বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করল তরুণ নির্মাতা যুবরাজ শামীমের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আদিম’। বিশে^র অন্যতম সম্মানজনক ও প্রাচীন চলচ্চিত্র বিষয়ক আয়োজন মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার জয় করেছে ছবিটি। তাও একটি নয়, দুটি পুরস্কার জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ^মঞ্চে গৌরবের সঙ্গে তুলে ধরেছেন নির্মাতা যুবরাজ। সবমিলিয়ে ‘মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এর ৪৪তম আসরে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ‘আদিম’-এর জয়জয়কার। এই উৎসবে ‘স্পেশাল জুরি পুরস্কার ‘সিলভার সেন্ট জর্জ অ্যাওয়ার্ড’ জিতে নিয়েছেন তরুণ নির্মাতা যুবরাজ শামীম। মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবের অফিশিয়াল ফেইসবুক পেজে গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে ছবিটি উৎসবের বিশেষ জুরি পুরস্কার ‘নেটপ্যাক’ অর্জন করে। পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে গত শুক্রবার রাতে পর্দা নামল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এই চলচ্চিত্র উৎসবের। ‘আদিম’ নির্মাতা যুবরাজ শামীমের হাতে ‘স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড’ তুলে দেন মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যুবরাজ শামীম বলেন, ‘পুরো বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। যখন আমার নাম ঘোষণা করা হয়, ইজ ইট রিয়েল বলে চিৎকার করে উঠেছিলাম। এখনো স্বাভাবিক হতে পারিনি। উৎসবের আয়োজক, বিচারক, সাংবাদিক সবাই আমাকে অভিনন্দন জানাতে থাকেন। পুরো বিষয়টি পরাবাস্তবের মতো মনে হচ্ছিল। ফিরতি ফ্লাইটের তাড়া থাকায় আয়োজকরা অনেকটা জোর করেই আমাকে গাড়িতে উঠিয়ে দেন।’ তিনি আরও বলে, ‘এমন উৎসবে আমার নির্মিত ছবিটি মূল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ার চেয়ে বড় পুরস্কার আর নেই। তবু উৎসব কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে এখানে অংশ নিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। তরুণ নির্মাতা হয়েও যে সম্মান পেয়েছি তা অমূল্য।’ নির্মাতা বলেন, দুপুরে যখন ‘নেটপ্যাক জুরি অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়, তখনই বিশ্বাস হচ্ছিল না। আর যখন ‘স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড’-এ আমার নাম ঘোষণা করা হয়, তখন সত্যিই আমি বাকরুদ্ধ! স্টেজে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, ‘এটা কি বাস্তব!’
এরআগে শুক্রবার দুপুরে যুবরাজ শামীমের ‘আদিম’ মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জিতে নেয় ‘নেটপ্যাক জুরি অ্যাওয়ার্ড’। তখন এক প্রতিক্রিয়ায় তরুণ এই নির্মাতা বলেছিলেন, ‘ফেস্টিভাল জার্নির পুরো বিষয়টাই আমার কাছে এখন পর্যন্ত কাল্পনিক মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি হয়তো কোনো ঘোরের মধ্যে আছি। আমার এই অর্জন আমার বাবা শাহজাহান ভূঁইয়ার নামে উৎসর্গ করছি।’
যুবরাজ জানান, ‘আদিম’-এর প্রিমিয়ার শো ছিল ৩০ আগস্ট। ছবিটি দেখে সাধারণ দর্শক থেকে উৎসব বিচারকরাও প্রশংসা করেছেন। প্রিমিয়ারের পর দিনই আমার দেশে চলে আসার কথা। কিন্তু উৎসব কর্তৃপক্ষ আমাকে শেষ দিন পর্যন্ত থাকতে বলেন। তখনই কিছুটা আঁচ পেয়েছিলাম যে কিছু একটা হতে যাচ্ছে! সেটারই যেন প্রতিফলন পেলাম আজ। টঙ্গীর একটি বস্তিতে হয়েছে ‘আদিম’-এর শ্যুটিং। ছবির কাহিনীও বস্তিকে কেন্দ্র করেই। ছবির চরিত্ররাও বস্তিতেই বাস করেন। গণঅর্থায়নে নির্মাতার নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রসায়ন’র ব্যানারে নির্মিত এবং সহ-প্রযোজক হিসেবে সিনেমাকার ও লোটাস ফিল্ম যুক্ত আছে বলেও জানান যুবরাজ। আদিম’র বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাদশা, দুলাল, সোহাগী, সাদেক প্রমুখ। চলচ্চিত্রটির চিত্রগ্রহণে ছিলেন আমির হামযা এবং সাউন্ড ও কালার করেছেন সুজন মাহমুদ। মস্কোতে সম্মাননা পেল ‘আদিম’, ঘোরের মধ্যে যুবরাজ।
২০১৭ সালের জুলাই থেকে সিনেমা নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু করেন পরিচালক। সিনেমার অর্থায়নের জন্য ফেইসবুকে শেয়ার বিক্রির পোস্ট দেন। কিছু অর্থ জোগাড় হওয়ার পর ২০১৮ সালে শুরু হয় শ্যুটিং। পোস্ট প্রোডাকশন শেষে চলতি বছর বিভিন্ন উৎসবে ছবিটি পাঠাতে থাকেন পরিচালক। এবারের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবেও শর্ট লিস্টে ছিল ‘আদিম’। তবে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পায়নি। গত আগস্টে সুখবর পান যুবরাজ তার ছবি নির্বাচিত হয়েছে মস্কো উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে। উৎসবে অংশ নিতে গত ২৭ আগস্ট ঢাকা ছাড়েন যুবরাজ। ৩০ আগস্ট মস্কোতে হয় ‘আদিম’-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার। মস্কো উৎসবে ‘আদিম’ ছাড়াও ‘নো প্রায়র অ্যাপয়েন্টমেন্ট’ এর জন্য উৎসবে সেরা ছবির পুরস্কার জিতে নিয়েছেন ইরানি নির্মাতা বেহরোজ শোয়েইবি। এই ছবির জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন পেগা আনগারানি।
