জন্মদিনে হারিয়ে ফেললাম বন্ধু অভিভাবককে

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:০৩ এএম

গতকাল ছিল আমার জন্মদিন। এমন একটি দিনেই হারিয়ে ফেললাম বন্ধু, অভিভাবক, পথ প্রদর্শক, সহকর্মী কিংবদন্তি গীতিকবি গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে। জন্মদিনে দেশ-বিদেশের ভক্ত-শ্রোতাদের যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দোয়া পাই, সেটি কিন্তু আমি প্রত্যাশা করি। এগুলো শিল্পী জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। তবে আমি কোনো দিন জন্মদিনে বিশেষ কোনো আয়োজন করি না। এবার তো প্রশ্নই আসে না। ঘুম থেকে উঠেই খবর পেলাম গাজী ভাই আর নেই! আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। এই একে একে সবাই আমাকে একা করে চলে যাচ্ছেন, কোনোবারই তো বিশ্বাস হয় না। কিন্তু দিনকে দিন যখন তাদের আর কাছে পাই না, দেখতে পাই না, ফোনে কণ্ঠ শুনতে পাই না, তখন বুঝি আসলেই তো তারা আমাকে রেখে চলে গেছেন। গাজী ভাইয়ের বিদায়ের বেদনায় ঢাকা এই জন্মদিন যত দিন বাঁচি ভুলতে পারব না।

অনুভূতি অনেক সময় ভোঁতা হয়ে যায়। এই মুহূর্তে আমার সেই অবস্থা। উনি আমার থেকে বয়সে বড়, কিন্তু ওনার চলে যাওয়া কীভাবে মেনে নেব? উনি তো অসুস্থ ছিলেন না। গত মাসেই তো আমাদের আরেক কিংবদন্তি সংগীতকার আলম থানের স্মরণসভায় আমরা একসঙ্গে অংশ নিলাম শিল্পকলা একাডেমিতে। কত কথা, কত গল্প হলো। তার স্বভাবসুলভ সেন্স অব হিউমার দিয়ে কত হাসালেন। সেই মানুষটি এভাবে হুট করে চলে যাবেন, কে ভাবতে পারে! জানি না কীভাবে কী হলো। এখন শুধু এটুকুই চাওয়া, গাজী ভাইকে আল্লাহ তায়ালা বেহেশত নসিব করুন। তিনি চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে, কিন্তু তার কাজ আজীবন মানুষের মনে তাকে বাঁচিয়ে রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।’

কিছু মানুষ থাকেন যারা আমার জীবনে কোন ভূমিকায়, সেটি এক কথায় বলে দেওয়া যায়। কিন্তু গাজী ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ঠিক একটি বিশেষণে বলতে পারছি না। তিনি একাধারে আমার বন্ধু, শিক্ষক, অভিভাবক, সহকর্মী ও পরামর্শদাতা। কম দিনের পরিচয় তো নয়, সেই ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে পরিচয়। তার সঙ্গে যে কত কাজ করেছি, সেটি তো বলে শেষ করা যাবে না। প্রথম কোন গানটি গেয়েছিলাম, সেটিও মনে নেই। তবে তার সঙ্গে কাজ করা শুরুর দিকের একটি গান ১৯৬৭ সালের সিনেমা ‘অবুঝ মন’-এর ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়...’। সর্বশেষ তার কথায় গেয়েছি বছরখানেক আগে একটি অডিও কোম্পানির আধুনিক গান। কাজের বাইরে একটা সময় সম্পর্কটা পারিবারিক হয়ে ওঠে। তাই তো তার কোনো আবদার ফেলতে পারতাম না। তার একটি সিনেমায় আমাকে বেশ বড় চরিত্রে নায়িকা মৌসুমীর সঙ্গে অভিনয়ও করতে হয়েছিল। 

গাজী মাজহারুল আনোয়ার ২০ হাজারের বেশি গান লিখেছেন। এটা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। আর সেই গানের মধ্যে আমি একাই কণ্ঠ দিয়েছি ৬-৭ হাজার গানে। এটা ভাবতেই তো অবাক লাগে, তাই না? বুঝতেই পারছেন, কত কাজ আমরা একসঙ্গে করেছি। এসব কাজ করতে গিয়ে আমরা কত সময় একসঙ্গে কাটিয়েছি, কত স্মৃতি, কত ঘটনা। সংগীত পরিচালক সত্য সাহা আর গাজী ভাই ছিলেন যেন হরিহর আত্মা। তাদের রসায়ন এতটাই স্ট্রং ছিল যে সত্য ভাই কী চাইছেন তা বলার আগেই গাজী ভাই বুঝে যেতেন। আর গাজী ভাই তার কথাগুলো কী ধরনের সুরে কল্পনা করেছেন, তাও সত্যদা বুঝে যেতেন। আর আমি তাদের সঙ্গে এতগুলো কাজ করতে গিয়ে যেন ‘ত্রয়ী’তে পরিণত হই। এ কথা গাজী ভাই অনেক জায়গাতেই বলেছেন। আমিই যে তার লেখা গান সবচেয়ে বেশি গেয়েছি, সে কথা তো তার আত্মজীবনীতে লিখেও গেছেন।

তার লেখা ৬-৭ হাজার গানে কণ্ঠ দিয়েছি। এর মধ্যে আমার পছন্দের গান খুঁজে বের করা এক কথায় অসম্ভব। তবে শ্রোতা-দর্শকদের যে গানগুলো প্রিয় এর মধ্যে রয়েছে ‘এই মন তোমাকে দিলাম, ‘সে যে কেন এলো না’, ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’, ‘ও পাখি তোর যন্ত্রণা’, ‘দুঃখ আমার বাসররাতের পালঙ্ক’, ‘ও আমার রসিয়া বন্ধুরে’, ‘যদি আমাকে’, ‘ফুল যদি ঝরে যায়’, ‘মাগো আর তোমাকে ছেলে হারানোর গান শোনাতে দেব না’সহ অসংখ্য গান।

অনুলিখন: মাসিদ রণ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত