অজানা রহস্যের ডেরিনকুয়ু

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৫৫ পিএম

মধ্য তুরস্কের কাপাডোসিয়া অঞ্চলে রয়েছে ভূগর্ভস্থ শহর ডেরিনকুয়ু। মাটির ৮৫ মিটার গভীরে ১৮ স্তরের এই প্রাচীন শহরটিতে একসময় ২০ হাজার মানুষ লুকিয়ে থাকতে পারত। তবে কয়েক হাজার বছরের লুকানো এই শহর কারা, কী উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিল তা অজানা রহস্য হয়েই রয়ে গেছে। লিখেছেন নাসরিন শওকত

কাপাডোসিয়ায় রয়েছে ভালোবাসার উপত্যকা (লাভ ভ্যালি)। যেখান দিয়ে হেঁটে গেলে মনে হবে যেন হিংস্র দমকা বাতাস আলগা মাটির বুকে চাবুক কষছে। এই উপত্যকার গোলাপি-হলুদ আভাময় পাহাড়ের পাশগুলো সেখানকার ভূ-প্রকৃতিকে আরও রঙিন করে তুলে চারপাশ থেকে মালার মতো ঘিরে রেখেছে। এর এক পাশজুড়ে রয়েছে গাঢ় লাল গিরিখাত, যা এই উপত্যকার প্রকৃতিকে দুভাগে বিচ্ছিন্ন করেছে। দূর থেকেও সেখানে থরে থরে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের চিমনির অবয়ব দেখা যায়। কাপাডোসিয়ার শুষ্ক, গরম ও তীব্র বাতাসের বিচিত্র ও মনোমুগ্ধকর ভূ-প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে এর সৌন্দর্যকে করে তুলেছে বিধ্বংসী।

কাপাডোসিয়া

মধ্য তুরস্কের আনাতোলিয়ার উত্তরের রুক্ষ মালভূমি তাউরাস পর্বতমালায় কাপাডোসিয়ার অবস্থান। এ অঞ্চলটিই বর্তমানের তুরস্ক। আঁকাবাঁকা উপত্যকা ও প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিলা পাথর দিয়ে ঘেরা কাপাডোসিয়া পাহাড় দিয়ে বিস্তৃত। রহস্যময় পাথুরে নগর কাপাডোসিয়া প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে। প্রায় পঁচিশ লাখ বছর আগে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে এখানকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল আগ্নেয়গিরি লাভা ও ছাই দিয়ে ঢেকে যায়। পরবর্তী কয়েক লাখ বছর ধরে সেই লাভা ও ছাই জমে তৈরি হয় এক ধরনের পাথর। নরম এই আগ্নেয় পাথর দিয়েই নাটকীয়ভাবে কাপাডোসিয়ার ভূ-প্রকৃতির বিস্তৃতি ঘটেছে। এই আগ্নেয় পাথর থেকে দুর্গ, শঙ্কু, উপত্যকা ও গুহা সৃষ্টি হয়েছে। বাইজানটাই ও ইসলামিক যুগের পাথর কেটে তৈরি করা গির্জা ও ভূগর্ভস্থ গুহা শহর কাপাডোসিয়ার পুরো গ্রামাঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।

কাপাডোসিয়ার গোরমে উপত্যকা পরীর চিমনির জন্য বিখ্যাত। সেখানে প্রাচীন আগ্নেয় পাথর থেকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে বিশাল আকৃতির গোল পিলার, মাশরুম বা চিমনিগুলো তৈরি হয়েছিল, যা বিখ্যাত ‘ফেইরি চিমনি’ বা ‘পরী চিমনি’ নামে পরিচিত।

প্রচলিত আছে, অতীতে পাতাল রাজ্যের পরীরা এখানে থাকত। তাই এর নাম হয়েছে ‘ফেইরি’ চিমনি। এসব চিমনি প্রায় ১৩০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। প্রাকৃতিক এসব কাঠামো খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে বহু সুড়ঙ্গ ও গুহা। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে কাপাডোসিয়া শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার হতে দেখা যায়।

প্রায় ১৬০০ বছর আগে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর দিকে এসব পাহাড়ের কৃত্রিম গুহায় মানুষ স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। প্রাচীনকালে বিভিন্ন সাম্রাজ্য ধারাবাহিকভাবে কাপাডোসিয়াকে (আনাতোলিয়া) শাসন করেছে। ফলে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে অঞ্চলটির সীমানা পরিবর্তিত হয়েছে। এর মধ্যে পারস্য সাম্রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্য, সেলজুক তুর্কিয়ে ও বাইজনটাইন সাম্রাজের অধীনে ছিল। এ ছাড়া অঞ্চলটি জুড়ে একাধিক আরব উপজাতি আক্রমণ চলে ধারাবাহিকভাবে।১৯২০ সালে তুর্কি ও গ্রিকদের মধ্যে এক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ওই যুদ্ধে গ্রিকরা পরাজিত হলে ডেরিনকুয়ু ছেড়ে তারা পালিয়ে যায় গ্রিসে। ধারণা করা হয়ে থাকে, কয়েকশ’ মাইল বিস্তৃত এই অঞ্চলে শুধু গুহা আকারের অনেক কক্ষই আছে তা নয়, ভূগর্ভস্থ দুই শতাধিক শহরও রয়েছে। ছোট ও বিচ্ছিন্ন এই শহরগুলো আবিষ্কারের পর ওই সুড়ঙ্গগুলোর সঙ্গে যুক্ত অবস্থায় দেখা যায়। যেগুলো বিশালাকারের ভূগর্ভস্থ সংযোগ তৈরি করেছিল।

কাপাডোসিয়ার রুক্ষ ভূখণ্ড ও কৃষি উৎপাদন অল্প হওয়ার কারণে প্রাচীনকালে এলাকাটি অনুন্নত ছিল। এ অঞ্চলের শুধু কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শহর ছিল উন্নত। ইতিহাসের তথ্য মতে, এ অঞ্চলে প্রথম ধর্ম ছিল খ্রিস্টানধর্ম । পরে পার্সিয়ান ধর্ম ও ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটে।

তুরস্কের আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হলো কাপাডোসিয়া। বর্তমানে কায়সেরির পশ্চিম থেকে আকসারা (১৫০ কিমি) পর্যন্ত এর এলাকা বিস্তৃত। সবচেয়ে বেশিসংখ্যক স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে এখানে। কাপাডোসিয়ার আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে ভূগর্ভস্থ ডেরিনকুয়ু ও কায়মাকালি এবং গোরমে জাতীয় উদ্যান। এই ভূগর্ভস্থ শহরগুলোর গোলকধাঁধার জন্য কাপাডোসিয়া বিখ্যাত। সেখানে রয়েছে অসংখ্য পাথর খোদাই করা গির্জা ও বাসস্থান। এ কারণেই ১৯৮৫ সালে গোরমে ন্যাশনাল পার্ক ও কাপাডোসিয়ার রকসাইট বিশে^র ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় স্থান পায়। সমগ্র আনাতেলিয়া জুড়ে প্রায় ২০টি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। বিস্তীর্ণ এই অঞ্চল ঘুরে দেখার জন্য সবচেয়ে উপযোগী বাহন হলো বেলুন। কাপাডোসিয়ার হট এয়ার বেলুন রাইড পৃথিবী বিখ্যাত। বেলুনে চড়ে আকাশ থেকে এই পরাবাস্তব দৃশ্য দেখার রোমাঞ্চই আলাদা।

রহস্যময় ডেরিনকুয়ু

বিচিত্র ভূ-প্রকৃতির ক্যাপাডোসিয়ার মাটির নিচে এক বিস্ময়কর রহস্য হয়ে লুকিয়ে ছিল ভূগর্ভস্থ শহর ডেরিনকুয়ু। কয়েক হাজার বছর আগে নির্মিত এ শহর আজও মাটির নিচে অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে। ভেতরের অবকাঠামোটি অনেক মজবুত। কাপাডোসিয়া অঞ্চলটি এমন পরিকল্পিত ও সুসজ্জিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপন করতে পারে। প্রাচীন এলেনগুবু শহর বর্তমানে ডেরিনকুয়ু শহর নামে পরিচিত। মাটি থেকে ৮৫ মিটারেরও (প্রায় ২৮০ ফুট) গভীরে অবস্থিত প্রাচীন এই শহরটির ছিল ১৮টি স্তর। এই স্তরগুলো জুড়ে ছিল শুকনো খাদ্য গুদাম, গুরুর গোয়াল, স্কুল, পানীয়ের দোকান, রান্নাঘর, কবরসহ একটি সম্পূর্ণ শহর। সেখানকার বাসস্থানগুলো ভেতরে জট পাকানো অনেক সংযোগ আবিষ্কার করা হয়। সেখানে খ্রিস্টানদের একটি উপাসনালয়ও দেখতে পাওয়া যায়। যা প্রমাণ করে এটি একটি প্রাচীন সভ্যতা ছিল। এটি খুব নিরাপদেই এত দিন মাটির নিচে চাপা পড়েছিল। খুব দ্রুত তা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ১৯৮৫ সালে তুরস্কের এই অঞ্চলটি ইউনেসকো বিশ^ ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।

যেভাবে আবিষ্কার হলো

স্থানীয়দের তথ্য মতে, ১৯৬৩ সালে ডেরিনকুয়ু শহর ‘পুনঃআবিষ্কার’ করা হয়েছিল। সে সময় নাম না জানা এক স্থানীয় বাসিন্দার বারবার মুরগি হারিয়ে যাচ্ছিল। তাই তিনি ভাবলেন মুরগির খামারটি মেরামত করা যাক। এরপরই তিনি খামারটির মাটি খোঁড়া শুরু করলেন। আর বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতে পেলেন পুরনো খামারটি হারিয়ে গেছে। আর সেখানে দাঁড়িয়ে আছে নতুন একটি সরু পথ, যা এর আগে কখনোই দেখা যায়নি। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই এলাকাটিতে জোরালো তদন্ত শুরু করে তুর্কিয়ে কর্তৃপক্ষ। পরে তারা খনন করতে গেলে সেখানে একটি সরু রাস্তা খুঁজে পায়। এ সময়ই প্রথমবারের মতো ভূগর্ভস্থ শহর ডেরিনকুয়ুর সন্ধান পায় তারা। লুকানো ওই রহস্যময় শহরে এবার অনেক ব্যক্তিগত বাড়ি দেখতে পেলেন তারা । যার সঙ্গে ৬০০টিরও বেশি প্রবেশপথ সংযুক্ত ছিল। এর সঙ্গে সঙ্গেই নতুন করে খনন কাজ শুরু হয় ডেরিনকুয়ুতে। আর এভাবেই মাটির নিচের লুকিয়ে থাকা কয়েক হাজার বছরের রহস্যময় এ শহরটি অবিষ্কার হয়।

নির্মাতা কারা

প্রাচীন শহর ডেরিনকুয়ু নির্মাণের সঠিক তারিখ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। গ্রিক ভাষায় লেখা সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থের একটি আনাবিসিস। খ্রিস্টের জন্মেরও প্রায় ৩৭০ বছর আগে এ গ্রন্থটি লিখেছিলেন গ্রিক লেখক ও ইতিহাসবিদ জেনোফোন। তিনি বহুকাল ধরে এ অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। ধারণা করা হয়ে থাকে, গ্রন্থটিতে সর্বপ্রথম সে সময়ের ডেরিনকুয়ু শহরের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

জেনোফোন তার আনাবাসিসে ডেরিনকুয়ু শহর সম্পর্কে এভাবে বলেছেন, ‘জনবসতিপূর্ণ এলাকায়, মাটির নিচে ঘর তৈরি করা হয়। ঘরগুলোতে প্রবেশের পথ ছিল কুয়োর গলার মতো সরু। তবে অভ্যন্তরটি বেশ প্রশস্ত ছিল। পশুদের খোদাই করা ভূগর্ভস্থ আশ্রয়ে রাখা হয়েছিল। তাদের জন্য বিশেষ রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল। আপনি যদি প্রবেশদ্বার না জানেন তবে ঘরগুলো অদৃশ্য। তবে সে সময়ের মানুষরা সিঁড়ি দিয়ে এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশ করেছিল। ভেতরে রাখা হয়েছিল ভেড়া, গরু ও পাখি। স্থানীয় বাসিন্দারা মাটির পাত্রে বার্লি থেকে বিয়ার এবং কূপে মদ তৈরি করে।’

তবে কারা ঠিক কোন সময়ে এ শহরটির নির্মাণ করেছিল তার সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। তবে খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ থেকে ১২০০ অব্দে ‘হিট্টিই’দের রাজত্ব ছিল আনাতোলিয়ায়। নানা দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধের ফলে এই সাম্রাজ্য ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে এ অঞ্চলে বলকান থেকে ‘ফ্রিজিয়ান’দের আগমন ঘটে। কেউ কেউ ধারণা করে থাকেন, ফ্রিজিয়ানদের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্যই হিট্টিইরা ডেরিনকুয়ু নির্মাণ করেছিল। আবার কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ৮০০ শতাব্দীর মধ্যে ফ্রিজিয়ানরাই তৈরি করেছিলেন। 

আবার কারও মতে, ডেরিনকুয়ু শহর সম্পূর্ণ তৈরি হয়েছিল বাইজেনটাইন যুগে। এ যুগেই শহরটির বিস্তৃতি ও সংস্করণ করা হয়েছিল। তখন শহরটি ‘মালাকোপিয়া’ নামে পরিচিত ছিল। সে সময় এখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে আরবের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিয়ত যুদ্ধ লেগেই থাকত।

বাসিন্দা কারা

রহস্যময় ডেরিনকুয়ু কারা বা কি উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিল তা আজও অজানাই রয়ে গেছে। তবে ২০০২-২০০৫ সালে শহরটি নিয়ে গবেষণা করছিলেন ব্রিটিশ প্রতœতাত্ত্বিকদের একদল গবেষক। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, নেভসেহিরে কাপাডোসিয়ার ভূগর্ভস্থ শহরগুলোতে ‘নির্দিষ্ট কিছু মানুষ’ বাস করে থাকতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, তাদের উচ্চতা দেড় মিটারের বেশি ছিল না, যা ভূগর্ভস্থ হল ও কক্ষগুলোর মধ্যকার সরু ম্যানহোল দেখা গেছে। তারা যে কক্ষগুলোতে থাকতেন সেগুলোও ছোট ছিল। তাই এটি বিশ্বাস করা কঠিন, সাধারণ উচ্চতার মানুষের পক্ষে কয়েক দশক ধরে ওই সংকুচিত আবাসস্থলে থাকা সম্ভব। এ ছাড়া ফ্লোরিডা স্টেট বিশ^দ্যিালয়ের ক্ল্যাসিক্যাল স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়া ডি জিওরগির মতে, মাটিতে পানির অভাব ও এর নমনীয় ও সহজে খোদাইযোগ্য শিলার কারণে কাপাডোসিয়া এই ধরনের ভূগর্ভস্থ শহর নির্মাণের জন্য উপযুক্ত।

যা রয়েছে ডেরিনকুয়ুতে

সে সময় আনাতোলিয়ার প্রাচীন অধিবাসীরা আবিষ্কার করে, ছাই আর লাভা থেকে তৈরি নরম শিলা পাথর খোদাই করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব। তাই সেই নরম পাথর খোদাই করে তারা নির্মাণ করে ঘরবাড়ি ও আশ্রয়স্থল। সেই সঙ্গে মাটির নিচে তৈরি করে শহর। কাপাডোসিয়ায় মাটির নিচের স্থাপনার মধ্যে সবচেয়ে গভীর ও বিশাল হল ডেরিনকুয়ু। কাপাডোসিয়ায় ভূগর্ভস্থ গুহাগুলো সম্পূর্ণভাবে মানুষের হাতে নির্মিত, যা আজও কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। ধারণা করা হয়, শত্রুপক্ষের হামলা থেকে নিরাপদে থাকার জন্য এসব গুহা নির্মিত হয়েছিল। তবে সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো, এ শহরের বাসিন্দাদের সভাস্থলগুলো, যা ভূপৃষ্ঠ থেকে ৬০ থেকে ৮০ মিটার গভীরে অবস্থিত। এ সভাস্থলগুলোর দেয়াল নরম আগ্নেয় পাথরে তৈরি করা হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গুহাগুলো নির্মাণ করা হয়। মূলত লুটতরাজ ও শত্রুপক্ষের হামলার হাত থেকে শহরবাসীকে রক্ষা করার জন্য এগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। ধারণা করা হয়, এ শহর একটি গুপ্ত আস্তানা হিসেবে ব্যবহার হতো। এ ছাড়া মানুষের জীবনযাপনের সব ধরনের সুবিধাই ছিল সেখানে। মাটির ওপরে প্রায় ৬০০টি দরজা ছিল, যা দিয়ে ভূগর্ভস্থ শহরে প্রবেশ করা যেত। শহরটিতে প্রবেশের প্রতিটি দ্বার বন্ধ করা থাকত প্রায় ৫ ফুট চওড়া ও ৫০০ কেজি ওজনের গোলাকার পাথরের দরজা দিয়ে। গোলাকার পাথরের এই দরজাগুলো শহরকে রক্ষা করত নানা রকম বিপদের হাত থেকে। পুরো শহরজুড়ে বায়ু চলাচলের জন্য ছিল প্রায় কয়েক হাজার খাদ বা ডোবার। এ ছাড়া অসংখ্য সুড়ঙ্গ, গলি ও রাস্তা এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে কারও কাছেই শহরটি সহজবোধ্য হয়ে না ওঠে। শহরটির বিভিন্ন তলাতে খুঁজে পাওয়া গেছে মদ তৈরির সরঞ্জাম, তেলে ঘানি ও আস্তাবল, গুদামঘর, ভোজন কক্ষ, নিজস্ব প্রার্থনা কক্ষ ইত্যাদি। শহরটির দ্বিতীয় তলায় খুঁজে পাওয়া গেছে বেশ কিছু সমাধি। আর তৃতীয় তলায় ছিল খিলানযুক্ত পিপে আকৃতি একটি প্রশস্ত কক্ষ, যা ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই বিচিত্র সমাধিগুলো ও অন্যসব স্থাপনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, এগুলো সে সময় ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রার্থনার কাজে ব্যবহার হতো। ডেরিনকুয়ুর বিভিন্ন পাশ দিয়ে প্রায় ৫৫ মিটার লম্বা বিশালাকারের বায়ু চলাচলের চিমনি ছিল। এই চিমনিগুলো আবার লুকানো অবস্থায় ছিল। যাতে ওপর থেকে কেউ এটি দেখতে না পায়। ডেরিনকুয়ুর তলদেশ দিয়ে একটি নদীর প্রবাহ ছিল। শহরজুড়ে তৈরি করা হয়েছিল অনেকগুলো কুয়া। এই কুয়াগুলো সেই নদীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। সেখান থেকে সংগ্রহ করা হতো খাবার পানি। এ ছাড়া ১৮০ ফুট চওড়া একটি খাদ শহরের প্রধান কুয়া হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এদিকে পাতাল এই শহরটির বিভিন্ন পাশ দিয়ে নালা আকৃতির রাস্তাও খুঁজে পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, এখান দিয়ে শহরটির বাসিন্দাদের জন্য পানীয় জল সরবরাহ করা হতো।

গবেষকদের মতে, কাপাডোসিয়াতে ভূগর্ভস্থ শহরের সংখ্যা প্রায় হাজারের কাছাকাছি। আর এই শহরগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত ছিল গুপ্ত রাস্তা বা সুড়ঙ্গ দিয়ে। এ রকম আরেকটি পাতাল শহরের নাম হলো কাইমাকোলি বা ভিনিগাফ, যা ডেরিনকুয়ু থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই দুই শহরের মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র রাস্তা ছিল ৫ কিলোমিটারে দীর্ঘ এক সুড়ঙ্গ।

১৯৬৯ সাল থেকে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় রহস্যময় শহর ডেরিনকুয়ু। তবে প্রাচীন সেই সময়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শহরের বাসিন্দারা কিভাবে পৃথিবীর আলো-বাতাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওই গুহায় বাস করত , তা আজও রহস্য হয়েই রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত