দুই বছর আগে দেশে মাত্র ৬ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স ছিল। সে সময় নতুন লাইসেন্স বা পুরনো লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়াধীন ছিল ৫৯ শতাংশ হাসপাতালের। বাকি ৩৫ শতাংশ হাসপাতালের কোনো লাইসেন্স ছিল না। ২০১৯-২০ সালে করা এক জরিপে এমন তথ্য পেয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। ইউএসএআইডির সহায়তায় দেশের ১২ সিটি করপোরেশন, ১০টি জেলার ২৯ উপজেলায় এই জরিপ চালানো হয়।
গতকাল মঙ্গলবার আইসিডিডিআর,বি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটির ম্যাটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ ডিভিশনের (এমসিএইচডি) সিনিয়র ডিরেক্টর ডা. শামস এল আরেফিন এই জরিপের তথ্য উপস্থাপন করেন। দুই বছর আগের এই পরিস্থিতির এখন পরিবর্তন হতে পারে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ডা. শামস এল আরেফিন জানান, গবেষণার জন্য ১ হাজার ১৮৯টি বেসরকারি হাসপাতালের কাছে তথ্য চাওয়া হলে ৪০টি হাসপাতাল সহযোগিতা করেনি। ১ হাজার ১১৭টি প্রতিষ্ঠানকে মূল্যায়ন করা হয়।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ১১৭টি বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে ৯৫৬টি বা ৮৬ শতাংশ হাসপাতাল কোনো না কোনো সময় লাইসেন্স নিয়েছিল। বাকি ১৬১টি বা ১৪ শতাংশ হাসপাতাল কখনই লাইসেন্স নেয়নি। লাইসেন্স নিয়েছিল এমন ৯৫৬টি হাসপাতালের মধ্যে ৮৮৬টি বা ৭৯ শতাংশ হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তারা সেই মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স দিয়েই হাসপাতাল চালাচ্ছিল। মাত্র ৬৬টি বা ৬ শতাংশ হাসপাতালের বৈধ লাইসেন্স ছিল। বাকি ৪টি বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হাসপাতাল এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানায়নি।
দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার জন্য বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮০ সাল থেকে দেশে বেসরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের অগ্রগতি শুরু হয়। অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি হয় ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত। বর্তমানে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্ভর করে বেসরকারি হাসপাতালের ওপর। বেসরকারি হাসপাতালের ওপর মানুষের এই নির্ভরশীলতার কারণ হলো সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ নানা সংকট।
অনুষ্ঠানে অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধে নানা সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযানের কথা তুলে ধরে ডা.শামস এল আরেফিন বলেন, দেশে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।
জরিপে বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স পেতে জটিলতার বিষয়টিও তুলে ধরে আইসিডিডিআর,বি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশ অনুসারে লাইসেন্সিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা তা লঙ্ঘনের শাস্তির নির্দেশনা নেই। প্রতিষ্ঠানের মালিকরাও লাইসেন্স নবায়ন বিলম্বের বিভিন্ন কারণের কথা জানান। এর মধ্যে রয়েছে লাইসেন্সিং বৈধতার সংক্ষিপ্ত সময়সীমা, কর্র্তৃপক্ষের নিকট একাধিক ছাড়পত্র জমা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা, ছোট প্রতিষ্ঠানের আবেদনপত্র তৈরির প্রক্রিয়ার সীমিত ব্যবস্থাপনা ক্ষমতা, আবেদনপত্র অনুমোদনের দীর্ঘ সময়সীমা, আবেদনপত্রে যথাযথ ফিডব্যাকের অভাব এবং ছোট ক্লিনিকের ক্ষেত্রে চড়া লাইসেন্সিং ফি।
গবেষণায় আরও বলা হয়, ১৯৮২-এর অধ্যাদেশে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের জন্য সাতটি বাধ্যতামূলক শর্তের উল্লেখ রয়েছে। ২০১৯-২০ সালে করা এই গবেষণা থেকে জানা যায়, মূল্যায়নকৃত প্রতিষ্ঠানের ৯০ শতাংশ ৭টির মধ্যে মাত্র ৩টি শর্ত পূরণ করতে পেরেছে। এই ৩টি শর্ত হলো প্রতিটি রোগীর জন্য যথোপযুক্ত জায়গা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অপারেটিং থিয়েটার এবং অন্তত একজন বিশেষজ্ঞের উপস্থিতি। বাকি শর্তগুলোর মধ্যে পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি হাসপাতালগুলো।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, লাইসেন্স পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে পারেনি হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ৮৬ শতাংশ হাসপাতালই ট্যাক্স সার্টিফিকেট ও ৫৮ শতাংশ হাসপাতাল ভ্যাট সার্টিফিকেট জমা দিতে দেরি করেছে। এ ছাড়া ৩২ শতাংশ হাসপাতাল পরিবেশগত ছাড়পত্র ও ২৫ শতাংশ হাসপাতাল নারকোটিক্স লাইসেন্স জমা দেওয়া কঠিন বলে জানিয়েছে। বিশেষ করে ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য উভয় লাইসেন্সের প্রাপ্তিই অনেক জটিল বলে উঠে এসেছে গবেষণায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী লাইসেন্সিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা তা লঙ্ঘন হলে শাস্তির নির্দেশনা নেই। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মালিকরা লাইসেন্সের বৈধতার সংক্ষিপ্ত সময়সীমা, লাইসেন্স পেতে একাধিক ছাড়পত্র চাওয়া, আবেদনপত্র অনুমোদনের দীর্ঘ সময়, ছোট ক্লিনিকের ক্ষেত্রে চড়া ফিসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
বেসরকারি হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৯৮২ সালের আইন অনুযায়ী বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে স্বাস্থ্যসেবার ৭টি শর্ত বা নিয়ম মানতে হয়। কিন্তু এসব শর্ত পূরণ করে স্বাস্থ্যসেবা দিতে গেলে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। এ কারণে কোয়ালিটি স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে সমস্যা হয়।
অনুষ্ঠানে ইউএসএআইডির সিনিয়র অ্যাডভাইজর (রিসার্চ, মনিটরিং, ইভ্যালুয়েশন অ্যান্ড লার্নিং) ড. কান্তা জামিল, ড. ফিদা মেহরান, ড. রিয়াদ মাহমুদ, আইসিডিডিআর,বির গবেষণা প্রধান (এমসিএইচডি) ড. কামরুন নাহার, ডেটা ফর ইম্প্যাক্টের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. মিজানুর রহমান, ডেটা ফর ইম্প্যাক্টের নলেজ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশন্স স্পেশালিস্ট সুস্মিতা খান এবং আইসিডিডিআর,বির রিসার্চ ইনভেস্টিগেটর ড. শরিফ উদ্দীন লোটাস উপস্থিত ছিলেন।
