চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসেবে মজুরি বেড়েছে ৫০ টাকা। গতকাল শনিবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে গণভবনে দেশের বড় ১৩টি চা বাগান মালিকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে দৈনিক একজন চা শ্রমিক পাবেন ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। তিনি বলেন, ‘আজ থেকে চা শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। শিগগিরই ভিডিও কনফারেন্সে তিনি চা-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলবেন।’
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের পরই আন্দোলনরত চা শ্রমিকরা কাজে যোগদানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। তবে কেউ কেউ বলছেন, ৫০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তে তারা খুশি নন। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে কাজে ফেরার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।
দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য থেকে জানা গেছে, আজ রবিবার থেকে সিলেট, মৌলভীবাজারসহ চা উৎপাদনককারী জেলাগুলোর চা শ্রমিকদের একাংশ প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে কাজে যোগদানের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন।
চা মালিকদের সঙ্গে তিন ঘণ্টা বৈঠকের পর মুখ্য সচিব সাংবাদিকদের এই সম্পর্কে আরও বলেন, দৈনিক ১৭০ টাকা সর্বনিম্ন মজুরির সঙ্গে বোনাস, বার্ষিক ছুটি ভাতা আনুপাতিক হারে বাড়বে। বেতনসহ উৎসব ছুটি আনুপাতিক হারে বাড়বে। অসুস্থতাজনিত ছুটির টাকা ও ভবিষ্যৎ তহবিলে নিয়োগকর্তার চাঁদা আনুপাতিক হারে বাড়বে। বার্ষিক উৎসব ভাতাও আনুপাতিক হারে বাড়বে।
গত ৯ আগস্ট থেকে ১২০ থেকে বাড়িয়ে দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন ১৬৬ চা-বাগানের প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক। আন্দোলনের ১৭ দিনের মাথায় গতকাল প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে মজুরি নির্ধারিত হলো। ৯ আগস্ট থেকে চার দিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করেন তারা। এরপর গত ১৩ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ শুরু করেন চা-বাগানের শ্রমিকরা।
১৯ আগস্ট রাতে মজুরি ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা করার বিষয়ে একটি চুক্তি হলেও সেটি প্রত্যাখ্যান করে শ্রমিকদের একাংশ। এরপর থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। এর মধ্যে কয়েক দফা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক হলেও তা সমাধান হয়নি। মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনে থাকা চা শ্রমিকদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিডিও বার্তার দাবি জানান শ্রমিকরা।
সিলেট থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, মাত্র ৫০ টাকা মজুরি বৃদ্ধিতে খুশি নন সিলেটের চা শ্রমিকরা। তবে চা শ্রমিক নেতারা বলছেন, তাদের দাবি ছিল দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা। পাশাপাশি তারা এটাও বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটা মেনে নেবেন তারা। তাই এখন প্রধানমন্ত্রীর কথামতো তারা কাজে ফিরে যাবেন।
কাজে ফেরার ব্যাপারে আজ রবিবার সকালে সিলেট ভ্যালির সকল বাগানের শ্রমিকরা বৈঠকে বসবেন। বৈঠকের পর তারা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন চা শ্রমিক ফেডারেশন নেতা অজিত রায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল ৩০০ টাকা। এখন বলা হচ্ছে ১৭০ টাকা দেওয়া হবে। বর্তমান বাজারে এই অল্প টাকায় শ্রমিকের কষ্ট-দুর্ভোগ দূর হবে না। তাই আলোচনা করেই আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’
তবে চা শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালা বলেন, ‘আমরা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত দেবেন আমরা সেটা মেনে নেব। তাই প্রধানমন্ত্রীর কথামতো আজ থেকেই আমরা কাজে যোগ দেব।’ শ্রমিক অসন্তোষ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কিছু লোক আছে তাদের কোনো কিছুতেই খুশি করা যাবে না।’
অসন্তোষ প্রকাশ করে সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগানের শ্রমিক মলয় গোয়ালা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের মা। কিন্তু তিনি আমাদের দুঃখটা বুঝলেন না। মাত্র ৫০ টাকা বৃদ্ধিতে আমাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না।’
মালনীছড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত নেতা সুফল বাড়ৈ বলেন, ‘১৭০ টাকায় আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা ৩০০ টাকা চেয়েছিলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অন্তত ২০০ টাকা নির্ধারণ করে দিলে আমরা খুশি হতাম। কোনোমতে জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো।’
আমাদের কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাগান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে কী সিদ্ধান্ত নেন, তার অপেক্ষায় ছিলেন চা শ্রমিকেরা। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত জানার পর তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে কাজে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন সাধারণ চা শ্রমিকরা। এ সিদ্ধান্তে রাজি হয়েছেন চা শ্রমিক নেতারা।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের মনু-দলই ভ্যালির সভাপতি ধনা বাউরি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্দোলনের শুরু থেকেই শ্রমিকরা বারবার প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার জন্য অপেক্ষায় ছিল। দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত সবাই মেনে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাধারণ চা শ্রমিকেরা রবিবার থেকে কাজে যোগ দেবে।’
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নির্বাহী উপদেষ্টা রামভজন কৈরী বলেন, ‘আমরা সবাই প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলাম। প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই সবকিছু বিবেচনা করে ১৭০ টাকা মজুরি নির্ধারণ করেছেন। সাধারণ চা শ্রমিকরা সেটা মেনে নিয়েছে। রবিবার থেকে সবাই কাজে যোগ দেবে।’
সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, ‘আমাদের চা শ্রমিকদের দাবি ছিল প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার। প্রধানমন্ত্রী মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ১৭০ টাকা নির্ধারণ করেছেন। এ ছাড়া রেশন, চিকিৎসা, ঘরসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর জন্য বলেছেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা জানাই।’
