সবেমাত্র প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ছুটিতে শ্রীমঙ্গলে মামার বাড়িতে। তেলতেলে লম্বা বারান্দা, বিশাল এক রান্নাঘর, শানবাঁধানো পুকুর আর বেতের সোফাভর্তি সাজানো পোর্টিকো। কালারাম উড়িয়া নামে একজন কামলা খাটত ওই বাড়িতে। এক দিন কালারামের সঙ্গে লুকিয়ে চলে যাই দূরের এক চা বাগানে। উদনাছড়ায়। দুপুর ঘনায় কিন্তু কোনো খাবার দেয় না কেউ। সন্ধ্যায় রুটির সঙ্গে এক থকথকে তরকারি জোগাড় হয়। আর শুরু হয় গান। অচিন ভাষার সেই গানের কোনো অর্থ না বুঝলেও তা নাড়িয়ে দিয়েছিল আমার অবুঝ শৈশব। অনেক পরে জেনেছিলাম ওই সময় চা বাগানে চলছিল ‘হাতবন্ধ আন্দোলন’। মজুরি কম বলে কয়েক পয়সা মজুরি বাড়ানোর জন্য অনাহারে ছিল বাগানের পর বাগান। এরপর বড় হতে হতে বহুবার দেখেছি ‘চা বাগানের মজুরি আন্দোলন’। আজও চা বাগানে এই আন্দোলন চলছে দিনে মাত্র ৩০০ টাকা মজুরির জন্য। দৈনিক ১২০ টাকা মজুরি দিয়ে একটা সংসার চলে কি না এটি এখন এক পাবলিক আলাপ-তর্ক। আন্দোলন এখন এক ত্রিমুখী ধারা তৈরি করেছে। বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী এই মজুরি তর্কের এক ন্যায্য হিস্যা করবেন। আন্দোলনরত প্রধান ধারা প্রধানমন্ত্রীর দিকে চেয়ে আছেন। প্রধানমন্ত্রী টেলিভিশনে এসে ৩০০ টাকা মজুরির ঘোষণা দিলেই সবাই কাজে ফিরে যাবেন। এর ভেতর ২৫ টাকা বাড়িয়ে মজুরি ১৪৫ টাকার প্রস্তাব এসেছে এবং আন্দোলন স্থগিত করে আপাতত ১২০ টাকার মজুরিতে কাজে নিয়োগ করতে বলা হচ্ছে সবাইকে। চা শ্রমিক ইউনিয়নের শীর্ষপর্যায়ের কিছু নেতা এ বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। কিন্তু আন্দোলনের প্রধান ধারা এই নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। এ ঘটনাকে বড় নেতাদের ‘আপস’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এমন ‘আপসকামী’ নেতাদের নানা বাগানে চা শ্রমিকরা তিরস্কারও করছেন। আর তৃতীয় ধারাটি হলো নয়াউদারবাদী করপোরেট ধারা। যাকে সহজেই দুম করে আমরা ‘মালিক পক্ষ’ বলে ফেলি। চা বাগানের ‘মালিকানা’ নিঃসন্দেহে অপরাপর শিল্পের মালিকানার মতো নয়। এখানে পারিবারিক উত্তরাধিকারী বা শৌখিন উদ্যোক্তা আছেন, ফিনলে-ডানকান-ইউনিলিভারের মতো করপোরেট আছে, আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও আছে। তো তৃতীয় ধারাটি শুধু ‘মালিক-শ্রমিক’ দ্বন্দ্ব-সমীকরণের সঙ্গে জড়িত নয়। নয়াউদারবাদী বাজার ও মুনাফা নিয়ন্ত্রণের রাজনীতির সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক। আর এই তৃতীয় পক্ষটিই প্রচার করছে ‘আন্দোলনের মাধ্যমে একটি শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে’, ‘চা-পাতা তোলার ভরা মৌসুমে শ্রমিকদের আন্দোলন করা ঠিক হচ্ছে না’, ‘শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো সম্ভব নয়’ ইত্যাদি। মজুরি বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের মহামিথ্যা এজেন্ডা কেউ বিশ্বাস করছে না। চলতি আলাপখানি চা বাগানের চলমান আন্দোলনে একাত্ম হয়ে দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা দাবি করছে।
৩০০ টাকা মজুরি আন্দোলন : চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি নির্ধারণ বিষয়ে প্রতি দুই বছর পরপর চা শ্রমিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন’ এবং বাগান মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ চা সংসদের’ ভেতর দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়। সর্বশেষ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু দীর্ঘ ১৯ মাসেও কোনো নতুন চুক্তি হয়নি। এক দুঃসহ করোনা মহামারীকাল আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পুরো দুনিয়া আজ বিপর্যস্ত। জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক দাম কিংবা ন্যূনতম বেঁচে থাকার প্রশ্ন আজ হুমকির মুখে। জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট আর বৈশ্বিক বাজারের রাজনীতি রাষ্ট্রসমূহকে নানা নয়া সিদ্ধান্ত ও কৌশল গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে। অথচ এক চা বাগান প্রশ্নে আমরা নির্বিকার। রাষ্ট্র, করপোরেট, এজেন্সি, ক্রেতা-বিক্রেতা-ভোক্তা, মিডিয়া কী নাগরিক প্রতিক্রিয়া সবাই। যদিও চা বাগান নিয়ে ‘মূলধারার’ এই প্রবল নিষ্ক্রিয়তা বা ঔপনিবেশিক ঝিমিয়ে পড়া নতুন কোনো প্রবণতা নয়, এটি ঐতিহাসিক। গার্মেন্টস শ্রমিকরা মজুরির জন্য রাস্তায় নামলে বা লকডাউনে ভিড়ের চাপে ফেরি পার হলে আমাদের ছিঁচকাঁদুনে নাগরিক প্রতিক্রিয়া কিছুটা হলেও নাকের জলে চোখের জলে ‘সর্দি’ তৈরি করে। কিন্তু চা বাগানে একের পর নির্মমতা, নিপীড়ন, অন্যায়, জবরদস্তি, দাসত্ব চলে। এসব নিয়ে আমরা কেন জানি কখনোই ‘রা’ করি না। এর একটা কারণ হতে পারে এই চা শ্রমিকদের গরিষ্ঠভাগই ‘অবাঙালি’, আদিবাসী জনগণ।
চা শ্রমিকের আহামরি সুখ! : ২০০৬ সালে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৩০ টাকা। ২০০৮ সালে একজন চা শ্রমিকের মজুরি ছিল দৈনিক ৩২ টাকা। ২০০৯ সালে নিম্নতম মজুরি বোর্ড সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করে ৪৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৪৮ টাকা। ২০১৫ সালে দৈনিক মজুরি ৮৫ টাকা হলেও অনেক বাগানে দেওয়া হতো ৭৯ টাকা। বর্তমানে এই মজুরি ১২০ টাকা। কিন্তু কীভাবে এই মজুরি নির্ধারিত হয় এবং এটি কী সবার জন্য একই রকম? ১৯৬২ সালের ‘দ্য টি প্ল্যান্টেশন লেবার অর্ডিন্যান্স’ এবং ১৯৭৭ সালের ‘দ্য টি প্ল্যান্টেশন লেবার রুলস’ দ্বারা চা শ্রমিকদের ‘কল্যাণ’ নিয়ন্ত্রিত হতো। পরে ২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইনে চা বাগানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। চা শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারিত হয় শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি চা শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মালিক পক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশীয় চা সংসদের ভেতর সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে। সর্বশেষ চুক্তিপত্রটি কার্যকর হয় ২০০৫ সালে এবং ২০০৭ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও দেশে জরুরি অবস্থার কারণে তখন চুক্তি হয়নি। প্রতি পাঁচ বছর পরপর মজুরি বোর্ড গঠন করে চা শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ করার কথা থাকলেও দীর্ঘ ১১ বছর পর করোনাকালে গেজেট আকারে চা শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো প্রস্তাব করা হয়।
এই গেজেটে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার চা বাগানগুলোকে ‘এ’, ‘বি’ এবং ‘সি’ শ্রেণিতে এবং চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও অন্যান্য জেলার চা বাগানকে ‘১’, ‘২’ ও ‘৩’ ক্যাটাগরিতে ভাগ করে মজুরি প্রস্তাব করা হয়েছে। বছরে ১,৮০,০০০ কেজি বা তার চেয়ে বেশি চা উৎপাদন করে এমন বাগান ‘এ’ শ্রেণি এবং ১,০৮,০০০ কেজির কম উৎপাদন করে চা বাগানগুলো ‘সি’ শ্রেণির। ‘এ’ শ্রেণির বাগানের স্থায়ী এবং সাময়িক/ক্যাজুয়াল শ্রমিকের জন্য দৈনিক ১২০ টাকা, ‘বি’ শ্রেণির বাগানের জন্য ১১৮ টাকা এবং ‘সি’ শ্রেণির বাগানের জন্য ১১৭ টাকা প্রস্তাব করে মজুরি বোর্ড। তবে এই মজুরি নানা শর্তের শেকলে বন্দি। দিনে ন্যূনতম ২৩ কেজি চা-পাতা তুলতে পারলে এই মজুরি পাওয়া যায়। আর এই নির্ধারণ সীমার নাম ‘নিরিখ’। নিরিখের চেয়ে বেশি তুলতে পারলে প্রতি কেজির জন্য ৪ টাকা ২৫ পয়সা আর কম তুললে প্রতি কেজির জন্য কাটা হয় ৫ টাকা ২০ পয়সা। এই মজুরি ছাড়া আছে সাপ্তাহিক রেশন। একজন স্থায়ী শ্রমিক পুরুষ হলে তার পরিবার পাবেন ৩ কেজি ২০০ গ্রাম আটা এবং শ্রমিক নারী হলে পাবেন ২ কেজি ৪০০ গ্রাম। মজুরি আর রেশনের পর কিছু স্থায়ী শ্রমিক পরিবার পায় ‘ক্ষেতল্যান্ড জমি’। একজন স্থায়ী শ্রমিক চা বাগানে মাত্র এক কেয়ার (১ একর=২.৪৭ কেয়ার) ক্ষেতল্যান্ড জমিতে চাষাবাদের এই সুযোগ পান। আমন ও বোরো মৌসুমে ধান আবাদ ছাড়াও কিছু মৌসুমি শাকসবজি ফলে এসব জমিতে। এক কেয়ার জমির জন্য বরাদ্দ করা রেশন থেকে চা বাগান কর্তৃপক্ষ বছরে ৮০ কেজি চাল বা গম কর্তন করে। যদিও পরিসংখ্যান বলে, দেশে মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ ০.২৮ একর। এ ছাড়া শ্রমিকরা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে গাদাগাদি করে থাকার জন্য ‘লেবার লাইনে’ চৌদ্দ হাতের একখানা ঘর পান।
মালিকপক্ষের মিথ্যাচার : বাংলাদেশের চা উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে দেশে চা বাগান ১৬৭টি। ১৬৭ বছর ধরে চা উৎপাদন করেও চা শ্রমিকের মজুরি ১৬৭ টাকা পর্যন্ত হয়নি। চলমান ৩০০ টাকা মজুরির আন্দোলনকে অস্বীকার করে মালিক পক্ষ গণমাধ্যমে বলছেন, চা শ্রমিকরা মজুরি ছাড়াও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে দৈনিক ৪০২ টাকা আয় করেন। ২০০৬ সালের ৪২ নম্বর আইন হিসেবে দেশে গৃহীত হয় ‘শ্রম আইন ২০০৬’। ওই আইন অনুযায়ী চা বাগানসহ দেশের শ্রমিকের ‘মজুরির’ সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে রাষ্ট্র। আজ যখন চা বাগানে এত কম মজুরি কেন এই প্রশ্ন উঠেছে, দেশজুড়ে এবং পক্ষ-বিপক্ষ সব মানুষ বলছেন, ‘১২০ টাকা দিয়ে এই দিনে কীভাবে হয়’? কিন্তু মালিকপক্ষ তার পরও মিথ্যা অঙ্কের যোগফল টেনে সাফাই গাইছেন, চা বাগানে শ্রমিকের মজুরি কম নয়। মানে চা বাগানের মালিকরা ‘মানবিক’ এবং তারা শ্রমিকদের কমেরও কম মজুরি দেন না। কিন্তু মালিক পক্ষ যেসব হিসাবকে শ্রমিকের মজুরির সঙ্গে যোগ করেছেন তা কোনোভাবেই ‘মজুরি’ নয়, এ ক্ষেত্রে মালিক পক্ষের ৪০২ টাকার হিসাব শ্রম আইনের সংজ্ঞাকে লঙ্ঘন করে। শ্রম আইনের ২(৪৫) ধারায় উল্লেখ আছে, বাসস্থান, আলো, পানি, চিকিৎসা সুবিধা, অন্য কোনো সুবিধা, অবসর-ভাতা, ভ্রমণ-ভাতা বা ভবিষ্যৎ তহবিল ইত্যাদি মালিক কর্তৃক প্রদেয় ‘মজুরির টাকায়’ অন্তর্ভুক্ত হবে না। ১০ লাখ চা বাগানের সঙ্গে মজুরি নিয়ে আজ যখন এক পাবলিক তর্ক উঠেছে, তখন মজুরি বিষয়ে কোনো বক্তব্যের ক্ষেত্রে চা বাগানের মালিকপক্ষকে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় আইন ও নীতিকে মান্য করতে হবে।
চা-শিল্পের ঝুঁকি বাড়বে যদি শ্রমিক অসুস্থ ও অনাহারী থাকেন। নিরানন্দ আর হতাশা ঘিরে থাকে চারপাশ। বহুজাতিক বাজার, মুনাফার রাজনীতি আর দখলিপনার সংস্কৃতিকে প্রশ্ন না করে বারবার কেন চা শ্রমিকের ঘাড়ে উদোর পি-ি চাপানোর চেষ্টা চলে? স্মরণে রাখা জরুরি, করোনা মহামারীতে দেশ-দুনিয়া লকডাউন হলেও চা বাগান নির্ঘুম ছিল। বাংলাদেশ চা সংসদের হিসাবে ২০২১ সালে দেশে রেকর্ড ৯ কোটি ৬৫ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয় এবং ২০১৯ সালে হয় ৯ কোটি ৬০ লাখ কেজি। জীবন দিয়ে চা-শিল্পকে চাঙা রাখা চা শ্রমিকের কোনো স্বীকৃতি ও মর্যাদা এখনো নিশ্চিত করেনি রাষ্ট্র। চলমান ৩০০ টাকা মজুরি আন্দোলন সফল হোক। আশা করি প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিশ্চিত করবেন।
লেখক গবেষক ও লেখক
