ডমিঙ্গো ভাবনা পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২২, ১১:০৫ পিএম

টেস্ট ক্রিকেটে দেশের প্রথম হ্যাটট্রিকম্যান অলক কাপালি। এশিয়া কাপে কোনো টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিটিও তার। আরেকটি এশিয়া শ্রেষ্ঠত্বের আগে অলক জানালেন দল নিয়ে তার ভাবনা। দেশ রূপান্তরের শিহাব উদ্দিনের সঙ্গে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনের সাম্প্রতিক নানা ঘটনা নিয়েও কথা বলেছেন অলক কাপালি

এশিয়া কাপে এবার বাংলাদেশের সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?

অলক: আমার চোখে এবারের দলটা এই মুহূর্তে সেরা দল। এখানে সব পারফরমারই সুযোগ পেয়েছে। যারা পারফরম করেছেÑ যেমন বিজয় (এনামুল হক) ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে অনেক রান করেছে। গত সিরিজে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও রান ছিল। আগে থেকে যারা আছে, তারা তো এমনিতেই পারফরমার। দলের ফোকাস অবশ্যই ভালো খেলা। কোচিং স্টাফ যারা আছে তারা এবং অধিনায়ক মিলে যদি সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে পারে, তাহলে অবশ্যই আমরা এই আসরে ভালো করব।

সাকিব আল হাসান আবার নেতৃত্ব ফিরে পেয়েছেন। তার অধিনায়কত্বকে কীভাবে দেখছেন?

অলক: সাকিবের দায়িত্ব পাওয়াটা দারুণ হয়েছে। তার নেতৃত্ব নেওয়াই অনেক কিছু। ওর কারণে দলের ফলাফল বদলে যায়। গত বছর বিপিএলে দেখেন বরিশালকে ফাইনালে নিয়ে গেছে। ওর ভিতরে যে জিনিসটা কাজ করে তা হলো, ওর জন্মই হয়েছে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য। এটা ওর কাছে আলাদা একটা লড়াই, ওর এ জিনিসটা ভালো লাগে। সবসময় পজিটিভ। ওর কাছ থেকে এই সময়গুলোতে শতভাগ পাওয়া যায়। তখন দলের ফলাফলেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অন্যদের কাজও সহজ হয়ে যায়। কারণ ও যে মানের ক্রিকেটার, ও না থাকলেও বিকল্প হিসেবে দুজন ক্রিকেটার নিতে হয়। সবদিক থেকেই সাকিবের কাছে নেতৃত্ব আসাটা ইতিবাচক ব্যাপার।

২০০৮ এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে আপনার অসাধারণ সেঞ্চুরি ছিল। ওই ম্যাচে ভারতকে দারুণ চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। বড় আসরে ভালো করার মানসিকতা কি সেখান থেকেই আসা?

অলক: সাহসী মানসিকতাটা এসেছে আসলে ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে। তখন আমরা প্রথম ম্যাচেই উইন্ডিজের বিপক্ষে জিতেছিলাম। ওখান থেকেই আমাদের বিশ্বাস বা মানসিকতাটা চলে আসে। এছাড়া ২০০৭ বিশ্বকাপে তো ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছিলাম। এর আগে কিন্তু আমরা কোনোমতে এগোচ্ছিলাম, যেমন ৫ উইকেট পড়ে গেলে কোনোভাবে ১৮০-১৯০ করতাম। কিন্তু ২০০৮ সালে এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটির কথা যদি বলি ওখানে আমার সেঞ্চুরি ছিল এবং আমরা ৫ উইকেট দুইশোর আগে হারানোর পরও ২৮৩ করি। এটা আগে হতো না। এই বদলে যাওয়ার মানসিকতাটা এসেছে কিন্তু ওই ২০০৭-এর জয় থেকেই। ওখান থেকে শুরু হয়ে আমরা এখন একটা ভালো দল হতে পেরেছি।

বদলের শুরুটা এত আগে হলেও বাংলাদেশকে এখনো নতুন পরিকল্পনা করতে হচ্ছে...

অলক: আমাদের ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সটা খুব ভালো ছিল না মাঝের সময়টাতে। এমন উত্থান-পতন তো থাকেই, তবে এটা ঠিক ২০১১ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত দলে পরিবর্তনটা বেশি হয়েছিল। আমাদের আসলে একটা পজিশনে একটা একাধিক ক্রিকেটার তৈরি রাখতে হবে। যেমন এক পজিশনে চারজন থাকবে। ওদের মধ্যে লড়াই হবে দলে জায়গা পাওয়ার। তা থেকেই তারা পারফরম করবে। এই দলটাকেই তো আমরা বিশ্বকাপে নিয়ে যাব। তাই আমাদের দলটাও ওভাবে তৈরি করতে হবে যে ক্রিকেটাররা যেন স্বাধীনতা নিয়ে খেলে। প্রতিটা পজিশনের জন্য ক্রিকেটার তৈরি রাখতে হবে। যেমন কিছুদিন আগে একটা ব্যাপার খুব খারাপ লাগল। উইন্ডিজে বদলি যাওয়া বিজয়কে খেলানো হলো মিডল অর্ডারে। অথচ ডিপিএলে সে সব রান করেছে ওপেনিংয়ে। তাই এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যে যেখানে খেলে স্বচ্ছন্দবোধ করে তাকে ওই জায়গাতেই খেলানো হোক। যেমন বিজয় ওপেনিংয়ে যাওয়ার পর আবার রান পেয়েছে জিম্বাবুয়েতে। দলে আসলে পরিবর্তনের চেয়েও পজিশন অনুযায়ী গ্রুপ ক্রিকেটার তৈরি রাখা উচিত। তাহলে উন্নতির ধারাবাহিকতাটা আসত।

পাওয়ার হিটিংয়ে সমস্যা দূর করার জন্য মিরপুরে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেটাররা ছক্কা মারার অভ্যাস করছিল। এটা কতটা ইতিবাচক?

অলক: আমি এই বিষয়ে একমত না যে আমরা পাওয়ার হিটিং পারি না। দলে এখন যারা আছে, তারা সবাই বড় ছক্কা মারতে পারে। বিজয়, সোহান, মোসাদ্দেক, সাব্বির, সাকিব, মাহমুদউল্লাহ সবাই পারে। ওদের রেকর্ড ঘাঁটলে দেখা যাবে একেকজনের ১০০ মিটারের ওপর ছক্কা মারার অতীত আছে। আসলে হয়েছে কী, একটা ভয় মনে ঢুকে গেছে। চারপাশ থেকে যখন বারবার ‘পারি না’ শব্দটা আসে, তখন শট নেওয়ার সময় ওই ভয়টা চলে আসে। মনে হয় যে পারব না। উইন্ডিজের কথা বলা হয়, ওদের রাসেল ও গেইল ছাড়া আর কাউকে কিন্তু দেখি না যে নিয়মিত ম্যাচে নেমেই ছক্কা মারছে। আমাদের ক্রিকেটাররা যদি ওই বিশ্বাসটা নিয়ে আসে যে আমরা পারব, তাহলে অবশ্যই আমাদের ক্রিকেটাররা বড় ছক্কা মারতে পারবে। এবার প্রস্তুতি ম্যাচে ছক্কা মারার যে অনুশীলনটা হয়েছে, সেটা খুবই ইতিবাচক ও ক্রিকেটারদের মনে সাহসটা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে নিশ্চিত।

নতুন কোচ হিসেবে শ্রীরামের যুক্ত হওয়াকে কেমন দেখছেন?

অলক: বিসিবির এই সিদ্ধান্তটা যথার্থ হয়েছে। শ্রীরামের সঙ্গে আমি গাজী গ্রুপের হয়ে খেলেছিলাম। ওনার যে চিন্তা ও ম্যাচ পড়ার যে ক্ষমতা, সেটা অসাধারণ। আমার এখনো মনে আছে ২০০৮ মৌসুমে একটা ম্যাচে অনেক বড় লক্ষ্য তাড়া করে জিতলাম। একটা সময় আমরা ভাবছিলাম যে এটা কীভাবে তাড়া করব। কিন্তু শ্রীরাম সেই সাহসটা দেখিয়েছিলেন যে এটাও পারা যাবে। আর ওনার স্পিন খেলার দারুণ অভিজ্ঞতা। আমরা বলি যে পেস খেলতে পারি না। কিন্তু বেশিরভাগ ম্যাচে স্পিনের অংশে আমরা বড় রান নিতে পারছি না। শ্রীরামের কাছে আমরা স্পিন খেলার দিকটাতেও অনেক এগিয়ে যাব। উনি আইপিএল ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যে কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন সেটা আমাদের জন্য দারুণ কাজে দেবে।

এখনো হেড কোচ হিসেবে থাকা রাসেল ডমিঙ্গোর পদত্যাগ নিয়ে বেশ গুঞ্জন হচ্ছে। দুবাইতে থাকা দলের ওপর এতে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা?

অলক: উনি তো অনেক বছর ধরে ছিলেন। উনার এই পদত্যাগের বিষয়ে ধোঁয়াশা চুক্তির সময় শেষ হওয়ার আগে উঠে আসা উচিত না। আর এ জিনিসটা আসলে ক্রিকেটাররা যদি মাথায় নেয় তাহলে খারাপ হবে। এখন তো কোচিং স্টাফ ও অধিনায়ক মিলে টুর্নামেন্টের পরিকল্পনা করবে এবং সেইটা মাথায় রাখবে। এটা নিয়ে চিন্তা করার জন্য বিসিবি আছে। ডমিঙ্গোকে নিয়ে ক্রিকেটারদের ভাবার সময় এটা নয়। ভারত যেমন ওদের সেরা ক্রিকেটার রানে নেই কিন্তু এ নিয়ে ভারত একদমই চিন্তিত না। ওরা বরং আরও ভালো খেলে কোহলির বিষয়টা একদম ভুলিয়ে দিয়েছে। তেমনি আমাদেরও ডমিঙ্গো-ভাবনা পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে, ভাবতে হবে খেলা নিয়ে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত