ডব্লিউটিও সীমায় আসছে ছয় পণ্যের শুল্কহার

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:৫৬ পিএম

স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ^ বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নীতিমালার সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন পণ্যের শুল্কহার নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রাথমিকভাবে ছয়টি পণ্যের ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক ডব্লিউটিওর সীমার মধ্যে নামিয়ে আনবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ডব্লিউটিও নির্ধারিত হার অতিক্রম করায় বিভিন্ন পণ্যের শুল্কহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশ^ বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী, শিল্পপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বর্তমানে যে নগদ সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে, তা উত্তরণ পরবর্তীকালে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। 

২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণ পরবর্তীকালে চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় প্রস্তুতি, পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও মনিটরিং বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে গঠিত ‘অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণ’ বিষয়ক জাতীয় সাব-কমিটির কর্মশালায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। তবে এখন কোন কোন পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো হবে, তা এখনো জানায়নি এনবিআর। 

স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে একটি খসড়া সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছে অর্থ বিভাগ। খসড়াটি অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে গতকাল শনিবার একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়।

কর্মশালায় জানানো হয়, যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে আরোপিত কাস্টমস শুল্ক ডব্লিউটিও নির্ধিারিত শুল্কহার সীমা অতিক্রম করেছে সেগুলোর শুল্কহার ওই সীমার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। যেহেতু সর্বনিম্ন আমদানি মূল্য ব্যবস্থা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাস্টমস মূল্যায়নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, সে কারণে আলোচ্য সর্বনিম্ন আমদানি মূল্যকে পর্যায়ক্রমে ফেইজ-আউট করা হবে। পর্যায়ক্রমে আমদানি পর্যায়ে প্রযোজ্য প্যারা-ট্যারিফ এবং সম্পূরক শুল্ক হ্রাস করতে হবে।

সাবসিডিবিষয়ক স্টাডি গ্রুপের উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বর্তমানে নগদ সহায়তা প্রদান করতে কোনো অসুবিধা না হলেও উত্তরণ-পরবর্তীকালে শিল্পপণ্যের রপ্তানির ক্ষেত্রে তা প্রদান করা যাবে না। এ ছাড়াও, বর্তমানে রপ্তানি প্রণোদনা/নগদ সহায়তাপ্রাপ্ত খাতসমূহে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের যে শর্ত রয়েছে তা বাদ দিতে হবে।

স্টাডি গ্রুপ রপ্তানি প্রণোদনা প্রদান করে নাএমন একটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি চিত্রের তুলনামূলক পর্যালোচনা করে দেখেছে যে, রপ্তানিতে নগদ সহায়তা না থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে নেতিবাচক প্রভাবের মাত্রা কম হবে। তবে যেহেতু নগদ প্রণোদনা প্রত্যাহার হলে রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে, সে কারণে বিকল্প কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় তা পর্যালোচনা করে দেখছে স্টাডি গ্রুপ।

স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে রপ্তানির ক্ষেত্রে বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে প্রাপ্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে এবং আমাদের রপ্তানি পণ্যের জন্য তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই রপ্তানি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এফটিএ) অথবা প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (পিটিএ) সম্পাদন করতে হবে। এরূপ বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের ফলে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানিতে বর্তমানে প্রদত্ত নগদ প্রণোদনা ও ভর্তুকির মধ্যে যেগুলো ডব্লিউটিওর বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেগুলো ক্রমান্বয়ে হ্রাস করে তার পরিবর্তে বিকল্প উপায়ে রপ্তানিকে উৎসাহিত করার পন্থা উদ্ভাবন করা প্রয়োজন বলে মনে করে স্টাডি গ্রুপ।

অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস, এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট মো. জসিম উদ্দিন, বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান, বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়েক সেন ও পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান  আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ বক্তব্য দেন।

কর্মশালায় ‘করসংক্রান্ত বিধিবিধান এবং পদ্ধতি সংস্কার’ বিষয়ক স্টাডি গ্রুপের উপস্থাপনায় কর ব্যয়সংক্রান্ত গবেষণা সম্পাদনের মাধ্যমে কর অব্যাহতির অপ্রয়োজনীয় খাতগুলো চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। রাজস্ব প্রশাসনে অটোমেশন ও ডিজিটাইজেশনের ব্যাপ্তি বৃদ্ধির ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়। রাজস্ব আহরণ সংশ্লিষ্ট আইনসমূহের (যেমন নতুন কাস্টমস আইন ও নতুন আয়কর আইন) ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করারও সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়াও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন চুক্তি অনুসারে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজতর করা ও পণ্য খালাস দ্রুততর করার জন্য কর্মপদ্ধতি আধুনিকায়নের সুপারিশ করা হয়।

মুক্ত আলোচনায় চেম্বার বডি ও বিভিন্ন সেক্টরের প্রতিনিধিরা বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পথ মসৃণ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য রপ্তানিকারক, আমদানিকারকসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের ও গবেষকদের বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ জরুরি। বাংলাদেশের উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণ’ সাব-কমিটির গৃহীত কার্যক্রমবিষয়ক সুপারিশমালা চূড়ান্ত করার কাজে জাতীয় কর্মশালায় অংশীজনদের কাছ থেকে প্রাপ্ত মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তারা মনে করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত