হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি অনেক ব্যক্তি ও পরিবারের অসংখ্য অবদানে সমৃদ্ধ। এক্ষেত্রে প্রথমেই আসে রবীন্দ্রনাথ তথা জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অপরিমেয় অবদানের কথা। রবীন্দ্র পরিবারের কয়েক পুরুষের মেধা, শ্রম ও সাধনার পরশ বাঙালি সংস্কৃতির প্রায় প্রতিটি অঙ্গ ছুঁয়েছে; এ কথা শিক্ষিত বাঙালি মাত্র প্রায় সবারই জানা। কিন্তু পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের রংপুরের ‘কুন্ডি’ পরগনার জমিদার পরিবারের অসামান্য অবদানের কথা আজও অনালোচিত ও অনালোকিতই থেকে গেছে।
বাংলার অন্যান্য জমিদার বংশের মতো ‘কুন্ডি’ জমিদার বংশও কয়েক পুরুষ ধরে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হওয়ায় জমিদারির অংশ ভাগবণ্টন হয়ে যায়। সতেরো শতকের গোড়ায় এই জমিদারির প্রতিষ্ঠা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে রংপুর তথা বাংলার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিশাল অবদান রাখেন এই বংশের কয়েকজন ঋদ্ধিমান পুরুষ। পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন কুন্ডির পৌনে চার আনা অংশের জমিদার রাজমোহন রায়চৌধুরী (১৭৮৬-১৮৪৭)। তার উদ্যোগে রংপুরে ইংরেজি শিক্ষার নবযুগের সূচনা। কলকাতা থেকে শিক্ষক এনে তিনি নিজ বাড়িতে সন্তানদের ইংরেজি শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। তার উদ্যোগেই ১৮৩৬ সালে রংপুরে প্রথম ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন এবং ১৮৪০ সালে তার নেতৃত্বে ও অর্থ সাহায্যে রংপুরের কেন্দ্রস্থলে প্রথম দাতব্য চিকিৎসালয় রংপুর ডিসপেনসারি প্রতিষ্ঠিত হয় যা পরবর্তী সময়ে রংপুর সদর হাসপাতালে রূপান্তরিত হয়। প্রায় একই সময়ে বা কিছু আগে কুন্ডি পরিবারের আর এক জমিদার গঙ্গাধর রায়চৌধুরীর উদ্যোগে সদ্যপুষ্করিণী গ্রামেই জমিদার বাড়ির বহিরাঙ্গনে কুন্ডি ডিসপেনসারি নামে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠিত হয় যা বর্তমানে রংপুর সদর উপজেলার একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
১৮৫৪ সালে প্রথম পর্যায়ে একযোগে বাংলাদেশে চারটি প্রাচীন পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ‘রঙ্গপুর পাবলিক লাইব্রেরি’ অন্যতম; অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠিত হয় বরিশাল, যশোর ও বগুড়ায় (উডবার্ণ লাইব্রেরি)। কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৩৬ সালে। কিন্তু কুন্ডির জমিদার পরিবারের উদ্যোগে সদ্যপুষ্করিণী গ্রামেই প্রথম একটি পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৩২ সালে, যার আর্থিক ব্যয়ভার বহন করেন রাজমোহন রায়চৌধুরী। অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মনিরুজ্জামানের মতে, ১৮৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত রংপুর জেলার সদর থানার কুন্ডি সদ্যপুষ্করিণী গ্রামে প্রতিষ্ঠিত রঙ্গপুর পাবলিক লাইব্রেরি সমগ্র বঙ্গদেশেই নয় ভারতে প্রাচীনতম লাইব্রেরি বললেও অত্যুক্তি হবে না (রংপুরের ইতিহাস, পৃ. ৩৯৩, গতিধারা, ঢাকা)। ইংরেজি শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে রংপুরের স্থানীয় জমিদারদের আর্থিক সহায়তায় এবং তৎকালীন গভর্নর জেনারেল উইলিয়ম বেন্টিঙ্কের দ্বারোদঘাটনের মধ্য দিয়ে ১৮৩২ সালে রংপুর জিলা স্কুল (রঙ্গপুর জমিনদারস্ স্কুল) প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই স্কুল প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলের কু-ির জমিদাররা। স্কুলের সূচনাপর্বেই এর সেক্রেটারি নির্বাচিত হন কুন্ডির রাজমোহন রায়চৌধুরী এবং পরবর্তী সময়ে তার পরিবারের সদস্য যথাক্রমে কাশীচন্দ্র রায়চৌধুরী ও কালীচন্দ্র রায়চৌধুরী এই দায়িত্ব পালন করেন।
অবিভক্ত বাংলার দ্বিতীয় এবং বাংলাদেশের প্রথম প্রকাশিত সংবাদপত্র ‘রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ’র প্রতিষ্ঠাতাও রাজমোহন রায়চৌধুরী। ১৮৪৭ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত এই পত্রিকা মুদ্রণের জন্য সদ্যপুষ্করিণীতে তিনি নিজস্ব প্রেসও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৪৭ সালেই তার মৃত্যুর পর কুন্ডির সাত আনি জমিদার কালীচন্দ্র রায়চৌধুরী এই পত্রিকা প্রকাশের দায়ভার গ্রহণ করেন এবং ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়। পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্বে যথাক্রমে গুরুচরণ রায় ও নীলাম্বর মুখার্জী থাকলেও মূল দায়িত্ব পালন করতেন স্বয়ং কালীচন্দ্র রায়চৌধুরী। জমিদার কালীচন্দ্র রায়চৌধুরী (?-১৮৫৪) ছিলেন শিক্ষিত, মার্জিত, সংস্কৃতিমান ও আলোকপ্রাপ্ত মানুষ। তিনি ছিলেন একজন কবি এবং সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক। সমাজসচেতন মানুষ হিসেবে সমাজের নানান অসংগতি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এবং নারীশিক্ষার পক্ষে সংবাদ পরিবেশন ও প্রবন্ধ, নিবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের জন্য তিনি পত্রিকাটি পরিচালনা করেন। তিনি নারীশিক্ষার জন্য ১৮৪৭ সালে বা তার পূর্ববর্তী কোনো সময়ে কুন্ডির সদ্যপুষ্করিণী ও গোপালপুরের মধ্যবর্তী স্থানে একটি গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজ পরিবারের ইংরেজি শিক্ষিত মেয়েকে দিয়ে স্কুল পরিচালনা করেন। ছাত্রীর অভাবে পরবর্তী সময়ে তা সহশিক্ষার সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কুন্ডি হাই স্কুলে পরিণত হয়। বর্তমানে পরিবর্তিত স্থানে শ্যামপুর উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। এই সময়ে রংপুরের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে সমসাময়িক ব্রিটিশ আমলা ও গবেষক জে.এ. ভাস এবং মার্টিনের প্রতিবেদনে জানা যায়, সমাজে তখন এই কুসংস্কার প্রচলিত ছিল যে, কোনো শিক্ষিত নারীকে বিয়ে করলে স্বামীর অকাল মৃত্যু ঘটে। সমাজের এমন বৈরী মনোভাবের বিরুদ্ধে নারীশিক্ষার এমন সাহসী উদ্যোগ ছিল অতুলনীয়। এছাড়া তিনিই হচ্ছেন রংপুরের নারীশিক্ষা টেক্সট বুক প্রবর্তনের উদ্যোক্তা (জে.এ. ভাস ১৯১১, পৃ. ১৩৫)।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সামাজিক নাটক ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ যার রচয়িতা বিখ্যাত নাট্যকার রামনারায়ণ তর্করত্ন, এটি রচনা করেছিলেন কালীচন্দ্র রায়চৌধুরীর উৎসাহে এবং তার পত্রিকা ‘রঙ্গপুর বর্ত্তাবহ’তে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে ঘোষিত পঞ্চাশ টাকা পুরস্কারের প্রণোদনায়। কলকাতায় ১৮৫৭ সালের মার্চ মাসে এর প্রথম মঞ্চায়নে উপস্থিত ছিলেন এবং মুগ্ধ হয়েছিলেন স্বয়ং ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর। নারীর সতীত্ব ও পতিব্রতার ওপর একটি প্রবন্ধ রচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি ‘রঙ্গপুর বার্ত্তাবহে’ বিজ্ঞাপন দিয়ে পঞ্চাশ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন এবং প্রবন্ধটি পরবর্তী সময়ে ‘পতিব্রতোপাখ্যান’ নামে একটি পুস্তিকারূপে প্রকাশ করেন ১৮৫২ সালে। প্রবন্ধটি রচনা করেছিলেন কুন্ডি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ভীমলোচন সান্যাল।
গুপ্তকবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের (১৮১২-১৮৫৯) সমসাময়িক কবি ছিলেন কবি কালীচন্দ্র রায়চৌধুরী। অসামান্য কবি প্রতিভার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তার মাত্র দুটি কাব্য গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায় ‘স্বভাব দর্পণ’ ও ‘প্রেম রসাষ্টক’। এছাড়া তার পরিচালিত ‘রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ’ পত্রিকায় ‘বন্ধুলিখিত’ ও ‘বসন্ত দর্পণ’ নামে কবিতার কয়েকটি পর্ব তিনি ধারাবাহিক প্রকাশ করেছিলেন। কবি ঈশ্বরগুপ্ত কবি কালীচন্দ্রের কবিতায় মুগ্ধতা ও বন্ধুতার টানে একদা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য সুদূর কলকাতা থেকে রংপুরের (কুন্ডি) গোপালপুরে এসে তার আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। কবি কালীচন্দ্রের উৎসাহ ও প্রণোদনায় কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’ ও ‘শুরসুন্দরী’ কাব্য দুটি রচনা করেন এবং সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র ও নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রও প্রথম পর্যায়ে সাহিত্যচর্চা ক্ষেত্রে কালীচন্দ্র রায়চৌধুরীর দ্বারা উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। এসব তথ্যেই জানা যায় সাহিত্যিক ও সাহিত্য সংগঠক রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদের সম্পাদক সুরেন্দ্রচন্দ্র রায়চৌধুরী রচিত ও ৬ আষাঢ় ১৩০৮ সনের ‘রঙ্গপুর দিকপ্রকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ এবং রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় প্রকাশিত সভাপতির অভিভাষণ থেকে (১৩২২, সংখ্যা ১ম)। সম্প্রতি ২ জুলাই ২০২২ তারিখের কলকাতার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত শুভাশিস চক্রবর্তীর ‘উনিশ শতকের কবিচ্ছটা’ নিবন্ধ থেকে আরও জানা যায় যে, ১৮৫৩ সালের ১৪ মার্চ ঈশ্বরগুপ্ত ‘সম্বাদ প্রভাকর’-এ যে ঐতিহাসিক কবিতা প্রতিযোগিতার সূচনা করেছিলেন। এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন দীনবন্ধু মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও দ্বারকানাথ অধিকারী; সেখানেও পুরস্কার হিসেবে অর্থ পাঠিয়েছিলেন কালীচন্দ্র রায়চৌধুরী।
একই বংশের অন্য শরিকের জমিদার কালীমোহন রায় চৌধুরী (?-১৯১৩) ১৯০৬ সালে ‘মুন্সেফ’ হিসেবে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। তিনি ‘ছন্দবত শব্দসাগর’ নামে তিন খন্ডে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এ ছাড়া ‘স্মৃতিচিহ্ন’ নামে একটি বাংলা এবং ‘Short Sketches of Life of Kalimohan Raichowdhury’ ’ নামে ইংরেজি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। সাহিত্য সংগঠক, লেখক, গবেষক ও প্রত্নবস্তু সংগ্রাহক জমিদার মৃত্যুঞ্জয় রায়চৌধুরী (১৮৬৫-১৯৩৯) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতার একজন নিয়মিত সদস্য ও সংগঠক ছিলেন। তার সংগৃহীত অনেক প্রাচীন মুদ্রা তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদে গবেষণার জন্য হস্তান্তর করেন। নেপাল, আসাম ও খাসিয়া রাজাদের ৬টি দুর্লভ প্রাচীন মুদ্রা তিনি কলকাতা জাতীয় জাদুঘেের হস্তান্তর করেন। এছাড়া সে সময় মাসিক ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় তার অনেক বাংলা ও ইংরেজি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তিনিই প্রথম দ্বিজ কমললোচনের ‘চন্দ্রিকা বিজয়’ কাব্যটি (হরগোপাল দাস কুন্ডু কর্তৃক সংগৃহীত ও সম্পাদিত) নিজ উদ্যোগে প্রকাশ করেন। সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্মকে উৎসাহিত করার জন্য তিনি তার পিতার স্মরণে ‘গঙ্গাধর রৌপ্য পদক’ চালু করেন। কুন্ডি জমিদার বংশের সর্বশেষ কীর্তিমান পুরুষ ছিলেন সুরেন্দ্রচন্দ্র রায়চৌধুরী (১৮৭৬-১৯৪৫)। প্রেসিডেন্সি কলেজের গ্রাজুয়েট সুরেন্দ্র বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের একজন সক্রিয় সদস্য ও সংগঠক ছিলেন। তার উদ্যোগ ও প্রস্তাবনায় বাংলা ১৩১২ সনে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রথম শাখা রংপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি ছিলেন এর আজীবন সম্পাদক। সাহিত্য পরিষদের মুখপত্র ত্রৈমাসিক ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা’সহ সমসাময়িক অন্যান্য পত্রিকায়ও তার অনেক গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯১৪ সালে ‘ঢাকা জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার সময় রংপুরেও একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয় রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে। এই জাদুঘরের প্রত্নসম্পদ সংগ্রহের একটি বড় অংশ এসেছিল কু-ির জমিদার পরিবার থেকে এবং যার প্রধান উদ্যোগী ছিলেন সুরেন্দ্রচন্দ্র রায়চৌধুরী। এই জাদুঘরের দ্বারোদঘাটন করেছিলেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।
সুরেন্দ্রচন্দ্র তার জন্মগ্রাম এবং তার পাশর্^বর্তী এলাকায় বিভিন্ন বিদ্যালয় স্থাপনে আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তাসহ রংপুরে শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ১৯১৬ সালে কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠাকালে তিনি এবং তার ভাই মনীন্দ্রচন্দ্র রায়চৌধুরী মিলে মোট ৪১৯ বিঘা জমি দান করেন। তিনি ছিলেন কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক; ছিলেন পূর্ববাংলা পাঠ্যপুস্তক কমিটির সদস্য। উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনীর আজীবন স্থায়ী সম্পাদকসহ উত্তরবঙ্গ জমিদার সভার সম্পাদকও ছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। রংপুরের জমিদারদের নিয়ে জমিদারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে স্বল্পসুদে প্রজাদের ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করেন যা সাধারণ মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার পরিচয় বহন করে। কুন্ডি সদ্যপুষ্করিণী গ্রামে তিনি পিতামহের নামে ‘মধুসূদন পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে গড়ে ওঠা ‘সখের নাট্য সমাজের’ তিনি ছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা ও পৃষ্ঠপোষক। রংপুর অঞ্চলে কুটির শিল্পের উন্নয়নের জন্য তিনি প্রথমে কুন্ডিতে একটি ‘বয়ন বিদ্যালয়’ স্থাপন করেন। পরে উদ্যোগকে অনুসরণ করে রংপুর অঞ্চলে বেশকিছু বয়ন বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সুস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে ১৯২৬ সালে তিনি কুন্ডিতে পশুপালন ও দুগ্ধ উৎপাদনের জন্য একটি কেন্দ্র স্থাপন করেন এবং এর জন্য ৫০০ বিঘা জমি দান করেন যার তথ্য ১৩৩৩ সনের ১৩ই আশি^ন সংখ্যা ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকার মুদ্রিত খবরে জানা যায়। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বাংলাভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়নে কুন্ডি জমিদার পরিবারের এই অসামান্য অবদান হয়তো ইতিহাস একদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে এই আমাদের বিশ্বাস।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও গবেষক
