সুপার শপের অতিমুনাফা

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৫৯ পিএম

মহামারীর পরপরই ও যুদ্ধের মধ্যেই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’য়ের মতো জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে নিত্যপণ্যের বাজার। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে চাল, আটা, লবণ, গুঁড়োদুধ, সবজিসহ সব ধরনের পণ্যের দাম কেজিতে ৩-৮০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে পরিবহন ও যাতায়াত খরচ। মুদ্রাস্ফীতির বাজারে সবকিছুতে ব্যয় বাড়লেও মানুষের আয় বাড়েনি। দরিদ্র আর নিম্নবিত্ত মানুষের খেয়েপরে টিকে থাকাই দায় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্ত মানুষ। বাজারের সবকিছুই দিন দিন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন খরচ কাটছাঁট করে চলতে হচ্ছে সবাইকেই। অভিযোগ উঠেছে, মূল্যস্ফীতির মধ্যেই দেশের সুপার শপগুলো খোলাবাজারের স্বাভাবিক দামের চেয়ে পণ্যের দাম বেশি রাখছে। আর সুপার শপগুলোর ক্রেতা সাধারণত মধ্য ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি। এই পরিস্থিতি সমাজে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে উদ্বেগ বাড়ছে।

বুধবার দেশ রূপান্তরে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খোলাবাজারের চেয়ে সুপার শপগুলোতে পণ্যের দামের ব্যবধান কখনো কখনো ২০-৩০ শতাংশ। অভিযানে দেখা গেছে, সুপার শপগুলোকে ডিমে ১৮-২২ শতাংশ, চালে ১৩-২৯ শতাংশ, লবণে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা করতে দেখা গেছে। একটি খোলা ডিমের ক্রয়মূল্য ৯ টাকা ১৮ পয়সা হলেও বিক্রি করা হচ্ছে ১০ টাকা। আর এক ডজন প্যাকেটজাত ডিমের ক্রয়মূল্য হলো ১৩৬ টাকা ৪০ পয়সা, কিন্তু বিক্রি করা হচ্ছে ১৫৫ টাকায়। তার মানে ডজনপ্রতি লাভ করা হচ্ছে ১৮ টাকা ৩ পয়সা। খোলা পণ্য প্যাকেটজাত হলেই তারা লাভ করে নিচ্ছে দ্বিগুণ। সুপার শপগুলোর অস্বাভাবিক মুনাফার প্রভাব পড়ছে খোলাবাজারে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষসহ যারা খোলাবাজার থেকে পণ্য কেনেন, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। উৎপাদক, ভেন্ডর ও সুপার শপের মালিকপক্ষকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের মহাপরিচালক (ডিজি) এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেছেন, পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছে, প্যাকেটজাত পণ্যের গায়ের দাম বাড়িয়ে দিতে বলে সুপার শপগুলো। ফলে দাম বৃদ্ধিতে তাদের হাত রয়েছে।

অন্যদিকে, সুপার শপ বা কোম্পানিগুলোর নানা অফারে লোভ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। এমন অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমরা কমবেশি পরিচিত। মূল্যস্ফীতির বাজারে এটাও একধরনের সমস্যা সৃষ্টি করছে। ফলে আমাদেরও ভোগের লাগাম টেনে ধরতে হবে। কিছু কেনার আগে আগে ভাবতে হবে, আসলেই সেটি প্রয়োজন কি না। বেশি কিনে মজুদ করে রাখলে দরকারের সময় আরেকজন সেটি পাবেন না। দুটি কিনলে পাঁচটি ফ্রি ধরনের লোভনীয় অফারের ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। লাগামহীন বিজ্ঞাপন ও চটকদার অফারের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা ও সচেতন করতে সরকারেরও পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। কারণ এধরনের ফাঁদে পড়ে মন্দার বাজারে মাসের শুরুতেই পকেট ফাঁকা হয়ে গেলে সমাজে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়, তার দায় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। বেশি দাম নিয়ে সুপার শপ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, তারা ‘প্রিমিয়াম’ পণ্য বিক্রি করেন, সে কারণে দামটাও ‘প্রিমিয়াম’ হচ্ছে। ভালো মান ও ভালো সেবা নিশ্চিত করতে তাদের পরিচালন ব্যয় বেশি, তবে তাদের পণ্যের মান ও সেবা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে নানা সময়ে। এ ছাড়া তারা ‘প্রমোশনের’ জন্য প্রতি মাসেই কিছু কিছু পণ্যে ছাড় দিয়ে থাকেন। সুপার শপ মালিকরা খোলাবাজার থেকে তাদের পণ্যের দামের ব্যবধানের কারণ হিসেবে ৫ শতাংশ বাড়তি ট্যাক্স প্রদানের কথা উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। পাশাপাশি তারা দাম বাড়ানোর জন্য খুচরা ব্যবসায়ীদেরও দায়ী করেন। যদিও ভোক্তা অধিকারের ডিজি সরাসরিই বলেছেন, সুপার শপগুলো পদে পদে প্রতারণা করছে। তাদের বিরুদ্ধে অতিমুনাফা, অন্যায্য ঘোষণাসহ ভোক্তা স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। প্রতারণা চিহ্নিত করতে সুপার শপগুলোর কে কত লাভে পণ্য বিক্রি করছে তা নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে, তাদের আরও সক্রিয় হতে হবে।

মহামারী ও যুদ্ধের প্রভাবে একদিকে কাজ হারানো কিংবা আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে বিগত কয়েক মাসের রেকর্ড মূল্যস্ফীতিতে পরিস্থিতি খুবই নাজুক। বাজারে নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের দামের উত্তাপ মানুষের গায়ে লাগছে। আর দেশের মানুষের অভিজ্ঞতা তো এই যে, আন্তর্জাতিক বাজার, জ্বালানি সংকটসহ নানা কথা বলে একশ্রেণির ব্যবসায়ী সবসময়ই মুনাফার পাঁয়তারা করে। কিন্তু দাম কমলে, সংকট নিরসন হলে তার সুফল পাওয়া যায় না। খোলাবাজারের সঙ্গে সুপার শপের পণ্যের দামের এই ব্যবধান কমাতে কাজ করতে হবে। কত দাম পর্যন্ত পণ্য বিক্রি করা যাবে সেটা নির্ধারণ করা দরকার। বিভিন্ন আমদানি পণ্য বাড়তি দামে বিক্রি করা হয় সুপার শপে। আমদানি পণ্যে যথাযথ তথ্য থাকে না, সেদিকে নজর রাখতে হবে। সাধারণ মানুষের সুরক্ষার প্রশ্নে সরকারকে অবশ্যই বাজার নিয়ন্ত্রণে জোর দিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত