জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনে যোগ দিতে ২০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে যাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর আগে আজ বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যে যাচ্ছেন সরকারপ্রধান। সেখানে তিনি চার দিন থাকবেন। প্রধানমন্ত্রীর নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটন সফরে র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমান কর্মকর্তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
গতকাল বুধবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর যোগদান নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এ কথা বলেন।
এদিকে শেষ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত ভারত থেকে বাদ পড়ার পর নিউ ইয়র্ক সফরে যাচ্ছেন কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে ড. মোমেন বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ যাচ্ছি। সবই ওপরওয়ালার ইচ্ছা।’ পাশাপাশি তিনি আরও বলেন, ‘হঠাৎ করে যদি কোনো অসুবিধা না হয়। কেউ কেউ বাড়ন্তভাবে কিছু বলে থাকেন। আশা করি তারা বিষয়টি বুঝবে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিখিত বক্তব্য বলেন, ‘আমিসহ শিক্ষামন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হব।’
র্যাবের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ড. মোমেন বলেন, ‘এ বিষয়টি আলোচনায় অবশ্যই আসবে। এটা আমরা সবসময় তুলি। আমরা কয়েক মাস ধরে এটা প্রতিনিয়ত তুলছি। এতে কোনো ব্যত্যয় হবে না।’ র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা যৌক্তিক কি না এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সেটা আমি জানি না। যারা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তারা কিছু লোক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিস্তারিত বক্তব্য দেননি যে কী কী কারণে নিষেধাজ্ঞাটি আরোপ করল।’ তিনি বলেন, ‘তারা মোটামুটি বলে দিয়েছেন যে, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু কী কারণে দিলেন, সেটি আমরা জানতে চাই। এটি হলে আমরা আরও ভালোভাবে বিষয়টি সম্পর্কে পদক্ষেপ নিতে পারতাম। কিন্তু তারা নির্দিষ্ট করে বলেননি, এ কারণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।’
গত বছর ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং এর সাবেক ও বর্তমান ছয় কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ নিষেধাজ্ঞা দেয়।
সফর সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী ২০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক যাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কাল (আজ) যুক্তরাজ্যে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে থাকবেন চার দিন। যুক্তরাজ্যে চার দিনের সফরের শেষ দিন সদ্য প্রয়াত ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। নিউ ইয়র্কের সফর শেষে তিনি ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থান করবেন।’
ড. মোমেন বলেন, ১৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের বিতর্ক পর্ব শুরু হবে। এ অধিবেশনে যোগদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ২০ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে পৌঁছবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধুকন্যা বাংলাদেশ এবং বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের বিষয়গুলো তুলে ধরবেন। প্রতিবারের মতো এবারও প্রধানমন্ত্রী বাংলায় বক্তৃতা দেবেন। তিনি তার বক্তব্যে বাংলাদেশের অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং প্রযুক্তি খাত বিকাশে সরকারের কার্যক্রম তুলে ধরবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।
ড. মোমেন বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হবে সে বিষয়টি এবং সংকট মোকাবিলায় একতরফা জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ কিংবা নিষেধাজ্ঞার মতো সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংকট সমাধানে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং বহুপাক্ষিকতাবাদকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে গুরুত্বারোপ করতে পারেন। করোনার মতো ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যে টিকা এবং প্রতিষেধকের ন্যায্য ও আরও ন্যায়সংগত বণ্টনের জন্য আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করতে পারেন তিনি। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে উপায় খুঁজে বের করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাতে পারেন। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের বলিষ্ঠ অবস্থান, সন্ত্রাস ও সহিংস উগ্রপন্থার বিষয়ে বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্স’নীতি, সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ অভিবাসন অভিবাসীদের মৌলিক পরিষেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব, জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিন সম্পর্কিত বিষয়সমূহ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসবে।
সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রোহিঙ্গা সমস্যা এবং টেকসই আবাসন বিষয়ে আলাদা দুটি সাইড ইভেন্ট আয়োজন করবে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট ২২ সেপ্টেম্বর হবে। প্রধানমন্ত্রী ওই সাইড ইভেন্টে অংশগ্রহণ করবেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসি সেক্রেটারিয়েট, কানাডা, সৌদি আরব, তুর্কি, গাম্বিয়া, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাবিষয়ক সাইড ইভেন্ট কো-স্পন্সর করবে। জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মহাপরিচালক সেখানে রোহিঙ্গা বিষয়ে ব্রিফ করবেন।
রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশসহ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা হবে কি না জানতে চাইলে ড. মোমেন বলেন, ‘আমরা এ ইস্যুটা তুলে ধরব। বিশ্ব সম্প্রদায়ের এ ব্যাপারে আরও জোর দেওয়া উচিত। কারণ এটার সমাধান তো হচ্ছে না।’
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত প্রত্যাবাসনকে অনিশ্চয়তায় ফেলছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেটা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বোঝা যাবে। হয়তো এটা আমাদের প্রত্যাবাসনে সাহায্য করতে পারে, আবার উল্টোটাও হতে পারে। উই ডোন্ট নো, আমরা সবসময় আশাবাদী।’
