রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় এখন থেকে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে ফার (ফ্লোর এরিয়া রেশিউ) মানতে হবে। এ নিয়ম মানার সঙ্গে এলাকাভিত্তিক বিদ্যমান রাস্তার প্রশস্ততা ও প্লটের আয়তনের ভিত্তিতে ভবনের উচ্চতা অনুমোদনের বিধান রেখে নতুন ড্যাপ কার্যকরের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর মধ্য দিয়ে রাজউকের আওতাধীন এলাকার আগের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ ১৯৯৫-২০১৫) কার্যকারিতা হারিয়েছে, যা পাস হয়েছিল ২০১০ সালে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী প্রধান মো. বরকাতুর রহমান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাজউকের এখতিয়ারভুক্ত ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য ঢাকা মহানগর এলাকার ড্যাপের (২০১৬-২০৩৫) খসড়া ২০২০ সালে প্রকাশ করা হয়। এরপর খসড়ার ওপর সুপারিশ ও আপত্তি দাখিল করার জন্য সবার কাছে আহ্বান জানানো হয়। পরে আপত্তি ও সুপারিশ বিবেচনা করে মহাপরিকল্পনাটি অনুমোদন করা হয়েছে। এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। পাশাপাশি ২০১০ সালে পাস হওয়া ড্যাপ রহিত করা হলো। কিন্তু প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগ পর্যন্ত ২০১০ সালের ড্যাপের অধীনে যেসব কাজ সম্পন্ন হয়েছে বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো বৈধ বলে গণ্য হবে।
এ বিষয়ে ড্যাপের পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, নতুন এ ড্যাপের সীমানা বলতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, গাজীপুর সিটি করপোরেশন, কালীগঞ্জ ও রূপগঞ্জ উপজেলা, কালীগঞ্জ পৌরসভা, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ উপজেলা ও সাভার উপজেলা। ২০ বছর মেয়াদি এ পরিকল্পনায় মূলত এলাকাভিত্তিক উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়নি। এখন ফার আর রাস্তার আয়তন ও প্লটের আয়তনের ওপর নির্ভর করে ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করা হবে। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় মূলত উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা বিষয়টিতে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো উন্নয়ন উদ্যোগের ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে, সেই প্রক্রিয়াগত পদ্ধতিটি বলা আছে। এটি মূলত একটি বিধির মতো কাজ করবে। এর মাধ্যমে কেউ কোনো জমিতে বাড়ি, কারখানা কিংবা অন্য যেকোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে চাইলে তার ধরন নির্ধারণ এবং তার ভূমি ব্যবহার অনুমোদন নীতিমালা মেনেই দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, অবকাঠামো, সেবা ও অন্যান্য উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় এ পরিকল্পনার অধীনে বিভিন্ন খাতভিত্তিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নগরায়ণ ও নগর সম্প্রসারণ, আবাসন, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা, নগরজীবনরেখা, পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা আলাদাভাবে দেওয়া আছে, যাতে পরবর্তী সময়ে এ দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী এলাকা ও খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। এরমধ্যে পুরো এলাকার ৬টি জোনে ৬টি বড় আকারের পার্কের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। পুরান ঢাকাকে ঢেলে সাজানোর একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ড্যাপ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যবস্থায় সড়কপথ, জলপথ ও রেলপথকে গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় সড়কপথকে নতুন ধারণার আওতায় ‘নগরজীবনরেখা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাতে তা যোগাযোগব্যবস্থার সমন্বয় ঘটানোর পাশাপাশি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব গাছ রোপণের মাধ্যমে শহরের একঘেয়ে জীবনকে প্রাণবন্ত করতে সহায়তা করবে। পরিবহন খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাল্টিমোডাল নেটওয়ার্কিং সিস্টেমের অর্থ হচ্ছে একাধিক পরিবহন মাধ্যম ব্যবহার করে একটি যাত্রাকে সহজতর করা। বর্তমানে শহরভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থায় বিভিন্ন মাধ্যম (যেমনবাস, ট্রেন, নৌযান, অযান্ত্রিক যান) ব্যবহৃত হচ্ছে; নতুন আরও পরিকল্পনা হচ্ছে, যেমনএমআরটি, বিআরটি, সার্কুলার রেল নেটওয়ার্ক, সার্কুলার ওয়াটার নেটওয়ার্ক। এসবের মধ্যে সুন্দর একটি সমন্বয় প্রয়োজন, যাতে যাত্রী খুব সহজেই একাধিক মাধ্যম ব্যবহার করে তার গন্তব্যে যেতে পারে। সে বিষয়গুলোও এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সড়ক নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা নিয়ে কর্মকর্তারা আরও বলেন, সড়কপথ, জলপথ ও রেলপথকে গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রাকৃতিক যোগাযোগমাধ্যম জলপথ এবং ভারী যোগাযোগমাধ্যম রেলপথকে সড়কপথ দিয়ে সমন্বিত করে পুরো যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সাজানো হয়েছে, যেন জনগণের যোগাযোগ ও পরিবহন স্বচ্ছন্দ ও আরামদায়ক হয়। সবাই যেন নির্বিঘেœ এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে যাতায়াত করতে পারে, তা বিবেচনায় নিয়েই পরিবহন নেটওয়ার্ক করা হয়েছে। এবারের পরিকল্পনায় মোট ১ হাজার ৩২৬ দশমিক ৯ কিলোমিটার নদী ও খাল রয়েছে।
আবাসিক অনাবাসিক মিশ্র ব্যবহার এলাকায় নির্দিষ্ট অননুমোদিত ব্যবহারের বাইরে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বেশিরভাগ ব্যবহারই অনুমোদিত হবে বলেও জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। বিভিন্ন এলাকায় মিশ্র ব্যবহার জোনের প্রস্তাব মানে এই নয় যে, এসব জোনে কোনো একক স্থাপনা মিশ্র ব্যবহার ছাড়া (যেমন সম্পূর্ণ আবাসিক) অনুমোদন করা যাবে না। বরং এটাই পরিকল্পনায় বলা হয়েছে যে, আবাসিকের পাশাপাশি ওই জোনে অনুমোদিত বা শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত অনাবাসিক ব্যবহার চাইলে করতে পারবে। এলাকাভেদে আবাসিকের সঙ্গে কতটুকু পরিমাণ অনাবাসিক ব্যবহারের অনুমোদন নিতে পারবে তার পরিমাণ প্লটসংলগ্ন বিদ্যমান রাস্তার প্রশস্ততা অনুযায়ী নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
