দীর্ঘ ৯ বছরের আইনি লড়াইয়ের কাছেই মাথা নোয়াল নয়ডার আকাশচুম্বী জোড়া বহুতল অ্যাপেক্স ও সেয়ানে। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর কাল ছিল এটির গুঁড়িয়ে ফেলার এক ঐতিহাসিক শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্ত। ১০০ মিটারের ৩২ তলার জোড়া ভবনটি মাত্র ৯ সেকেন্ডেই ধুলোয় মিশে গেল । এটি গুঁড়িয়ে দিতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় চার হাজার কেজি বিস্ফোরক। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটানো ও নির্মাণ বিধি লঙ্ঘনের দায়ে ভবন দুটিকে বড় বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। লিখেছেন নাসরিন শওকত
‘সুপারটেক’ টুইন টাওয়ার
ভারতের রাজ্য উত্তর প্রদেশে নয়ডার অবস্থান। সুউচ্চ পরিকল্পিত ভবনবেষ্টিত ও জনবহুল এই শহরটি রাজধানী নয়াদিল্লি থেকেও খুব বেশি দূরে নয়। নয়ডা-গ্রেটার নয়ডা এক্সপ্রেসওয়ের কাছেই ৯৩ নম্বর সেক্টরের ‘এ‘তে আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল ‘সুপারটেক’ টুইন টাওয়ার নামের জোড়া বহুতল ভবন ‘অ্যাপেক্স’ ও ‘সেয়ানে’। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সুপারটেক লিমিটেড তার এমারেল্ড প্রকল্পের আওতায় এ দুটি ভবনকে ৪০ তলা নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু আদালতের নির্দেশে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। ১০৩ মিটার উচ্চতার অ্যাপেক্স ভবনটিতে ৩২টি তলা নির্মাণ করা হয়েছিল। ৯৭ মিটার উচ্চতার ভবন সেয়ানে ছিল ২৯টি তলা। মোট সাড়ে সাত লাখ বর্গফুট এলাকাজুড়ে থাকা ভবন দুটিতে প্রায় ৯০০টি ফ্ল্যাট ছিল। এই জোড়া ভবনসংলগ্ন ‘এটিএস গ্রিন ভিলেজ’ ও ‘এমারেল্ড কোর্ট’ নামের দুটি আবাসিক এলাকা রয়েছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে, এমারেল্ড কোর্টে ১৫টি উঁচু ভবন ও এটিএস ভিলেজে ২৫টি উঁচু ভবন ও চারটি ভিলা রয়েছে। সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবারের বাস।
প্রাথমিক প্রস্তুতি
ঐতিহাসিক কুতুব মিনার থেকেও উঁচু এই ভবন দুটি একাধিক নির্মাণবিধি লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়েছিল। ৯ বছরের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে এই বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ায় ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আদেশে তা গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। ২০২১ সালের আগস্টে ভবন দুটি গুঁড়িয়ে দিতে তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল আদালত। কিন্তু কারিগরি জটিলতার কারণে এ প্রক্রিয়া শুরু করতে এক বছর লেগে যায়। পরে এ বছরের মার্চে অ্যাপেক্স ও সেয়ানে ভেঙে ফেলার চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সে সময় মুম্বাইভিত্তিক কোম্পানি এডিফিস ইঞ্জিনিয়ারিংকে ভবন দুটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে এর আগেই ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করা হয় এর কারিগরি প্রস্তুতি। সাড়ে তিনশ শ্রমিক-কর্মচারী ও ‘নির্মাণ ও ধ্বংস প্রক্রিয়া’র ১০ প্রকৌশলী ভবন দুটি ভাঙার এ প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। বিস্ফোরণে গুঁড়িয়ে দেওয়ার আগেই কিছু ভবন ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে ভেঙে ফেলা হয়। ভবন দুটি গুঁড়িয়ে দিতে মোট ৩ হাজার ৭শ’ কেজি বিস্ফোরক ব্যবহারের জন্য মজুদ করা হয়। কিন্তু কাল বিস্ফোরণ ঘটানোর সময় চার হাজার কেজি বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছিল। এই বিশাল পরিমাণের বিস্ফোরক থেকে দুটি ভবনের স্তম্ভে প্রায় ১০ হাজার ছিদ্রের ভেতর বিস্ফোরক ঢোকানো হয়েছে। সেই সঙ্গে স্থাপন করা হয়েছিল ২০ হাজার সার্কিট। ডেটোনেটর, ইমালশন ও শক টিউবের মতো বিস্ফোরক জোরালো শব্দ করে একের পর এক ফাটবে। কর্মকর্তারা বলেছেন, এমন একটি প্রক্রিয়ায় বহুতল ভবন দুটি কার্ডের ঘরের মতো ধসে পড়বে, যেখানে ১৫ সেকেন্ডেরও কম সময় লাগবে। এদিকে এডিফিস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অংশীদার উৎকর্ষ মেহতা সংবাদমাধ্যম পিটিআইকে বলেছেন, ‘একসঙ্গে সমস্ত বিস্ফোরক একটি বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে থাকবে৯ থেকে ১০ সেকেন্ড সময় লাগবে। বিস্ফোরণের পর কাঠামোগুলো সরাসরি নিচে পড়বে না। সেগুলোর পুরোপুরি নিচে নেমে আসতে আরও চার থেকে পাঁচ সেকেন্ড সময় লাগবে।’ ঐতিহাসিক এই ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া অভিযানে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিও ছিল শ্বাসরুদ্ধকর। স্থানীয় আবাসিক উন্নয়ন সংস্থা রেসিডেন্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (জডঅ) ‘এটিএস গ্রিন ভিলেজ’ ও ‘এমারেল্ড কোর্ট’-এর বাসিন্দাদের সকাল ৭টার মধ্যেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সহায়তা করে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে আবার বিকেল ৪টায় নিজ বাড়িতে ফিরতে পারবেন তারা। এই বাসিন্দাদের আড়াই হাজারেরও বেশি গাড়িও অন্যত্র সরানো হয়েছে। সেই সঙ্গে সরানো হয়েছে তাদের দেড় লাখেরও বেশি পোষ্য। একই সময় স্থানীয় কয়েক হাজার বাসিন্দাকেও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
যেভাবে মুহূর্তে মিলিয়ে গেল দুটি ভবন
পূর্বপরিকল্পনা ও প্রস্তুতি অনুযায়ী, ২৮ আগস্ট দুপুর ১২টার আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে বলা হয়। ঠিক ১টার পর বাড়ি ছেড়ে সবাইকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্ধারণ করে দেওয়া ‘বর্জিত এলাকা’য় এসে অপেক্ষা করতে হবে। বেলা ৩টা পর্যন্ত ৫০০ মিটার এলাকা পুরোপুরি খালি রাখা হবে। ওই এলাকা দিয়ে সকাল ৭টা থেকেই বন্ধ হয়ে যায় উড়োজাহাজ চলাচল। আর রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে দুপুর ১২টার পর। এভাবে একটানা দুই ঘণ্টা অপেক্ষার প্রহর গুনে দুপুর ২টা ২৮ মিনিটে বেজে ওঠে সাইরেন। ৩০ সেকেন্ড সাইরেন বাজার পরের ৩০ সেকেন্ড বিরতি। ঠিক ২টা ২৯ মিনিটে আবার বেজে ওঠে দ্বিতীয় সাইরেন। এই ৩০ সেকেন্ডের দ্বিতীয় সাইরেন থামার পর আবার ৩০ সেকেন্ড বিরতি।
তৃতীয় বা চূড়ান্ত সাইরেন বেজে ওঠে থামার সঙ্গে সঙ্গেই চোখের পলকে ভেঙে পড়ে দিল্লির অদূরে অবস্থিত অবৈধ জোড়া ভবন। ইলেকট্রনিক ডিভাইসের বোতামে একটি মাত্র টিপ দিয়েই ২টা ৩০ মিনিটে তাসের ঘরের মতো ভেঙে ফেলা হয় বহুতল ভবন অ্যাপেক্স ও সেয়ানেকে। আর এই ঐতিহাসিক দায়িত্বটি পালন করেন চেতন দত্ত। মাত্র ৯ সেকেন্ডেই কংক্রিটের ধুলো মাটিতে মিশে এক দীর্ঘ বিতর্কের সমাপ্তি ঘটায়। ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার পুরো এই প্রক্রিয়া টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচারে প্রত্যক্ষ করে ভারত।
অবৈধ নির্মাণের অভিযোগে গত বছরের আগস্টে বহুতল ভবন দুটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। সেই থেকে ৪৯ বছর বয়সী হরিয়ানার চেতন দত্ত এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন অধীর আগ্রহে। অবশেষে গতকাল দুপুর আড়াইটার সময় সেই স্বপ্নপূরণ হয় চেতনের। হরিয়ানার হিসরের বাসিন্দা চেতনকে এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছিল মুম্বাইয়ের এডিফিস ইঞ্জিনিয়ারিং। ১০ দিন ধরে বহুতল ভবন দুটির মধ্যে খুব সাবধানে বিস্ফোরক পদার্থ সরবরাহ করেছেন চেতন ও তার দল।
চেতন নিজেও বহুতল ভবন ভাঙার একটি সংস্থায় কাজ করেন। একটা মাত্র বোতাম টিপে আকাশচুম্বী অ্যাপেক্স ও সেয়ানে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার রোমাঞ্চ প্রসঙ্গে চেতন বলেন, ‘নয়ডার এই কাজটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো। আমার স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট যখন টুইন টাওয়ার ভাঙার নির্দেশ দেয়, কেউ একজন আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ পাঠায়। তখন থেকেই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি, এই বহুতল ভাঙার সুযোগটা যেন আমাকেই দেওয়া হয়। যদিও আমাকেই যে এই কাজটার জন্য বেছে নেওয়া হবে তা ভাবিনি। এর কয়েক মাস পরে জুলাইতে এডিফিস আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে।’
অবৈধ জোড়া ভবন দুটি ভেঙে ফেলার সময় সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে নয়ডা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। তারা জানিয়েছে, ভবন দুটির আশপাশের এলাকাকে ‘বর্জিত এলাকা’ (এক্সক্লুশন জোন) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সতর্ক করা হয়েছে, এসব এলাকার মধ্যে কোনো ব্যক্তি, যানবাহন ও পশু প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। উড়তে দেওয়া হবে না ড্রোনও । নয়ডা-গ্রেটার নয়ডা এক্সপ্রেসওয়ের একটা অংশ এই বর্জিত এলাকার মধ্যে থাকায় সোয়া ২টা থেকে পৌনে ৩টা পর্যন্ত ওই রাস্তায় যান চলাচলও বন্ধ রাখা হয়েছিল।’
ঐতিহাসিক ধ্বংস প্রযুক্তির ব্যবহার
ভারতের ইতিহাসের নজিরবিহীন ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া এই অভিযানে ইতিহাস সৃষ্টি করে নেওয়া হয় ধ্বংসের প্রযুক্তি। ভারতে এই প্রথমবার এত উঁচু বহুতল ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযানে যৌথভাবে কাজ করেছে মুম্বাইয়ের এডিফিস ইঞ্জিনিয়ারিং ও তাদের দক্ষিণ আফ্রিকার অংশীদার সংস্থা জেট ডেমোলিশন। এই দুটি কোম্পানি এর আগেও যৌথভাবে তিনটি প্রকল্পে কাজ করেছে। এর মধ্যে তেলেঙ্গানার সচিবালয় ও কেন্দ্রীয় কারাগার এবং গুজরাটের পুরনো মোতেরা স্টেডিয়ামে অবৈধ আবাসিক ভবন ভাঙার কাজও রয়েছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে স্থানীয় নয়ডা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এর আগে নয়ডা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, বিস্ফোরণের পর আকাশছোঁয়া এই জোড়া ভবন দুটির ধূলিকণা হয়ে মাটিতে মিশে যেতে মাত্র ১০ সেকেন্ডের মতো সময় লাগবে। এমনকি ৫০০ মিটার দূরের আবাসন, ৯০০ মিটার দূরের গ্যাস পাইপলাইনের বিন্দুমাত্রও ক্ষতি বা সামান্য চিড়ও ধরবে না। আরও বিস্ময়ের কথা হলো, ভবন দুটির কোনো অংশ দূরে গিয়ে পড়ারও সম্ভাবনা নেই বলে জানান তারা। তাদের দাবি, এমন এক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে যাতে বিস্ফোরণের পর স্তম্ভগুলো সোজাসুজি নিচে পড়ে। এটি নিশ্চিত করতে ‘ওয়াটারফল টেকনিক’ নামে একটি কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। এই কৌশলের কারণে ভবন দুটি যতটুকু এলাকাজুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঠিক ততটুকুর মধ্যেই ধ্বংসস্তূপ সীমাবদ্ধ থাকবে।
আইনি লড়াই
নয়ডার বেআইনিভাবে নির্মিত বহুতল জোড়া ভবন অ্যাপেক্স ও সেয়ানে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তের পেছনেও আছে দীর্ঘ এক আইনি লড়াইয়ের গল্প। ২০১৪ সাল থেকে চলছিল মামলা। ভারতের সবচেয়ে উঁচু এই ভবন দুটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হলো সুপারটেক লিমিটেড। ২০০৫ সালের কথা। সে সময় নিউ ওখলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা নোইদা (ঘঙওউঅ) সুপারটেককে ১৪টি উঁচু ভবন (টাওয়ার) নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছিল। যার প্রতিটিতে ৯টি তলা, একটি বিপণিবিতান ও একটি বাগানের নকশা করা ছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে এসে সুপারটেক প্রকল্পটির ওই নকশায় সংশোধন আনে। নতুন নকশায় আকাশছোঁয়া ভবন অ্যাপেক্স ও সেয়ানেকে অন্তর্ভুক্ত করে তারা। যদিও নোইদা কর্তৃপক্ষ নতুন পরিকল্পনারও অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু বিপত্তি বাধে ২০১২ সালে। এবার এমারেল্ড কোর্টের মালিকপক্ষ রেসিডেন্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (আরডব্লিউএ) এলাহাবাদ হাইকোর্টে গিয়ে আকাশচুম্বী এই ভবন দুটি অবৈধ বলে অভিযোগ করে। সুপারটেক কোম্পানির বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে ওই ভবন নির্মাণের অভিযোগ তোলে তারা। এর দুই বছর পর ২০১৪ সাল। এলাহাবাদ হাইকোর্ট এক রায়ে ভবনটিকে অবৈধ বলে তা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল। সে সময় ওই রায়কে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ জানায় নোইদা কর্তৃপক্ষ ও সুপারটেক। এর সাত বছরের মাথায় ২০২১ সালে ৩১ আগস্ট সর্বোচ্চ আদালতও এলাহাবাদের রায়কে বহাল রাখে এবং জোড়া ভবনটিকে পুনরায় ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়।
আগস্টে সর্বোচ্চ আদালত ভবন দুটি ভেঙে ফেলার আদেশ দেওয়ার সময় বলেছিল, ‘নয়ডার কর্মকর্তা ও কোম্পানি নিজেদের মধ্যে যোগসাজশ করে এই কাজ করেছে।’ সে সময় এই যোগসাজশে জড়িত থাকায় ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভবন নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের দায়ে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। সর্বোচ্চ আদালত তখন তিন মাসের মধ্যে ভবন দুটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। কিন্তু তা কয়েক দফায় বিলম্ব হয়। সবশেষ এ বছরের মার্চে ভবন দুটি ভেঙে ফেলতে ২৮ আগস্ট চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করে নির্দেশ জারি করে সর্বোচ্চ আদালত।
জোড়া এই ভবন নিয়ে এলাকাবাসীর অভিযোগ ছিলভবন দুটির নির্মাণ কৌশলের কারণে তারা দিনের পর দিন আলো-বাতাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে ভবনের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সুপারটেক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, টাওয়ার দুটির পরিকল্পনা নয়ডা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করার পরই তারা কাজ শুরু করেন। তবে নয়ডা কর্তৃপক্ষ আদালতে জানায়, তারা আইআইটি-রুরকির পরামর্শ নিয়ে প্রকল্পটিকে ছাড়পত্র দিয়েছিল। এদিকে আদালত জানায়, ভুল যেই করুক, নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ না করা হলে তা ভেঙে ফেলতেই হবে। কারণ এতে এলাকার অন্য বাসিন্দাদের সমস্যা হচ্ছে।
পরবর্তী চ্যালেঞ্জ
ভবন দুটি বিস্ফোরণে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর ৮০ হাজার টন ধ্বংসাবশেষ তৈরির কথা জানায় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এর আগে এ অভিযান থেকে কী পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ তৈরি হবে সে বিষয়ে সংবাদমাধ্যম আইএএনএস জানিয়েছিল, অ্যাপেক্স ও সেয়ানে ভেঙে পড়ার পরে ভবন দুটি থেকে আনুমানিক প্রায় ৬০ হাজার টন ধ্বংসাবশেষ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে বেসমেন্ট ভরাট করতে প্রায় ৩০ হাজার টন ধ্বংসাবশেষ ব্যবহার করা হবে ও বাকি প্রায় ৩০ হাজার টন ধ্বংসাবশেষ নিষ্পত্তি করা হবে। এ ছাড়াও ৪ হাজার টন রাবার ও ইস্পাত বের হবে। যা পরে আলাদা করা হবে। ধারণা করা হয়েছিল, বিস্ফোরণের কারণে ৩০ মিটার জায়গাজুড়ে কয়েক সেকেন্ড কম্পনও অনুভূত হবে। এ কম্পনের সম্ভাব্য মাত্রা হবে সেকেন্ডে প্রায় ৩০ মিলিমিটার, যা রিখটার স্কেলে শূন্য দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের সমান। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, নয়ডার অবকাঠামোগুলো ৬ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় মাত্রায় নির্মাণ করা হয়েছে।
নয়ডা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, বিস্ফোরণের সময় বিকট শব্দ হলেও তা থেকে বায়ুদূষণের তেমন আশঙ্কা নেই। তবে ধ্বংসস্তূপের ধুলো ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। তারা জানান, অভিযান পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে ধ্বংসস্তূপ সরানো। এগুলো পরিষ্কার করতে তিন মাস সময় লাগতে পারে। নয়ডা কর্তৃপক্ষের সেক্টর ৮০-এর নির্ধারিত এলাকায় একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট রয়েছে। সেখানেই এই ধ্বংসস্তূপ সংরক্ষণ করা হবে। তবে বিস্ফোরণের পর আশপাশের আবাসিক ভবনগুলোতে যাতে ধুলো পৌঁছাতে না পারে সে জন্য অ্যাপেক্স ও সেয়ানের মাঝখানে একটি লোহার পাতও বসানো হয়েছে।
২০২১ সালের আগস্টের রায়ে সুপ্রিম কোর্ট সুপারটেক কর্তৃপক্ষকে অ্যাপেক্স ও সেয়ানের ফ্ল্যাটের মালিকদের পক্ষে একটি নির্দেশ দিয়েছিল। ওতে ওই মালিকদের বুকিংয়ের সময় থেকে ১২ শতাংশ সুদের সঙ্গে ফ্ল্যাট কেনার পুরো পরিমাণ অর্থ ফেরত দিতে বলা হয়েছিল। এদিকে ১০০ কোটি রুপির বীমার আওতায় অ্যাপেক্স ও সেয়ানে ভবন দুটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজ চালানো হয়। আশপাশের কোনো ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলে এ বীমার টাকায় তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
