কক্সবাজারে আলোচিত রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যা মামলায় ২৯ আসামির বিচার শুরু হয়েছে। গতকাল রবিবার কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম জানিয়েছেন, মুহিবুল্লাহ হত্যা মামলার অভিযোগপত্রের ওপর শুনানি শেষে আদালত ২৯ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। আসামিদের মধ্যে ১৫ জন আদালতে হাজির ছিল। বাকি ১৪ আসামি পলাতক। মামলায় ৩১ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। পরবর্তী ধার্য দিনে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে।
গত বছর ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা শিবিরের ডি ব্লকে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন মুহিবুল্লাহ। তিনি আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) নামের সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। সংগঠনের কার্যালয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় ৩০ সেপ্টেম্বর মুহিবুল্লাহর ছোট ভাই হাবিবুল্লাহ বাদী হয়ে অজ্ঞাত পরিচয়ের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান উখিয়া থানার ওসি-তদন্ত সালাহ উদ্দিন। তদন্তে মুহিবুল্লাহ হত্যাকা-ে ৩৬ জনের তথ্য পেলেও নাম-ঠিকানা না জানায় সাতজনকে বাদ দিয়ে ২৯ জনের বিরুদ্ধে গত ১৩ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
উখিয়া থানা পুলিশের ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত ১৫ জনের মধ্যে ৪ জন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। একই সঙ্গে ৩ জন সাক্ষীও ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
চল্লিশোর্ধ্ব মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু এলাকার স্কুলশিক্ষক মুহিবুল্লাহ বিদেশি বিশেষ করে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে ‘রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কারণ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নেওয়া নানা উদ্যোগে মুহিবুল্লাহর ভূমিকা ছিল।
বেশ কয়েক বছর আগে নিজ দেশ মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসে সপরিবারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা হন মুহিবুল্লাহ।
হত্যাকা-ের পর মুহিবুল্লাহর স্বজন ও অনুসারীরা দাবি করেন, প্রত্যাবাসনবিরোধী এক সশস্ত্র সংগঠন তাকে হত্যা করেছে। সংগঠনটি তাকে আগে থেকেই হুমকি দিয়ে আসছিল। কারণ তিনি রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের মধ্যেই একটা অংশ দেশে ফিরতে চায় না। সশস্ত্র দলটির সঙ্গে ‘মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর যোগাযোগ’ রয়েছে বলেও ক্যাম্পের অনেকের বিশ্বাস।
‘মাস্টার মুহিবুল্লাহ’ নামে পরিচিত এ রোহিঙ্গা নেতা খুন হওয়ার পর তার স্বজনরা বলেছিলেন, তাকে রোহিঙ্গাদের আরেকটি সশস্ত্র সংগঠন আরাকান রিপাবলিকান স্যালভেশন আর্মি (আরসার) সদস্যরা হত্যা করেছে বলে তাদের সন্দেহ।
তার ভাই আহমদ উল্লাহ বলেছিলেন, মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের সর্বজনগ্রাহ্য নেতা হয়ে উঠেছিলেন। তার সঙ্গে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিবর্গের যোগাযোগ ছিল। এ কারণে আরসা তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। এ ছাড়া তাকে নেতা মানতে রাজি ছিল না আরসা। তাই তারাই প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই মুহিবুল্লাহর স্বজন ও অনুসারীরা রোহিঙ্গা শিবির ছাড়ার চেষ্টা করছিলেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন তারা। এর ধারাবাহিকতায় তার পরিবারের ১১ সদস্য গত ১ এপ্রিল কানাডার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন।
মুহিবুল্লাহ কয়েক দফায় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেন। ইংরেজি ভাষা জানা ও রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের দক্ষতা মুহিবুল্লাহকে ধীরে ধীরে বিদেশিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। জাতিসংঘ মহাসচিবসহ বিদেশি প্রতিনিধিরা যখনই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গেছেন, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই রোহিঙ্গা প্রতিনিধি হিসেবে মুহিবুল্লাহ যোগ হয়েছেন।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে আলোচনায় আসেন তিনি। জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থায়ও রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি।
