ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সিংহাসনে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আসীন ও বিশ্বের প্রবীণতম রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ৯৬ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। জীবদ্দশায় ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সফর করেন তিনি। এরও আগে ১৯৬১ সালে ভারত সফরে আসেন রানী। সে সময় রানীর ট্রেন ভ্রমণে তার জন্য রাজকীয় একটি কোচ তৈরি করা হয়েছিল। নকশায়, আসবাবে রেলকোচটি যেন এক ক্ষুদ্র রাজপ্রাসাদ! সুদৃশ্য সেই কোচটি বর্তমানে আছে বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে। রানীর স্মৃতিবিজড়িত এ বিশেষ কোচটি এখন নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার জাদুঘরে রাখা হবে।
রানীর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এ কোচটির কিছু মেরামতের জন্য সৈয়দপুরে দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানার ক্যারেজ শপে নেওয়া হয়েছে। কোচটির ভেতরে ঢুকলেই মনে হবে যেন রাজপ্রাসাদের ভেতর ঢুকেছেন। প্রবেশদ্বারেই রয়েছে কোচটির ইতিহাস লেখা একটি ওয়ালবোর্ড। এক পা এগোতেই চোখে পড়বে নিরাপত্তাকর্মীদের একটি কামরা। রয়েছে রানীর সঙ্গে আসা পাইক-পেয়াদা ও তার স্টাফদের জন্য থাকার আলাদা কক্ষ। এরপর দেখা যাবে একটি সভাকক্ষ। সেগুন কাঠের তৈরি বড় দুটি সোফা রাখা আছে সেখানে, সেই সোফার সামনে আছে ৮-১০টি চেয়ার। নান্দনিক কারুকার্য দেয়ালজুড়ে।
লালগালিচা আর সাদা কাপড় দিয়ে মোড়ানো পুরো সভাকক্ষ। সেখানে আলমারিতে আছে ড্রিংকস কেস ও ছাইদানি। রয়েছে এসি, নান্দনিক ডিজাইনের লাইটিং, ফ্যান, উন্নত কাঠের আসবাব আর দামি ঝাড়বাতি। এরপরই আছে খাট, ফোল্ডিং বেসিনযুক্ত রানীর জন্য বরাদ্দ করা দুই বিছানার একটি শয়নকক্ষ। দোতলা আলমারি, জিনিসপত্র রাখার জন্য তামার তৈরি ছোট দুটি পাত্র। এরপর এক কক্ষজুড়ে বাথরুম। তার পুরো দেয়াল উন্নতমানের ছোট ছোট টাইলসে বাঁধানো। সিলিংও সবুজাভ টাইলসে মোড়ানো। মেঝেতে কাঠের ওপর মোজাইক। সেখানকার ঝাড়বাতিগুলো নকশাদার ও রঙিন। দেয়ালজুড়ে তামা-পিতলের আলপনা। প্রসাধনীসামগ্রী রাখার জন্য আছে তামার তৈরি নান্দনিক ঝুড়ি। আছে বিশাল সবুজ মার্বেলের বাথটাব ও পিতলের ঝরনা। এরপরের কক্ষটি বাবুর্চিদের থাকার জন্য। তারপরের কক্ষটি রান্নাঘর। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই এ কোচের ভেতরে রানীর জন্য ক্ষুদ্র রাজপ্রাসাদ তৈরি করা হয়েছিল। লাইটগুলো অচল হওয়ায় নতুন করে লাইট লাগানো হয়েছে। ছয় কামরাবিশিষ্ট এই পুরো কোচ লাল মখমলে কার্পেটে মোড়া। প্রতিটি কক্ষের সঙ্গে লাগোয়া বাথরুম ও বেলজিয়ামের উন্নত স্যানিটারি ফিটিংস। বোঝাই যায় না, এগুলো এত বছর আগের তৈরি। ট্রেনের সাধারণ কোচে ৮টি চাকা থাকলেও রানীর এ সেলুনটিতে রয়েছে ১২টি চাকা।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) সাদেকুর রহমান বলেন, ‘রানী এলিজাবেথ এ কোচে ভ্রমণ করেন। পরে এটি পরিবর্তিত হয়ে প্রেসিডেন্ট সেলুন কোচ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লে এটি মেরামতের জন্য আনা হয় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায়। বর্তমানে ব্যবহার না হলেও, আমরা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে সযতেœ রেখে দিয়েছি এটি।’
রেলওয়ে কারখানার এ কর্মকর্তা জানান, রানী ভারত সফর করে ব্রিটেনে ফিরে যাওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়েকে এ সেলুন কোচটি উপহার হিসেবে দিয়ে যায়। একসময় কোচটি চলাচলের উপযোগী ছিল। ১৯৮১ সালে কোচটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তখন থেকে এটি সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় সংরক্ষিত রয়েছে।
কারখানার ক্যারেজ শপের ইনচার্জ মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ মারা গেলেন। তার এ স্মৃতিটুকু আমরা বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষে কালের সাক্ষী হিসেবে রেখে দিতে চাই। তাই সেলুন কোচটি কারখানার ক্যারেজ শপে আনা হয়েছে। কিছু জিনিস মেরামত করে নবনির্মিত রেলওয়ে জাদুঘরে দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হবে।’
