রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে আওয়ামী লীগ নেতা আবু বকর সিদ্দিক হাবুকে (৩৭) হত্যা করা হয় মাত্র ৩০০ টাকার জন্য। ফুটপাতের অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে যে টাকা উঠত, সেই টাকা থেকে প্রতিদিন আরও ৩০০ টাকা বাড়তি দাবি করেন হাবু। আর এ নিয়ে যাত্রাবাড়ী থানা যুবদলের সহসভাপতি মুশফিকুর রহমান ফাহিমের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয় হাবুর। পরে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কাজে ব্যবহৃত ফাহিমের মিটার ও টাকা-পয়সা কেড়ে নিয়ে হাবু নিজেই তার অনুসারীদের দিয়ে টাকা তুলতে গেলে পরিকল্পিতভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় তাকে। এই আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যার ঘটনায় হওয়া মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তারা জানান, শহীদ ফারুক সড়কের ফুটপাতের ৪০টি দোকানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে প্রতি দোকান থেকে দৈনিক ৪০ টাকা করে তুলত যুবদল নেতা ফাহিমের লোকজন। সেখান থেকে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা উঠত। সেই টাকা থেকে ৫০০ টাকা করে দিতে হতো স্থানীয় প্রভাবশালী শামীমকে। শামীম সম্প্রতি হাবুর মাধ্যমে ৫০০ টাকার বদলে ৮০০ টাকা করে দাবি করেন। আর এ নিয়ে হাবু ও ফাহিমের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। যার জেরে হাবুকে পরিকল্পিতভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, হাবু খুনের নেপথ্যে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, ফুটপাতের চাঁদাবাজি ও ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বের তথ্য খুঁজে পেয়েছেন তারা। যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক সড়ক এলাকায় অনেকের নামেই বিভিন্ন মিটার আছে, যেসব মিটারের সহায়তায় দেওয়া হয় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ। একেকটি মিটারের সহায়তায় ৩০০-৪০০ ঘরে সংযোগ দেওয়া হয়। দোকানপ্রতি সংযোগের জন্য দৈনিক ৪০ টাকা করে তুলে থাকেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। সেই হিসাবে ফাহিমের ৪০ ঘর থেকে প্রতিদিন যে টাকা উঠত, সেখান থেকে শামীমকে ভাগ দিতে হতো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ফাহিম যাত্রাবাড়ী থানা যুবদলের নেতা। তার ভাই শাহীন যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলামের সোর্স (তথ্যদাতা) হিসেবে কাজ করেন। আর সেই সুবাদে ফাহিম যুবদলের নেতা হয়েও ফুটপাতের দোকান থেকে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের টাকা তুলতেন। হাবু খুনের ঘটনায় হওয়া মামলার প্রধান আসামি হলেও ফাহিমকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ।
স্বজনরা জানান, ফাহিমের ভাইরার নামে একটি মিটার ছিল। সেই মিটার থেকে ৩০০ ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কথা থাকলেও তার ভাগে পড়ে মাত্র ৪০ ঘরের টাকা। সেই টাকা থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত শামীমকেও দৈনিক ৫০০ টাকা করে দিতে হতো। হাবু হত্যাকাণ্ডের আগে শামীম ৫০০ টাকার বদলে দৈনিক ৮০০ টাকা দাবি করে আসছিল। হাবুকে দিয়েই বাড়তি এ টাকা আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন শামীম।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, হাবু হত্যায় জড়িতদের মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলো ফালান ওরফে কানা ফালান, সেলিম মোহাম্মদ, সুজন ও আল-আমিন। সুজন ছাড়া বাকি তিনজন এরই মধ্যে হাবু হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। গ্রেপ্তার এ চারজনই এখন কারাবন্দি। হাবু হত্যায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মামুন মাতবর জানান, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের টাকা নিয়ে ফাহিম ও শামীম গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল দীর্ঘদিন ধরে। এরই জেরে খুন হন হাবু। এ পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে ১২-১৪ জন উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া ফালান, সেলিম ও আল-আমিন হত্যাকাণ্ডের সময় কারা উপস্থিত ছিল, কারা আঘাত করেছিল তার সবই জানিয়েছে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে। এখন হত্যায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’
আবু বকর সিদ্দিক হাবু ছিলেন যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের ১৪ নম্বর ইউনিট সভাপতি। শহীদ ফারুক সড়কে তার কাঁচামালের দোকান আছে, পরিবহন ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তাকে হত্যার ঘটনায় থানা পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ডেমরা জোনাল টিমের কর্মকর্তারাও ছায়াতদন্ত করছেন।
ডিবির একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, হাবু হত্যার পরিকল্পনায় অনেকেই ছিলেন। যাদের অনেকের নাম মামলার এজাহারে নেই। তবে যুবদল নেতা ফাহিম পরিকল্পনার শুরু থেকে হত্যাকাণ্ডের সময় পর্যন্ত ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। তার লোকজনই হাবুকে ছুরিকাঘাত করে। ফাহিমকে ধরতে পারলে এ হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য জানা যাবে। হত্যাকাণ্ডের সময় ১০-১২ জন উপস্থিত থাকলেও হাবুকে যে হত্যা করা হবে তা জানত তিন-চারজন। বাকিরা মারধর করার জন্য গিয়েছিল, খুনের উদ্দেশ্যে নয়। তবে পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি হাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যেই ছুরিকাঘাত করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাবু হত্যার সঙ্গে তার এক আত্মীয়ের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে, যিনি হাবুকে ফোন করে ঘটনাস্থলে ডেকে নিয়ে যান। তারপর দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যা করে। এছাড়া এ হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শহীদ ফারুক সড়কের ফুটপাত থেকে চাঁদাবাজি, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা ও দলীয় কোন্দলের জের ধরেই হাবু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের অধিকাংশই একসময় বিএনপির রাজনীতি করত। যারা বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন নেতার ছত্রছায়ায় আছে। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হচ্ছে। নিহত হাবু আওয়ামী লীগের নব্য নেতা। তিনিও চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। পট-পরিবর্তনের পর দলবদল করেন।’
গত ১৬ আগস্ট শহীদ ফারুক সড়কে আওয়ামী লীগ নেতা আবু বকর সিদ্দিক হাবুকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় ১২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও তিন-চারজনকে আসামি করে মামলা করা হয়।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে তিনজনই আদালতে হত্যার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। এখন নেপথ্যে থেকে কারা এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থল থেকে শুরু করে ঘটনার পেছনে যারাই থাকুক, জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’
