পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত হওয়ার পাশাপাশি থানায় আসা সেবাপ্রার্থীদের হয়রানির অভিযোগ নতুন নয়। নির্যাতনে হাজতির মৃত্যুসহ বিভিন্ন সময়ে থানার ভেতরে নানা ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটছে। হাজতখানায় আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে। জিডি বা মামলা করতে গিয়ে সেবা প্রার্থীরা হয়রানির শিকার হন এমন খবর প্রকাশিত হয় প্রায়ই। অভিযোগ ওঠার পর পুলিশ বরাবরই বলে এসেছে, কোনো ব্যক্তির দায় পুলিশ বাহিনী নেবে না। তবু দায় এড়ানো যায় না। তথ্য বলছে, দুই লাখের ওপরে সদস্য আছে পুলিশ বাহিনীতে। প্রতি বছরই পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বাড়ছে। ২০১৮ সালে ১৪ হাজার ৪০২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরের বছর এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৪ হাজার ৫১২। ২০২০ সালে আরও বেড়ে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ হাজার ২১২। গত বছর ১৬ হাজার ৪১৮ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত অভিযোগ জমা পড়েছে ১ হাজারের বেশি পুলিশের বিরুদ্ধে। সুখকর খবর, থানা-পুলিশের অপরাধ ঠেকানো ও দর্শনার্থীদের হয়রানি বন্ধ করতে উদ্যোগী হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘থানায় পুলিশ কী করছে দেখতে সিসি ক্যামেরা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি বিশেষ নির্দেশনায় দেশের ৬৬৪টি থানার ওসির রুম, ডিউটি অফিসারের রুম, হাজতখানাসহ সব রুমে একটি করে ক্যামেরা বসাতে বলা হয়। ক্যামেরার মনিটর ওসির রুমে না রেখে ডিউটি অফিসারের রুমে রাখতে বলা হয়েছে। জেলার এসপিকে সিসি ক্যামেরাগুলো মনিটরিং করতে হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেশির ভাগ থানায় সিসি ক্যামেরা নেই। অনেক থানায় থাকলেও সেগুলো সচল নেই। এবার সব থানায় নতুন করে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে বলা হয়েছে। এলাকার শিল্পপতি বা বড় কোম্পানির কর্ণধারদের কাছ থেকে সিসি ক্যামেরা নিতে বলা হয়েছে। আমাদেরও কিছু ফান্ড আছে।’ এক্ষেত্রে ‘কিছু ফান্ড’ এবং ডোনারের থেকে সহায়তার বিষয়টি পরিষ্কার নয়। এছাড়া, থানা-পুলিশ স্থানীয় ডোনারের কাছ থেকে সিসি ক্যামেরা নিলে তাতে স্বচ্ছতা থাকতে হবে।
পুলিশের সংশ্লিষ্টরা জানান, থানায় সিসি ক্যামেরার মনিটর আছে ওসিদের রুমে। ফলে ওসিরা বাইরে বা ছুটিতে থাকলে থানার ভেতর কী ঘটছে তা নজরে রাখা যায় না। রাজধানীর হাতিরঝিল থানা হেফাজতে সুমন শেখ ওরফে রুম্মনের মৃত্যুর পর বিষয়টি অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। পুলিশের দাবি, সুমন আত্মহত্যা করেছে। প্রমাণ হিসেবে আত্মহত্যার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ হাজির করেছে পুলিশ। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, ক্যামেরায় দেখা যাওয়া সত্ত্বেও পুলিশ আত্মহত্যা থামাতে পারল না কেন? ক্যামেরা কি থানা হেফাজতে আত্মহত্যার প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য নাকি এ ধরনের কোনো অঘটন থামানোর জন্য? থানা হাজতের সিসি ক্যামেরায় নজরদারির দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য সে সময় কী করছিলেন? গত দুই বছরে ঢাকায় তিনটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে থানায়। এ ছাড়া, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ৩৩০ জনের। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে এ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ কোনোভাবেই এই হেফাজতে মৃত্যুর দায় এড়াতে পারে না। সিসি ক্যামেরা কেবল বসালেই হবে না, সেগুলো সচল রাখা এবং কার্যকরভাবে মনিটরিংয়ে রেখে পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপও নিতে হবে। সার্বিক পরিস্থিতিতে ওসি ও ইন্সপেক্টরদের থানার বাইরে থাকাসহ লোকবলের অভাবে মনিটরিং সমস্যার সমাধানে ডিউটি অফিসারের রুমে মনিটর রাখার সিদ্ধান্ত ভালো ফল দেবে বলে আশা করা যায়।
ছিনতাই, হত্যা, অপহরণ, মাদক কেনাবেচা, জমি দখল, ধর্ষণ, প্রতারণাসহ নানা অপরাধে পুলিশ সদস্যদের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ কমছে না। প্রতিদিনই আইজিপি ও পুলিশের সব ইউনিট প্রধানের কাছে অভিযোগ আসছে। সাড়ে ৪ বছরে ৬১ হাজারের বেশি অভিযোগ এসেছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কার্যকর হচ্ছে না। পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের নিষ্পত্তি হয় মূলত পুলিশের নিজস্ব আইন অনুযায়ী। অনেক ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধের বিচারও করা হয় বিভাগীয় আইনে। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের ‘বিভাগীয় শাস্তির আওতায়’ আনার কথা বলে আড়াল করার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত করে শাস্তি দেয় পুলিশ। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। উন্নত বিশ্বে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে আলাদা কমিশন করে তার বিচার করা হয়। বাংলাদেশেও এই ধরনের প্রথা চালু করলে পুলিশের অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে।
