পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা ক্রমেই জটিল হচ্ছে। বাইরে বা দূর থেকে যতটা আঁধার চোখে পড়ছে, পরিস্থিতি তারচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। জননেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধারেকাছে এখনো কেউ না থাকলেও প্রশাসক মমতা সম্পর্কে কিন্তু ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠে গেছে। ছাত্রনেতা আনিস খানকে বাড়ি ঢুকে যেভাবে খুন করা হয়েছে তা নিয়ে আগেই প্রশ্ন ছিল। একদিন আগে আনিসের ভাই সলমনকে কে বা কারা নৃশংসভাবে জখম করছে তা নিয়েও জনসাধারণের বড় অংশ যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। সলমন শুধুমাত্র আনিসের তুতো ভাই নয়, ও আনিস মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ফলে তাকে চিরদিনের জন্য সরিয়ে দিলে কাদের লাভ তা বোঝার জন্য কোনো স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দা দরকার পড়ে না। এমন একটা দিন নেই, যেদিন কোথাও না কোথাও কোনো খুনের ঘটনা না ঘটছে। কয়েকমাস আগে রামপুরহাটের বাগটুই গ্রামে নারকীয় ভাবে আগুন দিয়ে খুন করা হয়, এক পরিবারের বেশ কয়েকজনকে। তার মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। কয়েকদিন আগে কলকাতার কাছে দুটি কিশোর খুন হয়ে গেল। কিশোরদের পরিবারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েক দিন আগে নিখোঁজ ডায়েরি করা হলেও পুলিশ গা করেনি। পচা গলা মৃতদেহ পাওয়ার পর পুলিশের টনক নড়ে। প্রায় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং ঘটনাস্থলে গিয়ে যথাযথ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। পুলিশকে ভর্ৎসনা করেছেন। এসব ঠিক। দু-এক ক্ষেত্রে নীচুতলার পুলিশ কর্মীদের নামমাত্র সাজাও হয়েছে, তাও সত্যিই। মুশকিল হচ্ছে, পুলিশ দপ্তর যেখানে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর হাতে, সেখানে ব্যর্থতার দায় অস্বীকার করলেও, অন্তত আড়ালে-আবডালে লোকজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করছে। করবেই। এছাড়াও পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি এখন পশ্চিমবঙ্গে রোজকার ঘটনা। টিভিতে নেতা, মন্ত্রী, শাসক দলের ঘনিষ্ঠ লোকজনের ঘর থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধারের রোমহর্ষক কাহিনী ইদানীং এ-রাজ্যে সিরিয়ালের চেয়েও লোকে বেশি দেখছে। এখানে অবশ্য দুটি কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার। ১. ভারতে সর্বত্রই দুর্নীতি এখন এক ভয়ংকর, প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা নিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের মুখ্য শরিক বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে যত গরমাগরম কথা বলুক, তারা যে মোটেও ধোয়া তুলসী পাতা নয়, সেটা একটু-আধটু চোখ-কান খোলা রাখলেই টের পাওয়া যায়। দিল্লিতে বিজেপির সদর দপ্তরের জৌলুশ, সাত তারা হোটেলকেও লজ্জা দেবে। তাছাড়া মধ্য প্রদেশের বিজেপিশাসিত রাজ্যের শিক্ষা নিয়ে ব্যাপক কেলেঙ্কারি তো এদেশের অন্যতম বড় স্ক্যাম। তাও বিজেপি দুর্নীতি করে বলে আমার দুর্নীতি সাতখুন মাফ, তৃণমূল কংগ্রেসের এই হাস্যকর যুক্তিও মেনে নেওয়া যায় না।
২. পাশাপাশি আর এক বিষয়ে আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একমত। আমার বামপন্থি বন্ধুরা যত ‘চোর ধরো জেল ভরো’ বলেই চেঁচিয়ে বাজার মাত করুন, যাদের ওপর নির্ভর করে বামেরা আহ্লাদে গদগদ হয়ে উদ্বাহু নেত্য করছেন, তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। যে কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্সিগুলো, সিবিআই, ইডি, এনআইএ আজ দুর্নীতি দমনে অতি তৎপরতা দেখাচ্ছে, তাদের পেছনে রাজনৈতিক অভিসন্ধি আছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো, আমারও তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বামেরা একসময় বলতেন, শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শ্রেণিনিরপেক্ষ কিছু হয় না। ফলে আদালত, কেন্দ্রীয় এজেন্সি, পুলিশ, মিডিয়া দুষ্টের দমনে নিরপেক্ষ ভূমিকা নেবে এই যুক্তি অরাজনৈতিক। তবুও বামেরা যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালি লাগার সামান্য সম্ভাবনাতেই উল্লসিত হচ্ছেন তা কিছুটা মমতা তাদের দীর্ঘদিনের মৌরসি পাট্টা ছিনিয়ে নেওয়ার যন্ত্রণা থেকে। ব্যক্তিগতভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ না করে বামেদের উচিত তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই করা। ফেইসবুকে চটিপিসী, ডাইনি বলে গালমন্দ করলে কিছুটা গায়ের জ্বালা মিটতে পারে। কাজের কাজ হবে না। মমতার রাজনীতি পুরোপুরি দক্ষিণপন্থি। ফলে সে সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর। কলেজে কলেজে তৃণমূলের দুষ্ট ছেলেমেয়েরা এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। কোনো কলেজে নির্বাচন হয় না। ফলে নির্বাচিত ইউনিয়ন নেই। গায়ের জোরে একচেটিয়া প্রাধান্য কায়েম করে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ অনেক ক্ষেত্রেই কলেজের নীতি নির্ণয়ে ভূমিকা নিচ্ছে। সরকারি স্কুলকে নানা কৌশলে প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি স্কুলেও ইদানীং প্রশাসন মাথা ঘামাতে শুরু করেছে। রাজ্যের সর্বত্রই অরাজকতা বাড়ছে। কয়লা, বালি থেকে সব সংগঠিত অসংগঠিত শিল্পে সিন্ডিকেট রাজ গড়ে উঠেছে। ওই রাজের দৌলতেই সামন্তরাল এক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গড়ে উঠেছে রাজ্যজুড়ে। তাদের মধ্যদিয়ে জন্ম হয়েছে কালো টাকার এক অসাধু অর্থনীতি। এই ক’বছরে পশ্চিমবঙ্গে কোনো বড় শিল্প গড়ে ওঠেনি। স্কুল-কলেজ সর্বত্রই নিয়োগ বন্ধ। যেটুকু যা হচ্ছে তা শোনা যায় টাকা দিয়ে।
সামাজিক পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে। খেলা, মেলা, মোচ্ছবের পেছনে যে পরিমাণ বাজেট বহির্ভূত টাকা খরচ করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার, তা এ রাজ্যের অর্থনীতিকে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে। এবার থেকে আবার নতুন এক হুজুগ সরকারের মদদে শুরু হয়েছে। দুর্গাপূজা কার্নিভাল। পুজো করার জন্য ক্লাবগুলোকে ষাট হাজার টাকা খয়রাতি করা হয়েছে। এমনিতেও ক্লাবের পেছনে লাখ টাকার ওপর অনুদান দেওয়া হয়। ভাববেন না, এ নিতান্তই মূর্খামি। সবকটি সরকারি ঘোষণার পেছনেই পাকা মস্তিষ্ক আছে। শিক্ষাকে শিকেয় তোলা মানেই মেরুদণ্ডহীন, অগভীর এক প্রজন্ম কখনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখবে না। পাড়ার ক্লাবকে টাকা দিয়ে হাতে রাখলে ভোট ও অন্যান্য নানা কাজে তাদের ব্যবহার করা যাবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিরোধী, কংগ্রেস ও বামপন্থি দলগুলোর গুরুতর অভিযোগ যে তিনি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কট্টর সমর্থক। মুখে বিজেপিবিরোধী হুঙ্কার দিলেও তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই। সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই এক জায়গায় বলেছেন, আরএসএসের সবাই খারাপ নন। ব্যক্তি আর নীতির প্রশ্নটা তিনি সম্ভবত ইচ্ছে করেই গুলিয়ে দিতে চেয়ে আরএসএসের প্রবল কমিউনাল বা সাম্প্রদায়িক এজেন্ডাকে আড়াল করতে চেয়ে লোকমনে জল্পনা আরও বাড়িয়ে তুলেছেন। নরেন্দ্র মোদি এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মিল আরও এক জায়গায় স্পষ্ট। দুজনেই বিরোধী স্বরকে মেনে নিতে চান না। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি দুজনেরই খুব একটা পছন্দের নয়। ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বামেদের সফল হতে গেলে, তিনি যে ভাষায় কথা বলেন, ঠিক সেই ভাষাতেই তাকে উত্তর দিতে হবে। গণ-আন্দোলনের পথে না গিয়ে শুধু তথাকথিত আইনি পথে গেলে ফের ক্ষমতায় ফেরা বামপন্থিদের পক্ষে কঠিন। বড্ড কঠিন। আমার বাম বন্ধুরা বলতেই পারেন যে চিরকাল দেশে দেশে কঠিন কাজ করেই বামেরা শত্রুর বিরুদ্ধে সাফল্য পেয়েছে। ঠিক কথা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অন্তত পশ্চিমবঙ্গে পার্লামেন্টারিয়ান বামেরা এখনো গ্রামে দুর্বল। তাদের মিছিল-মিটিংয়ে ইদানীং ভিড় বাড়ছে এটা ঠিক। মহম্মদ সেলিম রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পর পার্টির নড়াচড়া আগের চেয়ে নিশ্চিত অনেক বেড়েছে। কিন্তু বাম, বিশেষ করে সিপিআইএম-এ এখনো একজন জননেতা নেই। সবাই পার্টি নেতা। একদা পার্টির যে মূল শ্রেণিভিত্তি, সেই কৃষক, শ্রমিক, জেলে, মাঝি, কুমোর, কামার, সমাজের তথাকথিত অন্ত্যজ শ্রেণি এখনো সেভাবে পার্টির মধ্যে ফিরে আসেনি। আজও সিপিআইএম দলের নেতৃত্ব মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে। তারা চে গুয়েভারার টি-শার্ট গায়ে বিক্ষোভে শামিল হতে পারেন, লেনিন, স্তালিন অবলীলায় আওড়াতে পারবেন। কিন্তু চরম দক্ষিণপন্থি রাজনীতির লুম্পেনাইজেশনকে ঠেকাতে যে গণপ্রতিরোধ দরকার, তা সংগঠিত করার ক্ষমতা তাদের নেই।
লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
