রুপালি পর্দায় বিপ্লব ঘটানো এক পরিচালক

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:৫৮ এএম

ফরাসি নবতরঙ্গের অন্যতম অগ্রদূত জঁ-লুক গদার। পঞ্চাশের দশকে ফ্রাসোয়াঁ ত্রুফো, অদ্রেঁ বাজাঁ, গদারসহ কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রচলিত ব্যাকরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। ১৯৬০ সালে গদার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ব্রেথলেস সিনেমার ইতিহাস পাল্টে দেয়। মহান এই শিল্পী ১৩ সেপ্টেম্বর শেষ ‘কাট’ বলে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া    

গদারের বিদায়

ব্রেথলেস, কনটেম্পটের মতো ক্লাসিক চলচ্চিত্রের স্রষ্টা জঁ-লুক গদার গত মঙ্গলবার স্বেচ্ছায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। ফরাসি নবতরঙ্গের গডফাদার হিসেবে খ্যাত এই পরিচালকের মৃত্যুতে বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তার অসংখ্য ভক্ত ও সিনেমাবোদ্ধারা। বিংশ শতকে চলচ্চিত্র জগতে মৌলিক কাজের মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলা গদার শেষ সময়ে নীরবেই বিদায় নেন। ১৩ সেপ্টেম্বর গদারের মৃত্যু সম্পর্কে তার পার্টনার সুইস ফিল্মমেকার অ্যানি-মেরি মিভিল ও প্রযোজকরা জানান, নিজ বাড়িতে প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে মৃত্যুকে স্বাচ্ছন্দ্যে আলিঙ্গন করেন গদার। তাকে দাহ করা হবে এবং কোনো অনুষ্ঠান হবে না। ফরাসি পত্রিকা লিবারেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাসিস্টেড সুইসাইডের (অন্যের সহায়তায় আত্মহত্যা) মাধ্যমে শেষ বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ৯১ বছর বয়সী গদার। সিনেমার গণ্ডিকে অসীমের দিকে ঠেলে দেওয়া গদার দশকের পর দশক অনুপ্রেরণা জোগান বিশ্বের অসংখ্য চলচ্চিত্রশিল্পীদের। মার্টিন স্করসেজি, কোয়েন্টিন তারান্টিনোর মতো মেধাবী নির্মাতা থেকে শুরু করে বিশ্বের কত-শত চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীর যে তিনি অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়, তার ইয়ত্তা নেই। চলচ্চিত্রের ভাষা ও ন্যারেটিভের গতানুগতিক প্রথাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছিলেন ফরাসি চলচ্চিত্রের ‘ঈশ্বর’ গদার। হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরা, জাম্প কাট ও অস্তিত্ব সম্পর্কিত সংলাপের মাধ্যমে তিনি নির্মাণ করেন চলচ্চিত্রের নতুন ভাষা। তাইতো ষাটের দশকে সাফল্যের শিখরে ওঠা ফরাসি এই পরিচালক ন্যারেটিভ সম্পর্কে বলতে পেরেছিলেন, ‘চলচ্চিত্রের কাহিনীতে সাধারণত শুরু, মধ্যম ও শেষ থাকে। তবে সবসময় এই ক্রম মানতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।’ 

ফরাসি নবতরঙ্গ

চলচ্চিত্র সমালোচনার মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করেন গদার। পঞ্চাশের দশকের কিংবদন্তি ফরাসি চলচ্চিত্র ম্যাগাজিন কাইয়ে দ্যু সিনেমার চলচ্চিত্র সমালোচক ছিলেন তিনি। ১৯৬০ সালে গদার নির্মিত ব্রেথলেস দেখে নির্বাক হয়ে পড়েন চলচ্চিত্র সমালোচকরা। এ কেমন ভাষা, কেমন সম্পাদনা রে বাবা! ফরাসি নবতরঙ্গ সৃষ্টিতে কেবল গদারের হাত ছিল, এমনটা নয়। ফ্রাসোয়াঁ ত্রুফো, ক্লদ শেব্রল, অ্যাগনেস ভার্দা, এরিক খোমার, জ্যাক রিভেতসহ কয়েকজন ফরাসি পরিচালক সে সময় তাদের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, এই নবতরঙ্গ আসলে কী? এটি মূলত পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে ফ্রান্সে কয়েকজন চলচ্চিত্রকর্মীর অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা আর্ট ফিল্ম মুভমেন্ট। অদ্রেঁ বাজাঁ, গদার, ত্রুফো, খোমার, শেব্রল, রিভেত ওই আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। অদ্রেঁ বাজাঁ ছিলেন ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত কাইয়ে দ্যু সিনেমার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। চলচ্চিত্রের প্রচলিত রীতি ছুড়ে ফেলে সে জায়গায় নিরীক্ষাধর্মী কাজ করাই ছিল নবতরঙ্গের লক্ষ্য। এর জন্য ত্রুফো, গদাররা নতুন ধারার সম্পাদনা, ন্যারেটিভ ও নির্মাণশৈলী চলচ্চিত্র পর্দায় হাজির করেন। দেশের ভেতরে ও বাইরে চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা উঠে আসে ওই আন্দোলনকর্মীদের চলচ্চিত্রে। ফরাসি নবতরঙ্গকে বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

চলচ্চিত্রে গদারের প্রধান অবদান ছিল তার চিন্তা। তিনি মনে করতেন, একটি চলচ্চিত্রে দুটি গল্প থাকে। একটি গল্প বলে চলচ্চিত্রটি নিজে। আর অন্য গল্প হলো সেই চলচ্চিত্রেরই গল্প। কীভাবে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছে, দর্শকরা তা দেখে কী বুঝেছে সেটাই হচ্ছে দ্বিতীয় গল্প। গদারের সব কাজ চলচ্চিত্রকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে গদার প্রায় ৭০টি ফিচার ফিল্ম, ডকুমেন্টারি ও শর্টফিল্মের নির্দেশনা দেন। তার লেখালেখি, সাক্ষাৎকার, সংবাদ সম্মেলন থেকে শুরু করে নিজের সিনেমার সংলাপ, ভয়েসওভারে সমাজের বিভিন্ন বিষয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক মন্তব্যও পাওয়া যায়। ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গোল, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, পুঁজিবাদ থেকে শুরু করে হেন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে গদার কথা বলেননি। এমনকি সমসাময়িক নির্মাতাদের কাজ নিয়েও কড়া সমালোচনা করতে দেখা গেছে তাকে। ফরাসি নবতরঙ্গের অন্যতম অগ্রদূত ও সহযোদ্ধা পরিচালক ফ্রাসোয়াঁ ত্রুফোকেও সত্তরের দশকে জনসম্মুখে ধুয়ে দিতে পিছপা হননি গদার। চলচ্চিত্র নিয়ে তার অনেক বিখ্যাত উক্তির একটি ছিল ১৯৬৩ সালে তার নির্মিত থ্রিলার ফিল্ম দ্য লিটল সোলজারে। সেখানে ভয়েসওভারে বলা হয়, ‘ফটোগ্রাফি সত্য আর চলচ্চিত্র সেকেন্ডে ২৪ গুণ বেশি সত্য।’   

ব্রেথটেকিং ব্রেথলেস

গদারের একটি চলচ্চিত্রই তাকে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে দেয়, এমনটা বললে অতিরঞ্জিত হবে। তবে এটা ঠিক, ১৯৬০ সালে তার প্রথম ফিচার ফিল্ম ব্রেথলেস চলচ্চিত্র শিল্পের আকাশে বিকট শব্দের বজ্রপাত ছিল। ব্রেথলেস বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি চলচ্চিত্রের একটি যা সিনেমার ইতিহাসকে পাল্টে দেয়। ব্রেথলেসের কাহিনী তেমন আহামরি কিছু নয়। মিশেল পইকা নামের এক অপরাধী পেট্রিশিয়া ফ্রানচিনি নামে প্যারিসে বাস করা আমেরিকান শিক্ষার্থীর প্রেমে পড়েন। মিশেল যা অসম্ভব, তা নিয়ে স্বপ্ন দেখেন আর প্যাট্রিশিয়া যা সম্ভব তাই ভাবতে ও করতে পছন্দ করেন। একপর্যায়ে মিশেলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন প্যাট্রিশিয়া। পুলিশ মিশেলকে গুলি করে। মৃত্যুর সময় মিশেলের উপলব্ধি হয়, তার সঙ্গে যা হয়েছে, তা জঘন্য। এই জঘন্য শব্দের অর্থ তার বাগদত্তা প্যাট্রিশিয়া বুঝতে অক্ষম। গল্প সাধারণ হলেও ব্রেথলেসের চমক ছিল অন্য জায়গায়। ভাষা, মৃতদেহ ও আত্মার স্বাধীনতাকে পুনরায় উপলব্ধি করা, অভিনব সম্পাদনা বিশেষ করে জাম্প কাটের ব্যবহার একদিনে যেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের বয়স অনেক কমিয়ে দেয়। গদারের ব্রেথলেসে আমেরিকান পরিচালক নিকোলাস রে, ইতালির পরিচালক রোবের্তো রোজেলিনি, ফরাসি ফিল্মমেকার জঁ রুশ ও সুইডিশ নির্মাতা ইঙ্গমার বার্গম্যানের প্রভাব ছিল। ব্রেথলেসের এক বছর আগে ১৯৫৯ সালে ফরাসি পরিচালক ফ্রাসোয়াঁ ত্রুফো দ্য ফোর হানড্রেড ব্লোজ নির্মাণ করলেও তা নবতরঙ্গের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র ছিল না। বরং ফরাসি নবতরঙ্গের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে ব্রেথলেসকেই বিবেচনা করা হয়। কারণ ব্রেথলেসে গদার যে ফর্ম উদ্ভাবন করেন, তা নবতরঙ্গের অন্তর্নিহিত বক্তব্যকে সবচেয়ে বেশি কার্যকরভাবে ধারণ করতে পেরেছিল। ব্রেথলেস সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র সমালোচক প্রয়াত রজার এবার্ট বলেছিলেন, ‘আধুনিক সিনেমার যাত্রা শুরু হলো। ১৯৪১ সালে মার্কিন পরিচালক অরসন ওয়েলস নির্মিত সিটিজেন কেইনের পর আর কারোর প্রথম ফিল্ম এত শক্তিশালী হয়নি।’      

ব্রেথলেসের স্বীকৃতি গদার এমন সময়ে পান, যখন তার জীবন অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। ছোটবেলা থেকেই প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠেন তিনি। ১৯৩০ সালে ফরাসি-সুইস উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া গদার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা আঁচ করতে পারেন। যুদ্ধের পর তিনি জানতে পারেন, তার দাদা যুদ্ধে শত্রুপক্ষের সহযোগী ছিলেন। এটি জানার পর বিক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন গদার। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার দুর্ব্যবহার দিনকে দিন বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে তাকে পরিবার থেকে বের করে দেওয়া হয়। এমনকি ১৯৫৪ সালে মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়ও তাকে উপস্থিত থাকতে নিষেধ করা হয়। পরিবার থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর ফ্রান্সের সিনেমাপ্রেমী অহি লংলুয়া, চলচ্চিত্র সমালোচক অদ্রেঁ বাজাঁ ও ফরাসি ম্যাগাজিন কাইয়ে দ্যু সিনেমার লেখকদের সান্নিধ্যে আসেন গদার। এদের নিয়েই একপর্যায়ে গদারের দ্বিতীয় পরিবার গড়ে ওঠে। নবতরঙ্গে গদারের এই দ্বিতীয় পরিবারের সদস্যদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। অবশ্য ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে দ্বিতীয় পরিবারের সঙ্গেও সম্পর্কে অবনমন ঘটে গদারের।

বিপ্লবী গদার

ফরাসি নবতরঙ্গের অনস্বীকার্য নান্দনিক ও মতাদর্শিক বিজয় খুব বেশিদিন উদযাপন করতে পারেননি এর প্রধান সারথীরা। বক্স অফিসে নবতরঙ্গের ছবি হিট ছিল না। এ ছাড়া কয়েক বছর না যেতেই এই আন্দোলনের যোদ্ধারা নিজেদের ঐক্য ধরে রাখতে না পেরে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করা শুরু করেন। ফরাসি পরিচালক ফ্রাসোয়াঁ ত্রুফো ও ক্লদ শেব্রলের সংস্কারপন্থি চিন্তা এবং আন্দোলন থেকে এরিক খোমার ও জ্যাক রিভেত সরে যাওয়ায় নবতরঙ্গের যাত্রার পথিক হিসেবে গদার একাই রয়ে যান। তিনি জানতেন, তার এই নিঃসঙ্গ যাত্রায় ঝুঁকি আছে। তা সত্ত্বেও ষাটের দশকে রুপালি পর্দায় ঘটানো বিপ্লব থেকে কেটে পড়েননি তিনি। বলতে গেলে এটাই গদারের নিয়তি ছিল। বিজয়ের স্বাদ ও চরম হতাশা, বিশাল স্বপ্ন ও তা বাস্তবায়নে হোঁচট খাওয়া এসব তার জীবনে সমান্তরালভাবে অবস্থান করত। এ এমন এক ব্যক্তির গল্প যিনি কখনোই পরিবারের আশা ছাড়েননি। একই সঙ্গে সেই ব্যক্তি এও জানতেন, পরিবারের স্বপ্ন তার কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।

মেধাবী নির্মাতা হিসেবে গদার যখন সাফল্যের চূড়ায় অবস্থান করছেন, তিনি তখন সেই চূড়া থেকে নামার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। গদারের যুগ কেবল ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের বিস্ফোরণই দেখেনি, একই সঙ্গে এটি সামষ্টিক কাজে ব্যক্তিসত্তার বিলোপও প্রত্যক্ষ করে। দ্বিতীয় ঘটনা ফরাসি এই পরিচালককে সামষ্টিক চলচ্চিত্র ফার ফ্রম ভিয়েতনাম নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৬৭ সালের প্রামাণ্যচিত্র ফার ফ্রম ভিয়েতনাম নির্মাণে গদার ছাড়াও ছিলেন জরিস ইভেন্স, উইলিয়াম ক্লেইন, ক্লদ লেলুচ, আগ্নেস ভার্দা, ক্রিস মারকার ও অ্যালা খেনির মতো পরিচালকরা। ওই প্রামাণ্যচিত্রে সে সময়ে ফ্রান্সের এক শহরে চলমান শ্রমিক ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানানো হয়।

১৯৬৮ সালের মে মাসে পুঁজিবাদ, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, ভোগবাদ ও প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক আকারে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মে ৬৮ নামে পরিচিত আন্দোলনটি চলাকালে দেশটির বামপন্থিরা বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কারখানা দখল করে। ওই আন্দোলন চলে প্রায় সাত সপ্তাহ ধরে। মে ৬৮ আন্দোলনসহ ফ্রান্সের অন্যান্য রাজনৈতিক বিষয়ে ওই বছরই স্বল্পদৈর্ঘ্যরে ৪১টি প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে সিনেট্র্যাক্টস নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। ৪১টি প্রামাণ্যচিত্র যেসব ফরাসি পরিচালক বেনামে নির্মাণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে গদারও ছিলেন। একই বছরে মে ৬৮ আন্দোলনে শ্রমিক ও ছাত্রদের ভূমিকা নিয়ে গদার নির্মাণ করেন বিশ্লেষণধর্মী প্রামাণ্যচিত্র এ ফিল্ম লাইক এনি আদার।                

মে ৬৮ আন্দোলনের ব্যর্থতা গদারের চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনায় ব্যাপক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, চলচ্চিত্র শিল্পের নিয়ম মেনে তিনি আর চলচ্চিত্র বানাবেন না। সোভিয়েত ইউনিয়নের ডকুমেন্টারি ফিল্মের অগ্রদূত ও চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক জিগা ভেরতভের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সক্রিয় বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মী ও চলচ্চিত্র পরিচালক জঁ-পিয়ের গরিনের সঙ্গে মিলে ১৯৬৯ সালে জিগা ভেরতভ গ্রুপ গঠন করেন গদার। এই গ্রুপের সদস্যরা জার্মান নাট্যতাত্ত্বিক বের্টল্ট ব্রেখটের ফর্মে জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্ক্সসের মতাদর্শ অনুসরণ করে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। ব্রেখটের মতোই গদার দর্শকদের স্বস্তি দিতেন না। ব্রেখট ও গদার দুজনই চাইতেন, দর্শকরা যেন তাদের কাজ নিয়ে ভাবে, চিন্তা করে। কৃত্রিম কোনো কিছু মঞ্চে বা পর্দায় দেখানো হচ্ছে, এটা যাতে দর্শকরা প্রতিনিয়ত অনুধাবন করতে পারে, এজন্য বেশ কয়েকটি পদ্ধতি ব্যবহার করতেন এই দুই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তি। মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট আদর্শে উদ্বুদ্ধ গদার সত্তর ও পরবর্তী দশকে নির্মাণ করেন একের পর এক চলচ্চিত্র। তার সেসব ছবি স্বাভাবিকভাবেই তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। তা ছাড়া ফ্রান্সের টেলিভিশনে গদারের অ্যাক্টিভিস্ট ফিল্ম দেখানোও হতো না। তার নাম-যশ ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করে। সে সময় চরম একাকিত্বে ভোগেন তিনি। বেশ কয়েকবার আত্মহত্যারও চেষ্টা করেন। সে সময়ের পরিস্থিতি নিয়ে শেষের দিকের এক সাক্ষাৎকারে গদার বলেছিলেন, ‘আমি অবাধ্য ছিলাম, নিয়ম ভাঙতে পছন্দ করতাম, কিন্তু চলচ্চিত্রের ভেতরে বাস করতাম।’

সোভিয়েত পরিচালক সের্গেই আইজেনস্টাইন, মার্কিন পরিচালক চার্লি চ্যাপলিন ও ডেভিড ওয়ার্ক গ্রিফিথের মতো চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ পরিবর্তন করেছিলেন গদার। তার কোনো চলচ্চিত্রই অস্কার মনোনয়ন পায়নি, জেতা তো পরের কথা। তবে ২০১০ সালে তাকে তার সমগ্র কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মানজনক অস্কার দেওয়া হয়। এই পুরস্কার নিতে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে যাননি গদার। তিনি বলেছিলেন, ‘মার্কিন মুলুকের ভিসা আমার নেই। আমি আবেদনও করিনি। এত দূর যাওয়ার ইচ্ছেও আমার নেই। আর কেনই বা যাব? অস্কার পুরস্কার আমার কাছে কিছুই নয়। অস্কার কর্র্তৃপক্ষ যদি আমাকে পুরস্কার দিতে চায়, তারা দিতে পারে, এটা তাদের ব্যাপার। তবে আমার কাছে বিষয়টি অদ্ভুত লেগেছে। অস্কার কর্র্তৃপক্ষ আমার কোন ছবি দেখেছে? তারা কি আদৌ আমার কোনো ছবি দেখেছে? পুরস্কারটিকে দ্য গভর্নরস অ্যাওয়ার্ড বলা হচ্ছে। আমি যদি পুরস্কার নিতে ক্যালিফোর্নিয়ায় যাই, তাহলে কি আমাকে সেটি আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের হাত থেকে নিতে হবে?’ হলিউডি ফিল্মের জনপ্রিয় অভিনেতা আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার সে সময় ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর। গদার অস্কার নিতে না যাওয়ায় তার পুরস্কারটি সুইজারল্যান্ডে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন আয়োজকরা। কেবল অস্কার নয়, কান, বার্লিন, ভেনিসের মতো সম্মানজনক চলচ্চিত্র উৎসব গদারের ছবি নিয়ে যে খুব বেশি উচ্ছ্বসিত ছিল, এমনটা বলা যাবে না। তিনি অবশ্য কখনো পুরস্কার বা বক্স অফিসের হিটের জন্য মরিয়া ছিলেন না। তারিফের কাঙালও ছিলেন না। খ্যাতির শীর্ষে ওঠার ফর্মুলা তিনি জানতেন কিন্তু সেসব কখনো প্রয়োগ করেননি। পুরস্কার বা স্বীকৃতি নয়, গদারের নির্মিত চলচ্চিত্রই তার সম্পদ, শক্তি। তিনি তার সৃষ্টির মধ্য দিয়েই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বেঁচে আছেন, থাকবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত