বাংলাদেশের মেয়েরা ফুটবলে সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় দেশজুড়ে চলছে উৎসবের আমেজ। তবে ময়মনসিংহের কলসিন্দুর গ্রামে সেই উৎসব যেন ছাড়িয়ে গেছে অন্য সবাইকে। কারণ জয়ী দলের আটজন মেয়েই যে এ গ্রামের। তাদের পরিবারেও চলছে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। উদ্বেলিত ফাইনালে জোড়া গোল করা কৃষ্ণা রানী সরকারের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার দক্ষিণ পাথালিয়া। সাফজয়ী দলের তিন নারী ফুটবলার ছাড়াও একজন কোচ ছিলেন খাগড়াছড়ির। পাহাড়ের এ জেলাটির বাসিন্দাদের আনন্দ ছাড়িয়ে গেছে পাহাড়ের উচ্চতা।
ফুটবলের কল্যাণে সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিত নাম কলসিন্দুর। ওই গ্রামের বেড়ে ওঠা আট নারী ফুটবলার খেলছেন জাতীয় দলে। নারী ফুটবল দলের কোনো খেলা থাকলে অধীর আগ্রহ নিয়ে টিভির সামনে বসে থাকেন ফুটবল ভক্ত-সমর্থকরা। তার ব্যতিক্রম ঘটেনি গত সোমবারও। দক্ষিণ এশিয়ার সাফ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচে কলসিন্দুরবাসীর মনে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। খেলায় জয় পাওয়ায় কলসিন্দুর তথা ধোবাউড়া উপজেলায় আনন্দের বন্যা বইয়ে যায়। সাফের ফাইনালে অংশ নেওয়া ওই ১১ জনের মধ্যে ছয়জনই ছিলেন ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। এ গ্রামের সানজিদা আক্তার, মারিয়া মান্ডা, শিউলি আজিম, মার্জিয়া আক্তার, শামসুন্নাহার সিনিয়র, শামসুন্নাহার জুনিয়রÑ এ ছয় নারী খেলোয়াড় খেলায় অংশ নেওয়ায় আনন্দ ধরে রাখতে পারছেন না খেলোয়াড়দের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা।
এ জয়ে উচ্ছ্বসিত ফুটবল তারকা সানজিদা আক্তারের বাবা জয়ের আনন্দে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘বাবা হিসেবে আমি গর্বিত। আজ আমার আনন্দের শেষ নেই। দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে মেয়েগুলো। এ আনন্দ প্রকাশের ভাষা জানা নেই।’
ফুটবলার মার্জিয়ার বাবা আবদুল মোতালেব বলেন, ‘আমার মেয়ে যখন ফুটবল খেলত, তখন এলাকাবাসী সবাই বাঁকা চোখে দেখত। এখন আমার মেয়ের সাফল্যে এলাকার ওই লোকজনই সবচেয়ে বেশি খুশি। তারা এখন আমাকে এবং আমার মেয়েকে সম্মান দিয়ে কথা বলছে।’
শামসুন্নাহার জুনিয়রের বাবা নেকবর আলী বলেন, ‘আমার মেয়েসহ কলসিন্দুরের অন্য নারী ফুটবলার তাদের যোগত্যা প্রমাণ দিয়ে সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এ জয়ে গ্রামের সবাই আনন্দিত।’
কলসিন্দুরের এসব ফুটবল তারকার স্থানীয় কোচ জুয়েল মিয়া বলেন, ‘কলসিন্দুরের অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে খুদে ফুটবলারদের নিয়মিত অনুশীলন চলছে। আজকের এ শিরোপা জয় নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের উৎসাহ জোগাবে।’
নারী ফুটবলারদের এ সাফল্যে কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও কলসিন্দুর নারী ফুটবল দলের টিম ম্যানেজার মালা রানী সরকার বলেন, ‘মেয়েদের জয়ে আমরা অনেক অনেক আনন্দিত; এ জয় আমাদের মেয়ে এবং ছেলেদের জন্য আগামী দিনে বিশ্বজয়ের জন্য অনুপ্রেরণা জোগাবে। আমরা আগামীর জন্য খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রে ছেলে এবং মেয়ে দুটি ফরম্যাটেই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, ‘আমাদের ধোবাউড়ার মেয়েরা ভালো খেলে জিতেছে, এতে আমরা আনন্দিত। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবসময় কলসিন্দুর মেয়েদের খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করি। এ জয়ের কারণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওদের জন্য কিছু করার চিন্তাভাবনা করছি।’
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতায় খুশির জোয়ার বইছে বাংলাদেশের ফরোয়ার্ড কৃষ্ণা রানী সরকারের টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে। ছোট-বড় সবার মাঝে বইছে আনন্দের জোয়ার। নিভৃত পল্লী গ্রামের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে শুধু ফুটবল খেলার খবর। সবাই গর্ব করে বলে বেড়াচ্ছে, তিন গোলের মধ্যে দুই গোলই করেছে আমাদের কৃষ্ণা। যারা একসময় কৃষ্ণার ফুটবল খেলাকে সমালোচনা করত, তারাই এখন প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
নানা প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে অবিচল লক্ষ্য, অদম্য মনোবল, প্রবল ইচ্ছা ও দৃঢ়সংকল্পকে সঙ্গী করে কৃষ্ণা রানী পাড়ি দিয়েছে স্বপ্নপূরণের পথ। তবে বাড়িতে লোডশেডিং থাকায় তার মা নমিতা রানী সরকার মেয়ের খেলা দেখতে পারেননি। বাবা খেলা দেখেছেন অন্য গ্রামে গিয়ে। বোনের ভালো খেলার জন্য ভাই পলাশ সারা দিন উপবাস ছিলেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পারভেজ মল্লিক বলেন, ‘কৃষ্ণা এখন বাংলাদেশের গর্ব। বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের মাধ্যমে তার উত্থান শুরু। দেশে ফেরার পর আমরা তাকে সংবর্ধনা দেব। কৃষ্ণার মাকে রতœগর্ভা সম্মাননা দিয়েছি।’
সাফ ফুটবলে নারী ফুটবল দল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে খাগড়াছড়িতেও। এ অর্জনে গর্বিত খাগড়াছড়িবাসীও। এই দলে খাগড়াছড়ির তিন নারী ফুটবলার ছাড়াও একজন কোচ অংশগ্রহণ করায় খুশি খাগড়াছড়িবাসী। গতকাল মঙ্গলবার সকালে আনাই আনুচিংদের বাড়িতে গেলে তা বাবা-মা জানান, জয়লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে আনুচিং মেয়ে তাদের জয়ের বিষয়টি জানায় এবং এই আনন্দে তারা ঘুমাতে পারেননি।
খাগড়াছড়ি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক জুয়েল চাকমা বলেন, ‘এ জয়ের আনন্দ পুরো দেশের সঙ্গে খাগড়াছড়িবাসী ও জেলা ক্রীড়া সংস্থাও আনন্দিত।’ তিনি খাগড়াছড়ির তিন নারী ফুটবলার ও এক কোচ তৃষ্ণা চাকমার সঙ্গে রাঙ্গামাটির দুই কৃতী ফুটবলারকে অভিনন্দন জানান। সাবেক জাতীয় নারী দলের অধিনায়ক তৃষ্ণা চাকমা খাগড়াছড়ি জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যকরী কমিটিরও সদস্য। তাকে নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এ প্রত্যাশা সবার।
এ বিজয় অর্জন করায় খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ^াস তিন নারী ফুটবলার ও এক কোচের জন্য এক লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।
