অবশেষে ডিমের দাম কমার মধ্য দিয়ে ভোক্তাদের একটা অতিক্ষুদ্র বিজয় সম্পন্ন হলো। বাংলাদেশের কোনো কিছুর দাম বাড়লে দেখা গেছে সেটার দাম আর কমে না। এটাই ব্যবসায়ীদের কৌশল। একবার ভোক্তাদের মধ্যে সহ্যশক্তিটা বাড়াতে পারলে আর কোনো চিন্তা নেই। এবারে ব্যবসায়ীদের গোলটেবিল থেকে বোঝা গেল ওই মুনাফা নিয়েই এদের মধ্যে বড় বড় ঝগড়া-বিবাদ আছে। খামারিরা দোষারোপ করে পাইকারি ব্যবসায়ীদের, আবার যারা পাইকারি ব্যবসায়ী তারা দোষারোপ করে অন্যকে। মাঝখান থেকে যারা প্রকৃত উৎপাদক তাদের কোনো লাভ হয় না। কিন্তু এর মধ্যেই পাঁচশ কোটি টাকার একটা বাণিজ্য হয়ে যায়।
বাংলাদেশে অবশ্য এক কোটি, দুই কোটি, দশ কোটি এই অঙ্কগুলো হাস্যকর, শত-কোটিও হাস্যকর, হাজার কোটি না হলে তা কোনো ধর্তব্যের মধ্যে আসে না। অর্থ একটা বড় ধরনের অনর্থে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশের অর্থনীতিবিদরা এত বড় বড় কথা বলেন, কিন্তু মানুষকে টাকার মূল্য শেখাননি এবং মাথাপিছু আয় যে কত বড় প্রতারণা এটাও শেখাননি। একটি ডিমের মূল্য যদি পঞ্চাশ টাকাও হয় তাতে যে লোকটা হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে তার জন্য ক্রয় করা কোনো ব্যাপার না। কিন্তু যে লোকটা দৈনিক ৩০০ টাকা আয় করে তার জন্য খুব কঠিন অথবা যে চা শ্রমিক দিনমজুরি বাবদ দৈনিক ১২০ টাকা পায় তার কাছে ডিমের মূল্যটা কত ভয়াবহ!
সেদিন তপ্ত দুপুরে একটি মেয়ে একজন রিকশাওয়ালাকে ঠিক করেছে কোথাও যাবে বলে। রিকশাওয়ালা মুখে সিগারেট নিয়েই বলল চলেন আপা। মেয়েটি বলছে আপনি আগে সিগারেটটা শেষ করেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম তুমি ওকে সিগারেট শেষ করতে বলেছো কেন? মেয়েটি বলল ওর সিগারেটের মূল্য পাঁচ টাকা, আমি ভাড়া দেব বিশ টাকা। আমি বললে হয়তো সিগারেট ফেলে দিত। কিন্তু পাঁচটি টাকার মূল্য তার কাছে অনেক।
দেখা যায় ডিম, সবজি, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচের দাম যারা বাড়ায় প্রথমত এরা রাক্ষসের মতো লোভী এবং এদের নিয়েই হয়তো বহু বছর আগে সংস্কৃত নাট্যকার নাটক লিখেছেন ‘মুদ্রা রাক্ষস’। বাংলাদেশ এখন মুদ্রা রাক্ষসের দেশ। সব জায়গায় এই রাক্ষসদের চলাচল। আবার এই রাক্ষসরা খুব অভিমানী। লাখে তাদের মন ভরে না, হাজার কোটি চাই। এই মুদ্রা রাক্ষসরা নিজেরা খায় না, নিজেদের কষ্ট দেয়, টাকাটা বিদেশে পাচার করে থাকে। আর অসাধুভাবে অর্থ উপার্জন কখনো অন্যের মাথায় বাড়ি দিয়ে রাষ্ট্রের সম্পদ লুণ্ঠন করে এসবে আবার নানান ধরনের দুশ্চিন্তা আছে। যার কারণে দেশে একটা বিশাল ওষুধ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। দেশের ওষুধ বা হাসপাতালে তাদের একটা পর্যায়ে চলছে না, চলে যাচ্ছে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক কিংবা লন্ডনে। স্ত্রী-সন্তানরা থাকে আমেরিকায় অথবা কানাডার বেগমপাড়ায়। এর মধ্যে আছে নানান ধরনের পারিবারিক অশান্তি, তাতে আমাদের সমস্যা নেই। কিন্তু এর মধ্যে আছে দেশের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ী। পক্ষান্তরে এরাই দেশ চালায়। দেশ পরিচালনা ও মুদ্রাস্ফীতিতে এবং নিত্যব্যবহার্য জিনিসের মূল্যের উল্লম্ফনে এদের ভূমিকা থাকে। কিছু উল্টোপাল্টা সিদ্ধান্ত তারা কানাডা বা আমেরিকায় বসে নিয়ে থাকে। আবার কিছু কিছু ব্যবসায়ী স্থায়ীভাবে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডে বসবাস করে। ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবিধায় এদের ব্যবসা-বাণিজ্যে কোনো অসুবিধা হয় না, সকাল বেলায় একঘণ্টা সময়ের মধ্যে তাদের অফিশিয়াল কাজ শেষ হয়ে যায়। তারপরে তারা বিপণিবিতান, রেস্তোরাঁ ও হাসপাতালে ঘোরাঘুরি করে।
তবে এবারের এফবিসিসিআইয়ের যে তৎপরতার ফলে গোলটেবিল বৈঠকটি হয়েছে তাতে ডিমের দাম কিছুটা কমেছে তাতে একটা ছোট্ট সুবাতাস দেখা যাচ্ছে। কিন্তু অন্যান্য জিনিসের দাম কিছুটা কমলেও সয়াবিন তেলের দাম কেজিতে সাত টাকা বেড়ে গেল। বাঙালি বড়ই রসিক জাতি, অনেক সিরিয়াস বিষয় নিয়ে চুটকি বের করে ফেলে। যেমন ডিমের দাম বাড়ার পর একটা কথা চালু হলো, মুরগি ডিজেল খায়, ডিজেলের দাম বাড়াতে ডিমের দামও বেড়ে গেছে। এবার দেখা যাবে কাঁচমরিচ, পেঁয়াজ ও চাল সয়াবিন খেতে শুরু করেছে। কাজেই সয়াবিনের দাম বাড়াতে হবে।
আমি একবার অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলাম তখন হঠাৎ করে কলার দাম বেড়ে গেল। কলার দাম বেড়ে যাওয়াতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের পতন হওয়ার উপক্রম। দ্রুত বিদেশ থেকে কলা আমদানি করাতে একদিনের মধ্যে কলার দাম কমে গেল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডিম আমদানির বিষয়টিও হয়তো কাজে লেগেছে। এতদিন জানতাম না যে ডিম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এত বুদ্ধিমান ব্যবসায়ীরা জড়িত। শুধু তাই নয় সব কিছু আমদানি করা যাবে কিন্তু ডিম আমদানি করা যাবে না। একটু আগে টাকার মূল্যের কথা বলছিলাম, এটা কি বিশ^াস্য! যে বাংলাদেশে দৈনিক মজুরি কোনো শ্রমিকের মাত্র পঁচাশি টাকা আছে এবং অনেক লড়াই-সংগ্রাম করে সেটা একশত বিশ পরে একশত পঁয়তাল্লিশ টাকায় ঠেকেছে। যেখানে দুই কেজি মোটা চাল কেনা যায় কোনোরকমে। চা-শ্রমিকদের প্রায় দুই শতাব্দীর লড়াই এখনো শেষ হয়নি এবং তারা এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছে। সেই মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, মাদ্রাজ, বাঁকুড়া থেকে আসা শ্রমিকরা বাংলাদেশে এসে আমাদের সকালবেলায় এককাপ ধূমায়িত চায়ের ব্যবস্থা করেছে। অথচ তাদের কথা আমরা কখনোই মনে করি না। অর্ধাহার-অনাহারে এই মানুষগুলো অকাল মৃত্যুবরণ করছে। তার দিকে আমাদের নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্র তাকায় না। কারণ আগের মালিক ছিল ইংরেজ, আর এখন অত্যন্ত প্রভাবশালীরা চা বাগানের মালিক।
অর্থনীতির সংজ্ঞায় টাকার মূল্যের কথা যদি বলি এদেশে এখন আর মধ্যবিত্ত শ্রেণির কোনো অস্তিত্ব নেই। অধিকাংশই নিম্নবিত্ত যারা মধ্যবিত্ত থেকে নেমে এসেছে আর নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত থেকে কারও কারও উচ্চবিত্তে উল্লম্ফন হয়েছে। এই উচ্চবিত্তের সংস্কৃতিও আলাদা। এদের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি স্কুলে পড়ে এবং সেখান থেকে ‘ও’ লেভেল, ‘এ’ লেভেল পাস করে সরাসরি চলে যায় ইউরোপ-আমেরিকা-কানাডা অথবা নিদেনপক্ষে থাইল্যান্ড-সিঙ্গাপুর। পাস করে সেখান থেকে কোনো রকম একটা ডিগ্রি নিয়ে পিতার সম্পদ রক্ষার্থে জায়গামতো চলে যায়। এরা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ বোঝে না, এরা উঁচু মানের ইংরেজি সাহিত্যও বোঝে না। ডিজিটাল মাধ্যমে মুম্বাই-হলিউডের ছবি দেখে এদের দিন কাটে। আবার এক ধরনের কিশোর-যুবকরা ইয়াবা জাতীয় নেশায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এই নিয়ে পিতার লুণ্ঠিত অর্থের একটা অংশের খরচ হয়ে যায়। এই মুদ্রা রাক্ষসরা সমাজ-সংস্কৃতি, মানবিক অনুভূতি এসব বোঝে না। এরা ডিমের মূল্য বৃদ্ধিতে পাঁচশ কোটি টাকা কয়েক দিনের মধ্যে খেয়ে ফেলল অথচ তা দিয়ে কোনো মহৎ কাজ করবে না। একটাই মহৎ কাজ করবে তা হলো মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করবে, ওয়াজ মাহফিলে টাকা দেবে অথবা সংসদ নির্বাচনে অর্থ বিনিয়োগ করবে। এইসব ব্যবসায়ী ধর্মকে এতই ব্যবহার করে যে, রোজার সময় প্রচুর মুনাফা কামিয়ে হজে যায় এবং হজ থেকে ফিরে এসে আবার মুদ্রা রাক্ষসের কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়। সেদিন জানতে পারলাম এক ব্যবসায়ী প্রতি বছর হজে যান এবং সুযোগ পেলেই বারবার ওমরাহও পালন করেন। তার মানে তার কোথাও একটা বড় ধরনের শান্তির অভাব আছে। সমাজে তার একটা খুব ভালো মানুষের মুখোশ আছে।
মানুষ দু’ধরনের জায়গা থেকে তাড়িত হয় একটা বিবেকের তাড়না অন্যটি হচ্ছে পরলোকের ভয়। যার আসলে কোনো ভয়ই নেই তাকে নিয়েই মহাবিপদ, লুটপাটে তার কোনো বাধা নেই। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের দিকে এইসব মুদ্রা রাক্ষসরা তাকায়ও না। দুটি জায়গায় ব্যবসায়ীরা সাধারণত অন্যায় কাজে লিপ্ত হয় না। একটি খাদ্য, অন্যটি ওষুধ। আমাদের দেশে এই দুটিই ব্যবসায়ীদের টার্গেট। খাদ্যের কথা তো এতক্ষণ বলা হলো, কিন্তু ওষুধেরও দুই নম্বরি কারখানা আছে এ দেশে প্রচুর। কালেভদ্রে এরা ধরা পড়ে। একটা জরিমানা দেয় তারপর আবার একই কাজ শুরু করে।
আমাদের দেশের মানুষের আসলে প্রতিবাদ করার স্পৃহা নেই। আজকাল খবরের কাগজ ও টেলিভিশনের দিকে তারা তাকিয়ে থাকে। সেসব জায়গায় সংবাদ হয় সরকার একটা ব্যবস্থা নেয়, তাতেই তারা খুশি। কিন্তু পাশের দেশ পশ্চিমবঙ্গেও দু’পয়সা দাম বাড়লে ক্রেতারা যেমন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে বাজারে হৈ চৈ ফেলে দেয় এখানে তা হয় না। দুদিন কেনাকাটা বয়কট করলে দাম কমতে বাধ্য। মানুষ কিন্তু ডিম না কিনতে শুরু করেছিল, দাম না কমালে এই ব্যবসায় ধস নামত। তাই নাগরিকদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন সেটাই একমাত্র সমাধান।
লেখক নাট্যকার, অভিনেতা ও কলামিস্ট
