনীতিকে আলাদা করা যাবে না। কিন্তু প্রশ্ন, মূল্যস্ফীতি কতটা বৈশ্বিক সংকটের কারণে আর কতটা নিজেদের ডেকে আনা। অর্থপাচার ঠেকানোর ব্যর্থতা, দুর্নীতি এবং বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে ভুল নীতির খেসারত কেন জনগণকে দিতে হবে? জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হবে, সেটা বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু একধাপে তেলের দাম ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে কেন মূল্যস্ফীতিকে সাড়ম্বরে ডেকে আনা হলো, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য নেই সরকারের। 

গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধে ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন দেখিয়েছেন, একলাফে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে যুক্তরাজ্যে কীভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ গরিব হয়ে গেছেন। জ্বালানি-দারিদ্র্য হীনম্মন্যতায় ভোগা একটা প্রজন্ম তৈরি করছে। অনেক শিশুর মা-বাবা টাকার অভাবে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারছেন না। এই শিশুরা অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশতে সংকোচ বোধ করছে। ডিকেন্সের উপন্যাসের মতো ব্রিটেনের শিশুদের শুরু হয়েছে একটা গ্লানিকর শৈশব। দেশটিতে গত এপ্রিলে একধাপে জ্বালানির দাম ৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়। এতে ১ কোটি পরিবারের ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষকে জ্বালানি-দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়তে হয়েছে। অক্টোবর মাসে সেখানে আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধির কথা চলছে। এর ফলে, সেখানকার ৩ কোটি ৫০ লাখ মানুষ জ্বালানি-দারিদ্র্যে পড়বে। গর্ডন ব্রাউন মূল্যস্ফীতি কমাতে না পারা রাজনীতিকদের সমালোচনা করে বলছেন, ‘ক্ষমতার কেন্দ্রে যারা থাকেন, মানুষের প্রতি তাদের নিষ্ঠুরতা শুধু অযোগ্যতা ও অসংবেদনশীলতা নয়, সেটা অনৈতিকও।’

আমাদের দেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে এক ধাক্কায় কত কোটি মানুষ গরিব হয়ে গেল, এ নিয়ে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কি পাওয়া যাবে? কিন্তু চারপাশে আত্মীয়স্বজন-বন্ধু-প্রতিবেশী কিংবা নিজের ঘরে পরিস্থিতি যা, তাতে সবাই মূল্যস্ফীতির বড় শিকার। কম খেয়ে, চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে, সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে, চাহিদা কাটছাঁট করে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন সবাই। 

৫. বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতে সরকার বিপুল ভর্তুকি দিচ্ছে। ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের দামও বাড়াতে হবে। আইএমএফও তা-ই বলছে। কিন্তু সরকার বা আইএমএফ ভর্তুকির কারণ দূর করতে অনিচ্ছুক। কেন এই ভর্তুকি, কারা পাচ্ছে ভর্তুকির টাকা? এর উত্তর পাওয়া যাবে এই তথ্য থেকে ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের নামে সরকার গত ১১ বছরে (২০১১-১২ থেকে ২০২১-২২) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ৯০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। এর মধ্যে ১২ কোম্পানির পকেটেই গেছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা।’

জ্বালানি তেলের সমস্যার কারণে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে, শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, এতে আমাদের রপ্তানির প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও কিছুটা কমছে। ফলে জ্বালানি নীতি নিয়েও বিতর্ক উঠেছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা বেড়েছে, কিন্তু প্রাথমিক জ্বালানির উৎস বা সরবরাহের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নেই। বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কিছু ব্যবসায়ীকে একচেটিয়া সুযোগ দেওয়া হয়েছে। চুক্তিও তাদের অনুকূলে করা হয়েছে। এতে বাজেটে ব্যয় বেড়েছে। অথচ গ্যাসের অনুসন্ধান না করে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি, বিশেষত তরলীকৃত গ্যাস (এলএনজি), ডিজেল, জ্বালানি তেলের ওপর আমরা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। এখন বিপদে পড়ে গ্যাস অনুসন্ধানের পরিকল্পনার কথা বলছি।

৬. সমস্যার উৎপত্তি বিশ্ব অর্থনীতির বিরূপ পরিস্থিতি থেকে, সেটি সবাই জানি। তবে পূর্ববর্তী এক দশক বা এরও বেশি সময়ের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাগুলোও বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অনেকটা দায়ী। বিশেষ করে ডিজেলের মতো বহুল ব্যবহৃত উপকরণের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ানোর কারণে পুরো অর্থনীতির ওপরে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এর সঙ্গে আরও কিছু বিষয় নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। যেমন খেলাপি ঋণ, বিদেশের অর্থ পাচার; এগুলো সবই বহুদিনের সমস্যা। আমাদের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে ডলারের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক সরাসরি। এ ছাড়া মেগা প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের সময়সূচির প্রশ্ন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষত আইএমএফ থেকে ঋণ চাওয়া নিয়েও একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এসব একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কিত।

৭. চায়ের কাপ নিয়ে টেবিলে দু’ধরনের আলোচনা হয়। একটি পক্ষ বলবে কৃষকের অর্জন, প্রবাসী শ্রমিকদের আয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতি, স্বাস্থ্যসেবা যদি আরেকটু বাড়ানো যেত, তাহলে বাংলাদেশ আগেই মধ্যম আয়ের দেশ বা উন্নত দেশ হতো। ইতিবাচকভাবে যারা দেখছেন, তারা এগুলোকেই বাংলাদেশের মডেল দেখছেন। আবার উল্টো দিকের কথা আরও ব্যাপক। এর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি সবাইকে মানতে হবে। যারা উন্নয়নের কথা বলেন, তারা দারিদ্র্যের হার কমেছে দাবি করলেও এই বৈষম্যের কথা স্বীকার করেন। অল্পকিছু লোকের হাতে অধিক সম্পদ। বিদেশে বাড়ি তাদের। সন্তানরা বাইরে পড়েন। বাইরে ব্যবসা করেন। তারা দেশে আয় করে বিদেশে পাচার করছেন। এটিই আমাদের অর্থনীতির উল্টোপথ, যেখানে বৈষম্যটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

এই দুটি ধারা দীর্ঘদিন একসঙ্গে চলবে না। একটি কৃষ্ণপক্ষ, অন্যটি শুক্লপক্ষ। হয় কৃষ্ণপক্ষ (অমাবস্যা) শুক্লপক্ষকে (পূর্ণিমা) গ্রাস করবে, নয়তো বা শুক্লপক্ষ কৃষ্ণপক্ষকে গ্রাস করবে। সবকিছু নির্ভর করছে রাজনীতির ওপর। রাজনীতি যদি লুটেরা ব্যবসায়ীদের হাতে পরিপূর্ণভাবে চলে যায়, তাহলে কৃষ্ণপক্ষ শুক্লপক্ষকে গ্রাস করে ফেলবে। বৈষম্যের সঙ্গে লড়তে লড়তে আমরা শুক্লপক্ষ-কৃষ্ণপক্ষ চিনতেও ভুলে যাচ্ছি, মানিয়ে নিচ্ছি; সেটাই সবচেয়ে বড় এবং ব্যাপক সামাজিক ক্ষতি। আবার যে পক্ষকে হটাবার জন্য ভোট দিলাম, দেখা যাচ্ছে দু’দিন বাদে তারাই সদর্পে ক্ষমতায় ফিরল। প্রতিকার বা প্রতিরোধের ক্ষমতা যাদের হাতে, তারাই এই অনাচারে পুষ্ট হচ্ছে। আমাদের কি নিস্তার নেই!

লেখক সহকারী সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত