ফুটবলকে সবসময় র‌্যাংকিংয়ের নিক্তিতে মাপা অন্যায়

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:৪৪ পিএম

সাফের দুটি আসর সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ ও অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হচ্ছে। নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় দুটি আসরেই অংশ  নেবে বাংলাদেশ। দুটি দলের সঙ্গে গভীরভাবে কাজ করা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলি এই দুটি আসরে বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা নিয়ে দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র সঙ্গে কথা বলেছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে এসেছে জাতীয় দল প্রসঙ্গও মেয়েরা সাফ খেলতে নেপাল যাচ্ছে। তিন বছর আগের দল আর এই দলের মধ্যে নিশ্চয় অনেক পরিবর্তন দেখছেন?

পল স্মলি: তিন বছর আগে বাংলাদেশের মেয়েরা এশিয়ার বয়সভিত্তিক ফুটবলে প্রাধান্য বিস্তার করত। ওরা যখন সিনিয়র দলে আসে, তখন ভারত ও নেপালের মতো অভিজ্ঞ দলের সঙ্গে কোনো দিক থেকে পেরে ওঠেনি। তিন বছর পর এরা অনেক পরিণত। নিয়মিত বয়সভিত্তিক আসরে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি থাকছে আবাসিক ক্যাম্পে। গত জুনে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যেভাবে খেলেছে, সেটা এক কথায় অসাধারণ। তবে এখনই মেয়েদের কাছ থেকে বড় কিছু প্রত্যাশা করব না। আরও অন্তত দু’বছর ওদের ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের মধ্যে রাখতে হবে।

এটা ঠিক মেয়েদের ফুটবলে উন্নতিটা দিনকে দিন স্পষ্ট হচ্ছে। তবে দেশের নারী ফুটবল সীমাবদ্ধ ৫০-৬০ জন মেয়েকে নিয়ে। সেভাবে ভালো খেলোয়াড় কিন্তু উঠে আসছে না?

পল: সবপর্যায়ে নিয়মিত খেলা হওয়া জরুরি। বিশেষ করে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে। তাতে তারা বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবে, ধীরে ধীরে শীর্ষ পর্যায়ের জন্য তৈরি হবে। তখন জাতীয় দলে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের সংকট কেটে যাবে। বাফুফের মেয়েদের একাডেমিটা এশিয়ার সেরা তিনটি একাডেমির একটি ও এএফসি স্বীকৃত। তবে আরও বেশ কিছু একাডেমি প্রয়োজন। যেখানে গ্রামগঞ্জ, পাহাড়ি অঞ্চল থেকে খেলোয়াড় তুলে এনে পরিচর্যা করা যায়। ফিফার প্রতিভা উন্নয়ন স্কিম থেকেও আমরা ফান্ড পাচ্ছি। সেগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে প্রতিভা খুঁজে বের করতে হবে।

মেয়েদের লিগটা হয় দায়সারা গোছের। তাহলে মেয়েরা কেন আগ্রহী হবে? লিগটা ভালোভাবে হলে তো ওরা কিছু উপার্জন করতে পারত?

পল: পেশাদার ক্লাবগুলো যদি সব শর্ত মেনে এএফসির ক্লাব লাইসেন্সিং করত, তাহলে এই সমস্যাটা থাকত না। ক্লাব লাইসেন্সিংয়ের অন্যতম শর্ত নারী দল থাকা। অথচ সেটা ক্লাবগুলো মানছে না। ওমেন্স কমিটির প্রধান মিস কিরণ (মাহফুজা আক্তার) ধরে বেঁধে কিছু দলকে রাজি করিয়ে একটা লিগ আয়োজন করছেন। বাচ্চা মেয়েরা বিভিন্ন দলের হয়ে লিগে অংশ নেয়। সুতরাং একে শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবল বলা যাবে না। অল্প কয়েক সপ্তাহের অনুশীলন করে একটা লিগ খেলার কোনো মানে নেই। ক্লাবগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

মেয়েদের ফুটবল এগিয়ে যাওয়ার পথে আপনি কি মনে করেন সামাজিক বাধা একটা বড় কারণ?

পল: আমি মনে করি সামাজিক বাধা এখন আর নেই। বাফুফে মেয়েদের জন্য ফুটবলকে পেশা হিসেবে নেওয়ার একটা সুযোগ তৈরি করেছে। আমাদের একাডেমিতে যারা আছে, তাদের সবার সঙ্গে বাফুফের চুক্তি আছে। তারা মাসিক বেতন পায়। তাছাড়া তাদের পরিবারকেও সহায়তা দেওয়া হয়। তবে লিগটা ভালোভাবে হওয়া খুব দরকার। এখন বসুন্ধরা কিংস একমাত্র দল যারা মেয়েদের ফুটবলকে সমর্থন দিচ্ছে। বাকি ক্লাবগুলো সেভাবে এগিয়ে আসছে না।

অনূর্ধ্ব-১৭ দল সাফের টুর্নামেন্টে অংশ নেবে। আপনিও সঙ্গে থাকছেন। এই আসরে বাংলাদেশ কি পারবে প্রত্যাশা ও বাস্তবের মেলবন্ধন ঘটাতে?

পল: এরা অনেক দিন ধরে এলিট একাডেমিতে আমার অধীনে তৈরি হচ্ছে। সত্যিই খুব মুখিয়ে আছি, এই ছেলেরা সামনের টুর্নামেন্টে কেমন করে দেখার জন্য। এর মধ্যে ১০ জন আছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের যারা সম্প্রতি সাফ আসরে রানার্সআপ হয়েছে। ওই ছেলেরা তাদের জাত ঠিকই চিনিয়েছে। ২০-এর মতো অনূর্ধ্ব-১৭ দলটিও একই ফিলসফিতে খেলবে। আমি আশাবাদী।

সামনে তো জাতীয় দলও খেলবে?

পল: সামনে অনেক ব্যস্ততা। এর মধ্যে ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের সিনিয়র জাতীয় দল কম্বোডিয়া ও নেপালের বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে। সত্যি বললে জাতীয় দলের জয় পাওয়া বড্ড প্রয়োজন। বাস্তবতা হচ্ছে, সব কিছুই জাতীয় দলের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে। তাদের ফলাফল দিয়েই মানুষ বুঝে নেয়, সে দেশের ফেডারেশন কেমন কাজ করছে।

বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ১৯২তম একটা দেশের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হয়ে কাজ করা কতটা কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং?

পল: সবাই র‌্যাংকিংয়ের অবস্থান ও জাতীয় দলের পারফরম্যান্স দিয়ে একটা দেশের ফুটবল সম্পর্কে ধারণা নেয়। ফুটবলকে সবসময় র‌্যাংকিংয়ের নিক্তিতে মাপা অন্যায়। ২০২০ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ফেডারেশনে যোগ দেওয়ার পর থেকে ছেলে ও মেয়েদের ফুটবলে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, বাহরাইনের বিপক্ষে ম্যাচগুলো দেখে মানুষ আশাবাদী হয়েছিল। তারা দেখতে চেয়েছিল মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে একটা ইতিবাচক ফল। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে এতটা বাজে ফল কেউ আশা করেনি। কম্বোডিয়া ও নেপালের বিপক্ষে সামনের দুটি ম্যাচে ইতিবাচক কিছু হলে র‌্যাংকিংয়ে হয়তো উন্নতি হবে। মানুষ ভাববে ফুটবল এগুচ্ছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ভেতরে ভেতরে সবসময়ই উন্নয়নমূলক কাজগুলো হচ্ছে।

গোল করতে না পারা জাতীয় দলের বড় সমস্যা। স্থানীয় স্ট্রাইকারদের একটা অভিযোগ বিদেশিদের জন্য তারা খেলার যথেষ্ট সময় পান না। এই অভিযোগের সঙ্গে কি আপনি একমত?

পল: এখানে আসলে ক্লাবগুলো সিদ্ধান্ত নেবে, তারা কাদের দিয়ে সেরা একাদশ গড়বে। বসুন্ধরা কিংসের রবসনের (রবিনহো) মতো কয়েকজন বাদে বেশিরভাগ বিদেশির মান স্থানীয়দের মতো। আমি সেই প্রসঙ্গে না গিয়ে সামনের দিকে তাকাতে বলব। আমাদের বয়সভিত্তিক দলগুলোতে  কয়েকজন প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছে। রফিকুল, নোভারা তাদের জাত চিনিয়েছে। তাদের হয়তো অভিজ্ঞতা কম, তবে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। এ রকম যারা উঠে আসছে, তাদের বাড়তি গুরুত্ব দিতে হবে যাতে তাদের স্কোরিং দক্ষতা বাড়ে। একটা নতুন খেলোয়াড় যদি বিদেশিদের সঙ্গে খেলার সুযোগ পায় দুটি লাভ হয়। প্রথমত তারা বিদেশিদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। দ্বিতীয়ত তারা তাদের পজিশন পেতে শক্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শিখবে।

সামনে সাফের দুটি আসর। দুটি দলের সঙ্গেই আপনি গভীরভাবে কাজ করেছেন। প্রত্যাশা কী?

পল: আমি মনে করি অনূর্ধ্ব-১৭ দলের ফাইনালে খেলার ক্ষমতা আছে। সেটা করতে পারলে ফাইনালে যেকোনো কিছু হতে পারে। মহিলা সাফের সেমিফাইনালে যেতে হলে প্রথম দুটি ম্যাচ খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু গ্রুপে ভারত আছে, আশা করছি আমাদের মেয়েরা দ্বিতীয় দল হিসেবে সেমিফাইনালে যাবে। বড় কোনো অঘটন না ঘটলে সেখানে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হবে নেপাল। তিন বছর আগের তুলনায় মেয়েরা অনেক পরিণত। তাই নেপালের সঙ্গে একটা ভালো লড়াইয়ের প্রত্যাশা করছি। মালয়েশিয়ার সঙ্গে দুই ম্যাচে যেভাবে মেয়েরা খেলেছে, তাতে নেপালকে হারিয়ে ফাইনালে যাওয়াও অসম্ভব নয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত