আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে পাঁচ মাপকাঠি ঠিক করেছে ইসি। আর পাঁচগুণের সমন্বয়ে নির্বাচন করার পথে ১৪টি চ্যালেঞ্জ দেখছে ইসি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ১৯টি পথও খুঁজে বের করেছে তারা। বিশ্লেষকরা মনে করেন, কমিশন যদি সব রাজনৈতিক দলকে আস্থায় আনতে না পারে তবে সব আয়োজন ব্যর্থ হবে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের একটাই উদ্দেশ্য, অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ-গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা। জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবিব খান গত মঙ্গলবার নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণার সময় বলেছেন, ‘আমরা অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন এবং আমরা অনেক আস্থাশীলতার ঘাটতির মধ্যে আছি। আমাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে প্রমাণ দিয়েছি, আমরা কিছুটা হলেও আগে থেকে আস্থা অর্জনে এগিয়ে গেছি। আমাদের হাতে এখন অনেক সময় আছে। আশা করি এর মধ্যে সবার আস্থা অর্জন করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে। এ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে নিজেদের জবাবদিহিতা ও বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতাও বাড়বে।’
এবারের রোডম্যাপে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে ইভিএম নিয়ে। শুরু থেকে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার রাজনৈতিক ও কারিগরিভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। রাজনৈতিক ঐকমত্য না হওয়ায় গত জাতীয় নির্বাচনে খুব অল্পসংখ্যক আসনে ইভিএমে ভোট হয়েছে। ইভিএমে বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তকরণের সুবিধা ছিল না। আবার বর্তমানে যে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে ভোটার ভেরিয়েবল অডিট ট্রেইল (ভিভিপিএটি) সুবিধা নেই। এটাই বিরোধী দলের আপত্তির অন্যতম কারণ।
এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। রোডম্যাপের বিষয়ে আওয়ামী লীগ বলেছে, নির্বাচন আয়োজনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো। অন্যদিকে তার মিত্র কয়েকটি দলের নেতারা বলেছেন, এটা সাধারণ ঘোষণা মাত্র। কিন্তু বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপি বলছে, এ রোডম্যাপ মূল্যহীন। এ ছাড়া দেশের ৩৯ বিশিষ্ট নাগরিক যৌথ বিবৃতিতে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, রোডম্যাপ ঘোষণার মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন আগামী নির্বাচন নিয়ে তাদের কাজের কথা বলেছেন। এটি সাধারণ ঘোষণা মাত্র।
অন্য শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, এটাই শেষ বা চূড়ান্ত কিছু নয়। এখানে অনেক কিছুই পাল্টাবে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি কমিশনের রোডম্যাপ। ফলে আরও অপেক্ষা করতে হবে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমরা বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে মানি না, তাহলে রোডম্যাপ দিয়ে কী হবে।’
তবে ইভিএম কেন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যবহার হবে তারও ব্যাখ্যা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তাদের দাবি, ইভিএমে কোনো প্রকার জাল-জালিয়াতির সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত কেউ তার প্রমাণ দিতে পারেনি। ব্যালটে ভোট হলে কেন্দ্র দখল করে ভোটের আগে-পরে ইচ্ছামতো বাক্সে ব্যালট ভর্তি করা সম্ভব। কিন্তু ইভিএম ব্যবহারে সে সুযোগ থাকছে না।
এ যুক্তি মানতে নারাজ সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তার মতে, ‘ইভিএম কারিগরি দিক থেকে দুর্বল একটি যন্ত্র। আর এই ত্রুটি কাজে লাগিয়ে কমিশনের অধস্তন কোনো কর্মকর্তা, কারিগরি টিম এবং নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের পক্ষে নির্বাচনে কারসাজি করা সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘এর আগে দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হয়েছে। সেখানে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। একই ব্যবস্থায় নির্বাচনের জন্য যে রোডম্যাপ বর্তমান নির্বাচন কমিশন প্রকাশ করেছে, তাতে মনে হচ্ছে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আগের দুটি নির্বাচনের মতো আরও একটি নির্বাচন আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে।’
জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন করবেন এটাই প্রত্যাশা সবার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তারা যে প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন করতে চায়, মানে সংলাপের মাধ্যমে। এখন তারা তাদের মতো করে সংলাপ আহ্বান করলেন, কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। তখন সংকট আরও বাড়বে। রাজনৈতিক সমস্যা দলগুলোর মধ্যে আলোচনা করে সমাধান করতে হবে। নির্বাচন কমিশন প্রত্যক্ষ স্টেকহোল্ডার নয়।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনের (সিইসি) অনুপস্থিতিতে রোডম্যাপ ঘোষণা করা ঠিক হয়নি উল্লেখ করে জানিপপ চেয়ারম্যান বলেন, ‘সিইসি যেহেতু অসুস্থ, তারা আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে পারতেন। সময় তো শেষ হয়ে যায়নি। কমিশনের তো একটা ভাবমূর্তি আছে। এটি একটি দৃষ্টিকটু কাজ হয়েছে। ভবিষ্যতে কমিশন এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকবে এটাই প্রত্যাশা।’
নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, ‘রোডম্যাপ ট্র্যাডিশন চালু হয়েছে ড. একেএম শামসুল হুদা যখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কমিশন তা প্রকাশ করে আসছে। এটা ভালো উদ্যোগ। এ রোডম্যাপ তারা যদি পরিচালনা করতে সক্ষম হন, তাহলে আমার ধারণা, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম গতিশীলতা পাবে। কিন্তু সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন যদি আয়োজন করতে না পারে তাহলে যত কিছুই আয়োজন করুক সমস্যা থেকেই যাবে।’
গতকাল আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে টিআইবি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘গত দুটি সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি দলের একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলো অংশ না নিলে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। নির্বাচনকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়ে রূপরেখা চূড়ান্ত করতে হবে। যে নামেই নির্বাচনকালীন সরকার হোক, তা স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত ও নিরপেক্ষ হতে হবে। মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের স্বপদে থেকে নির্বাচন করার বিষয়টি রহিত করতে হবে।’
