গত ১০ বছরে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম বিশে^র মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে কম বাস্তবায়িত হয়েছে। ব্যয়বহুল দুর্নীতিবিরোধী কৌশলগুলো হয় ব্যর্থ হয়েছে অথবা নিজেরাই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, যাতে অর্থ ও সম্পদ নষ্ট হয়েছে। সরকারি প্রকল্পগুলোতে সংঘবদ্ধ চক্র কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্টদের প্রভাবে ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু ক্রয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ব্যবস্থার পাশাপাশি সহজ শর্তে স্বল্প সুদের অর্থায়ন করা গেলে প্রকল্প ব্যয় ২৫ শতাংশ কমানো যায়।
‘পাওয়ার, গভর্নেন্স অ্যান্ড ভিজিবল অ্যান্টি-করাপশন’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সেমিনারে গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করা হয়।
বিআইডিএস কাজী আলী তৌফিক মেমোরিয়াল লেকচার উপলক্ষে এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন। গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করেন গবেষক লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটির প্রফেসর মুশতাক হুসেন খান।
গবেষণায় দেখা যায়, সংঘবদ্ধ চক্রের হস্তক্ষেপ না থাকলে প্রকল্পের বাইরে থাকা নিলামে অংশগ্রহণকারীরা ইতিবাচকভাবে উপকৃত হন। এতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা থাকলে প্রকল্পের ঝুঁকিও কমে। আর যদি কোনো প্রকল্প সংঘবদ্ধ চক্রের হাতে চলে যায়, তবে নিলামে আগ্রহীদের ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যায়।
২০০৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৫৮টি বেসরকারি পাওয়ার প্ল্যান্টের সঙ্গে করা চুক্তি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্ল্যান্ট সাইজ, জ¦ালানি, প্রকল্পের মেয়াদ, তুলনামূলক কম সুদ ও সহজ শর্তের ঋণসুবিধার কারণে স্বার্থসংশ্লিষ্টতা বা সংযোগবিহীন দরদাতা ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিলামে অংশগ্রহণে আগ্রহী হয়। এতে স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিলামে জয়ী হলেও ব্যয় কমে ২৫ শতাংশ।
গবেষণায় বলা হয়, শুধু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দিয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পাশাপাশি ক্ষমতা ও স্বার্থকে এক করতে হবে। তাহলেই দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব।
এতে উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, যে সমাজে সবাই ক্ষমতাবান থাকে সে সমাজে একজন দুর্নীতি করতে পারে না। যেমন গুলশানে গাড়িতে উঠতে গিয়ে মানুষ লাইনে দাঁড়ায়। কেউ কাউকে টপকিয়ে সামনে যায় না। কেননা এখানে যে নিয়ম ভেঙে আগে যেতে চাইবে পরের জন তাকে টেনে পেছনে আনার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু গ্রামে যেখানে একজন ক্ষমতাসীন মানুষ লুঙ্গিপড়া মানুষের আগে গেলেও তাকে কেউ বাধা দেবে না।
মুশতাক হুসেন খান বলেন, দুর্নীতি আজ বিশ^ব্যাপী একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমাদের প্রচলিত ধারণা হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতি কমে আসবে। এটি সামনে রেখেই দেশে ও বিদেশে সব দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় এতকিছুর পরও দুর্নীতি কমছে না। বরং কোনো ক্ষেত্রে বেড়ে যাচ্ছে। গবেষণার মাধ্যমে আমি দেখিয়েছি শুধুমাত্র এ দুটি মাধ্যম দিয়ে দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না।
এছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি সমান পর্যায়ে নয়। কিছু ক্ষেত্রে ভালো কাজও হচ্ছে। এজন্য খাতভিত্তিক পর্যালোচনা করতে হবে। তারপরই দুর্নীতি বন্ধে উদ্যোগী হতে হবে। সমজাতীয় সমাজ প্রতিষ্ঠা করা গেলে দুর্নীতি থাকবে না। এছাড়া যদি দেখা যায় যারা শক্তিশালী এবং দুর্নীতি কমাতে চায় তাহলে তারা পারবে। কিন্তু যারা গরিব এবং শক্তিশালী নয়, কিন্তু দুর্নীতি কমাতে চায় তারা সহজেই পারবে না।
মুশতাক হুসেন বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তারা হয় দুর্বল, ক্ষমতা কম, না হয় তাদের স্বার্থ নেই। দুর্নীতি দমন তখনই হবে যখন শক্তি ও স্বার্থ এক হবে। যেমন কোথাও যদি বাঁধ বা সাইক্লোন শেল্টার তৈরি হয় সেখানে অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়ে থাকে। কিন্তু যদি স্থানীয় শক্তিশালী মানুষ যুক্ত হয়, তিনি যদি দেখেন বাঁধ বা শেল্টার হলে তার কিছু সুবিধা হবে তখন তিনি এক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেন। তখনই দুর্নীতি রোধ সহজ হবে।
তিনি বলেন, এখানে দুর্নীতি হচ্ছে তখন একটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু দুর্বল বা গরিব এলাকাবাসী যদি এখানে প্রতিবাদ করে তাহলে কাজ ওইভাবে হবে না। তিনি জানান, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও তানজানিয়াসহ বিভিন্ন দেশে গবেষণা পরিচালনা করে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
ড. বিনায়ক সেন বলেন, দুর্নীতি একটা ব্যাধির মতো হয়েছে। এটি দমন নয় বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। সমাজের সবাইকে সমভাবে শক্তিশালী করাটা হয়তো দ্রুত সম্ভব হবে না কিন্তু চেষ্টা থাকতে হবে। এজন্য নীতিমালাগত কিছু পরিবর্তন দরকার। দুর্নীতি বন্ধে রাজনৈতিক শক্তিসহ সব পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে।
