বিদেশি ক্রেতারা পোশাক কেনার ক্ষেত্রে সাধারণত পোশাককর্মীদের বেতন, শ্রমিকের পেছনে খরচ, ফ্যাক্টরি ও ব্র্যান্ড ফ্যাক্টরির সঠিক শ্রমমূল্য ইত্যাদি বিবেচনায় নেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেশের পোশাক কারখানাগুলো ক্রেতা ধরে রাখতে অসম প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। পোশাকের ব্যয় নিয়ে ক্রেতারাও থাকেন অন্ধকারে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই পোশাকের যৌক্তিক মূল্য পায় না পোশাক কারখানাগুলো। পোশাকের যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিতে অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফেয়ার প্রাইস অ্যাপস’।
নিটওয়্যার কারখানায় নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ ও ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ফেয়ার প্রাইস অ্যাপটি তৈরি করেছে ফেয়ার উইয়ার, যেটি সাসটেইনেবল টেক্সটাইল ইনিশিঢেটিভ : টুগেদার ফর চেঞ্জ (স্টিচ)-এর একটি অঙ্গ সংগঠন। শুরুতে এ অ্যাপটি বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সদস্যদের নিয়ে কাজ করবে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে বিকেএমইএ ও স্টিচের মধ্যে এ বিষয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
ফেয়ার প্রাইস অ্যাপ উৎপাদনের খরচ, উপাদান ও পরিমাণ সন্নিবেশ করে কারখানা এবং ব্র্যান্ডগুলোকে তথ্য দিয়ে ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে সহায়তা করবে। ফেয়ার উইয়ার ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার বাবলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পোশাকের যৌক্তিক মূল্য আদায়ে এ অ্যাপের সুবিধা নিতে শুরুতে বিকেএমইএর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আমরা বিজিএমইএর সঙ্গেও কথা বলেছি। অ্যাপের সুবিধাদি সেখানেও তুলে ধরা হবে। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের সব কারখানা যাতে এটি ব্যবহার করে, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।’
গতকালের অনুষ্ঠানে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের অর্থনীতিবিষয়ক ফার্স্ট সেক্রেটারি বাস ব্লাউ বলেন, ‘এ দেশের পোশাক কারখানায় জেন্ডার সমতা আনতে আমাদের অনেক কিছু করার আছে। বাংলাদেশের পোশাক খাতের অগ্রগতি অকল্পনীয়। নেদারল্যান্ডস এ ধরনের আরও কয়েকটি চুক্তিতে আগ্রহী।’
ফেয়ার উইয়ার ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আলেকজেন্ডার কন্সটাম বলেন, ‘গার্মেন্টসে যৌন হয়রানি রোধ করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যবশত এটি বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে বেশি। অবশ্য এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশেরই না, এটি সারা বিশে^রই সমস্যা।’ তিনি বলেন, ‘নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে আমরা এখন থেকে একসঙ্গে কাজ করব। আরেকটি চুক্তি হয়েছে ফেয়ার প্রাইস নিয়ে। এর মাধ্যমে কারখানাগুলো সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি করতে পারবে। ক্রেতাদের সঙ্গে সহজে কথাও বলতে পারবে। অনেক কারখানাই আমাদের অনুরোধ করে কারখানায় একটি ফেয়ার প্রাইস নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য।’
অনুষ্ঠানে বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘ফেয়ার প্রাইস অ্যাপ দিয়ে কারখানাগুলো ক্রেতাদের কাছে আরও সহজে পৌঁছে যেতে পারবে। ফেয়ার প্রাইসের মাধ্যমে আমার প্রফিট পর্যন্ত ভাবতে হবে।
আমাদের বাঁচার জন্য শ্রমিক প্রয়োজন হয়। ক্রেতাদেরও মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। এজন্য আমাদের টুলস দরকার। আমরা সেদিক বিবেচনা করেই এটি করেছি।’
বিকেএমইএর এ নেতা আরও বলেন, ‘দেশে এক হাজারেরও ওপর গার্মেন্টস কারখানা তৈরি হয়েছে। এটি ইতিবাচক দিক। তবে আইএলও-১৯০-এর চুক্তির দাবি উঠলেও আমরা এখনই তা করছি না। যেসব দেশ এসব চুক্তি করেছে, তা বিশ্লেষণ করার পরই সে বিষয়ে চিন্তা করব।’
বিকেএমইএ ও স্টিচের মধ্যে চুক্তির উদেশ্য হলো লিঙ্গ বৈষম্য, যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি নির্মূল করতে ২০০৮ সালের এক রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী এ কমিটির কাজ করা। প্রকল্প পরিচালনায় অভ্যন্তরীণ মাস্টার ট্রেইনারদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিকাশ এবং মূল্যায়নে বিকেএমইএকে কারিগরি সহায়তা দেবে স্টিচ কনসোর্টিয়াম। প্রতিষ্ঠানটির অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে মন্ডিয়াল এফএনভি, এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ (ইটিআই) এবং ফেয়ার উইয়ার ফাউন্ডেশন এ প্রকল্পে যুক্ত থাকবে। এতে অর্থায়ন করে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত আছে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ফেয়ার প্রাইস অ্যাপের মাধ্যমে উৎপাদনের খরচ, উপাদান ও পরিমাণ সন্নিবেশ করে কারখানা এবং ব্র্যান্ডগুলোকে তথ্য দিয়ে ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে সহায়তা করবে। ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিকেএমইএর সদস্য কারখানাগুলোতে এ অ্যাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কাজ করবে বিকেএমইএ ও ফেয়ার উইয়ার ফাউন্ডেশন।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইটিআইর কান্ট্রি ম্যানেজার আবিল বিন আমিন, মন্ডিয়াল এফএনভির কনসালট্যান্ট শাহিনুর রহমান, বিকেএমইএর সহসভাপতি আকতার হোসেন অপূর্ব, সাবেক পরিচালক শহীদউদ্দিন আহমেদ আজাদ, স্টিচের কনসোর্টিয়াম কো-অর্ডিনেটর মায়ে ক্যালেন্ডার, স্টিচের ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাডভাইজরি বোর্ডের উপদেষ্টা আমিনুল হকসহ আরও অনেকে।
