মিয়ানমারের গোলার উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:০০ এএম

সপ্তাহের ব্যবধানে দুই দফায় বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের গোলা এসে পড়ায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছে সরকার। এরইমধ্যে সব বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে পর পর দুইবার সীমান্তে গোলা এসে পড়ার ঘটনাকে চীনের উসকানি এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পিছিয়ে পড়ার কৌশল কি না সেটির দিকে নজর রাখতে বলছেন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এছাড়া বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল এ ঘটনায় সরকারের সমালোচনা করে বলেছে, ‘মিয়ানমারের এই মর্টারের পাল্টা জবাব দিতে হবে।’ কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ‘যে কোনো কারণেই হোক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই বার করে সীমান্তে গোলা আসার ঘটনাকে হালকা করে না দেখাই ভালো। ঘটনাটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ হলেও দেশটিতে থাকা রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করবে। মিয়ানমারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে।’

তবে এ ঘটনা নিয়ে সরকারও সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সপ্তাহের ব্যবধানে দুই দফায় বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের গোলা এসে পড়ায় দ্বিতীয় বারের মতো তলব করা হয়েছে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমার রাষ্ট্রদূত অং চয়ে মোয়েকে। এ ঘটনায় কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে কূটনৈতিক পত্র হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল রবিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে তলব করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক মিয়া মাইনুল কবির। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে বাংলাদেশের অসন্তুষ্টির বিষয়টি রাষ্ট্রদূতকে জানানো হয় এবং এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা প্রয়োজন এবং সেটির বিষয়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে উল্লেখ করে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক অবস্থান নিয়েছি। দেশটির অভ্যন্তরে চলমান অস্থিতিশীলতায় যেন কোনো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে তা নিয়ে আমরা সতর্ক। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে কেন্দ্র করে এখানে উসকানির কোনো বিষয় নেই। তারপরও আমরা নজরে রেখেছি।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘এতে চীনের বা প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে ঘিরে কোনো উসকানির বিষয় না থাকলেও আমরা উদ্বিগ্ন। কারণ দেশটিতে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার ফলে দেশটিতে থাকা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার আশঙ্কা সব সময়ই থাকে। আবার ওই দেশে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনও পিছিয়ে যাবে।’ 

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক ওয়ালি উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই ঘটনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খুবই ভালো। তারপরও সরকারকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নিতে হবে। এতে মিয়ানমারের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ এই অস্থিরতাও আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।’

এদিকে গতকাল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অব্যাহত সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং একইসঙ্গে ওই ঘটনার পাল্টা জবাব দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে দলটি। সমাবেশে দলের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং কিউ মোয়েকে তলব করে সতর্ক করার পরেও গত ৩ সেপ্টেম্বর সীমান্ত পিলার ৪০-৪১ এর কাছাকাছি মিয়ানমারের হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমান দেখা যায়। হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ, মর্টার শেল ও বোমা নিক্ষেপ করা হয়। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি পরিহার করে বাংলাদেশ সরকারকে ইটের বদলে পাটকেল নিক্ষেপ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতার কারণেই এখন পর্যন্ত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদন করা যায়নি। এ চুক্তি ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর হবে অর্থহীন।’

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে মিয়ানমারের মর্টার শেল ছোড়া প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল এক অনুষ্ঠানে সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘এই সরকারের তো জনগণের শক্তি নেই। সে টিকে আছে অন্যদের শক্তিতে। যে কারণে তার নিজের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে তার যে ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন সেই ভূমিকা সে নিতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া সে টিকেও থাকবে না। চীন ও ভারতকে কনভিন্সড করে এদিকে মর্টার মারলে ওদিকেও যাতে মর্টার যায়, সে ব্যবস্থা অবশ্যই তাকে করতে হবে।’

প্রথম দফায় মিয়ানমার থেকে দুটি মর্টার শেল বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় এসে পড়ার ঘটনায়ও ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। যদিও সে সময় চুপচাপ ছিলেন মিয়ানমার রাষ্ট্রদূত।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, গত সপ্তাহে তলবের পর মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত এই ঘটনার কোনো উত্তর দেননি এবং দুঃখ প্রকাশ করার বিষয়টি বেশ কৌশলগত অবস্থান থেকে করেছেন। এ ঘটনায় রাষ্ট্রদূতকে তাদের অবস্থান জানানোর কথা বলা হলে তিনি তার দেশের সঙ্গে আলাপ করে জানানোর বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। সেদিন বিভিন্ন জিজ্ঞাসার মুখে মিয়ানমার রাষ্ট্রদূত নীরবতা পালন করেছেন এবং খুবই কম কথা বলেছেন উল্লেখ করে কূটনৈতিক সূত্র জানায়, রাষ্ট্রদূত পূর্ণ শব্দের প্রকাশ এড়িয়ে গিয়ে হ্যাঁ-না সূচকের সঙ্গে শারীরিক অঙ্গভঙ্গির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সে সময় পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন তলব পরবর্তী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ‘মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে মৌখিকভাবে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।’

তবে এক সপ্তাহ পর সীমান্তে ফের মিয়ানমারের আরও দুটি গোলা এসে পড়ায় বাংলাদেশ অধিকতর সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, দ্বিতীয় দফায় এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা জানার চেষ্টা করব। আমরা পুরো বিষয়গুলো সার্বক্ষণিক নজরে রাখছি।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ আরাকান আর্মিদের সঙ্গে অন্যদের কিছু মারামারি হচ্ছে। ঘটনাস্থল বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে হওয়ায় মাঝেমধ্যে এখানে চলে এসেছে। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং কিউ মোয়েকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তখন তিনি আমাদের বলেছেন, এ বিষয়ে তারা (মিয়ানমার) আরও সতর্ক হবে। তাদের সরকারকে জানাবে। যাতে এ ধরনের কিছু আমাদের এখানে এসে না পড়ে।

ড. মোমেন বলেন, ‘অসমর্থিত সূত্রে ইতিমধ্যে আমরা শুনেছি মিয়ানমারের আর্মি তাদের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে থাকা লোকজনদের এলাকা ছেড়ে দিতে বলেছে। যার ফলে আমাদের ভয়, কিছু লোক আমাদের দেশে চলে আসতে পারে। আমরা এ জন্য আমাদের বিজিবি এবং অন্য আরও যত বাহিনী আছে তাদের ইতিমধ্যে সতর্ক প্রহরা অবস্থায় রেখেছি। তারা অধিকতর ব্যবস্থা নিয়েছে, যাতে মিয়ানমারের কোনো নাগরিক আমাদের দেশে না আসতে পারে। আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত যাতে মিয়ানমারের নাগরিক কেউ না আসতে পারে। আমরা এ বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছি।’

প্রসঙ্গত, দ্বিতীয় দফায় মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান থেকে ছোড়া দুটি গোলা শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম এলাকায় পড়ে। এর আগে ২৮ আগস্ট বেলা ৩টার দিকে মিয়ানমার থেকে নিক্ষেপ করা দুটি মর্টার শেল অবিস্ফোরিত অবস্থায় ঘুমধুমের তমব্রু উত্তর মসজিদের কাছে পড়ে। এক সপ্তাহের কম সময়ে কয়েক দফায় গোলা এসে পড়ার ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত